জাল নথিপত্রে রপ্তানির আড়ালে ১ হাজার ৭৮০টি চালানের বিপরীতে চার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৩৮২ কোটি টাকা পাচারের প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর কাকরাইলে সংস্থাটির কার্যালয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ফখরুল আলম সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানিয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানগুলো হলো সাবিহা সাকি ফ্যাশন, এশিয়া ট্রেডিং করপোরেশন, ইমু ট্রেডিং করপোরেশন ও ইলহাম। প্রতিষ্ঠানগুলো টি-শার্ট, টপস, লেডিস ড্রেস, ট্রাউজার, বেবি সেট, ব্যাগ, পোলো শার্ট, জ্যাকেট, প্যান্ট, হুডিজাতীয় পণ্য সাতটি দেশে রপ্তানি করেছে।
শুল্ক গোয়েন্দার মহাপরিচালক বলেন, আমাদের সন্দেহ হওয়ায় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের ওপর নজর রাখছিলাম। আমরা প্রথমে সাবিহা সাকি ফ্যাশন নামের প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতির বিষয়টি উদঘাটন করি। এরপর আরও তিন প্রতিষ্ঠানের অর্থ পাচারের বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত শেষে নিশ্চিত হয়েছি। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো এলসি ছিল না। কাগজপত্র জাল করে চারটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সময়ে ১ হাজার ৭৮০টি চালানের বিপরীতে ১৮ হাজার ২৬৫ টন পণ্য রপ্তানি দেখায়। যার ঘোষিত মূল্য ৩ কোটি ৭৮ লাখ ১৭ হাজার ১০ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ৩৮২ কোটি টাকা। আরও তদন্তে পাচার করা অর্থের পরিমাণ বাড়বে বলে মনে করছি।
তিনি বলেন, যখন কোনো জালিয়াত চক্র অর্থ পাচারের উদ্দেশ্যে রপ্তানি করে, তখন তার উদ্দেশ্যই থাকে রপ্তানি মূল্য কোনোভাবেই দেশে আনবে না। সে ক্ষেত্রে তারা পণ্যের মূল্য কোনো না কোনোভাবে কম দেখানোর চেষ্টা করে। তার প্রধান লক্ষ্যই থাকে বিদেশে অর্থ পাচার। তারা পণ্য রপ্তানির কথা বললেও উদ্দেশ্য হলো পণ্যের বিপরীতে টাকা আর দেশে না আনা। বৈদেশিক মুদ্রা বৈধপন্থায় দেশে প্রত্যাবাসিত হওয়ার কোনো সুযোগ না থাকায় মানিলন্ডারিং সংঘটিত হয়েছে। অর্থ পাচারকারী চার প্রতিষ্ঠান টি-শার্ট, টপস, লেডিস ড্রেস, ট্রাউজার, বেবি সেট, ব্যাগ, পোলো শার্ট, জ্যাকেট, প্যান্ট, হুডি প্রভৃতি পণ্য সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কাতার, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, নাইজেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে রপ্তানি করলেও বিনিময়ে বিভিন্ন সময়ে অর্থ আনেনি বা কম এনেছে।
এভাবে বড় অঙ্কের অর্থ পাচার করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট হলো লিমেক্স সিপার্স লিমিটেড, এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায় চিহ্নিতকরণ নম্বর (বিআইএন) লক করা হয়েছে। চারটি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও আর কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একইভাবে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে, যা তদন্ত চলছে বলেও সাংবাদিকদের শুল্ক গোয়েন্দারা জানিয়েছেন।
আরও জানানো হয়, সাবিহা সাকি ফ্যাশন নামের প্রতিষ্ঠানটি রপ্তানি দলিল জালিয়াতির মাধ্যমে বিদেশে পণ্য রপ্তানি করে কিন্তু পণ্যের রপ্তানি মূল্য বা বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনেনি। গত ৩১ জানুয়ারি শুল্ক গোয়েন্দার একটি টিম চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গা অভিযান পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটির টি-শার্ট ও লেডিস ড্রেস, বেবি ড্রেস, জিনস প্যান্ট, লেগিন্স, শার্ট, শালসহ অনেক পণ্যের বড় অংশ ঘোষণাবহির্ভূতভাবে রপ্তানির প্রমাণ পাওয়া যায়, যা সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব ও নাইজেরিয়ায় রপ্তানি করা হয়েছে। তদন্তে দেখা যায়, সাবিহা সাইকি ফ্যাশন ৮৬টি পণ্য চালানের বিপরীতে ৯৯৭ টন মেনস ট্রাউজার, টি-শার্ট, বেবি সেট, ব্যাগ, পোলো শার্ট, জ্যাকেট, প্যান্ট ও হুডি রপ্তানি করেছে। যার বিনিময় মূল্য ১৮ লাখ ৪৫ হাজার ৭২৭ মার্কিন ডলার বা ২১ কোটি টাকা। আর ওই টাকা দেশে আনা হয়নি।
অন্যদিকে এশিয়া ট্রেডিং করপোরেশন-নামীয় প্রতিষ্ঠান বিগত সময়ে ১৩৮২টি পণ্য চালান রপ্তানি করে। রপ্তানি করা পণ্য চালানগুলোতে এশিয়া ট্রেডিং করপোরেশন ১৪ হাজার ৮৫ টন টি-শার্ট, টপস, লেডিস ড্রেস রপ্তানি করে। যার বিনিময় মূল্য ২ কোটি ৫৮ লাখ ২৬ হাজার ৮৬৬ মার্কিন ডলার বা ২৮২ কোটি টাকা। এ অর্থের সবটা দেশে আনা হয়নি।
ইমু ট্রেডিং করপোরেশন জালিয়াতির মাধ্যমে ২৭৩টি পণ্য চালান রপ্তানি করে। পণ্য চালানগুলোতে উল্লিখিত প্রতিষ্ঠান ইমু ট্রেডিং করপোরেশন ২ হাজার ৫২৩ টন টি-শার্ট, ট্রাউজার, টপস রপ্তানি করে। যার বিনিময় মূল্য ৬৫ লাখ ৪ হাজার ৯৩২ মার্কিন ডলার বা ৬২ কোটি টাকা।
আর ইলহাম-নামীয় প্রতিষ্ঠানটি বিগত সময়ে রপ্তানি দলিল জালিয়াতির মাধ্যমে ৩৯টি চালান রপ্তানি করে। রপ্তানি করা পণ্য চালানগুলোতে উল্লিখিত প্রতিষ্ঠান ৬৬০ টন টি-শার্ট, ট্যাংক টপ, লেডিস ড্রেস প্রভৃতি রপ্তানি করে। যার বিনিময় মূল্য ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৮৫ মার্কিন ডলার বা ১৭ কোটি টাকা।