বীমায় সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি জমি কেনায়!

অতীতে দেশের বীমা খাতে যত দুর্নীতি হয়েছে, তার বড় অংশই হয়েছে জমি কেনাকে কেন্দ্র করে। কোনো কোনো কোম্পানি বাজার দরের চেয়ে ৩০ গুণ বেশি দরে জমি কিনেছে। ফলে ওই জমি ১০-১৫ বছর পরও বিক্রি করতে গিয়ে ক্রয়মূল্যের অর্ধেক দরেও বিক্রি করা যাচ্ছে না। গতকাল এক আলোচনা সভায় বীমা কোম্পানির জমি ক্রয়ে এমন দুর্নীতির কথা জানিয়েছেন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারী।

গতকাল ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরামের (সিএমজেএফ) নিজস্ব কার্যালয়ে ‘সিএমজেএফ টক’ অনুষ্ঠানে মোহাম্মদ জয়নুল বারী বলেন, কাউকে বীমা কোম্পানির গ্রাহকদের অর্থ বা সম্পদ আত্মসাৎ করার সুযোগ দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে কোম্পানির সম্পত্তি বিক্রি করে হলেও বীমা দাবি পরিশোধ করতে হবে।

তিনি বলেন, অতীতে বীমা খাতে যে দুর্নীতি হয়েছে, তার বড় অংশই হয়েছে জমি কেনাকে কেন্দ্র করে। দেখা গেছে, এক কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ ৩০ কোটি টাকা দিয়ে কেনা হয়েছে। ওই জমি ১০-১৫ বছর পরেও কেনা দামের অর্ধেকেও বিক্রি করা যাচ্ছে না। তাই খুব জরুরি না হলে এবং মূল্য যৌক্তিক না হলে এখন কোনো কোম্পানিকে জমি কেনার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।

আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, সবাই বীমা করে সময় শেষে যেন টাকাগুলো বুঝে পায়, আমরা সে চেষ্টা চালাচ্চি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সঠিক সময়ে গ্রাহক টাকা পাচ্ছে না। এ বিষয়ে একটা সেল গঠন করা হয়েছে। সেল কমিটির কাছে প্রচুর অভিযোগ আসে, সরাসরি কিংবা মেইল বা অন্যান্য মাধ্যমে। এ অভিযোগগুলো নিয়ে আমরা কাজ শুরু করছি।

জয়নুল বারী বলেন, এতদিন আমরা কমপ্লায়েন্স না মানলে শুধু কোম্পানিকে জরিমানা করেছি। এখন ব্যক্তিকেও অর্থাৎ অভিযুক্ত কর্মকর্তাকেও জরিমানা করা হবে। এসব সমস্যা সমাধানে আমরা বেশ কিছু আইন প্রণয়ন করেছি, আরও কিছু আইন প্রণয়নে কাজ করছি। বীমা খাতের বিশাল সম্ভাবনার পাশাপাশি সমস্যাও রয়েছে জানিয়ে জয়নুল বারী বলেন, কমপ্লায়েন্সের বিষয়গুলো পরিপালন না করা সবচেয়ে বড় সমস্যা। দীর্ঘদিন কমপ্লায়েন্স না থাকায় অনেক কোম্পানির মধ্যে অনিয়ম-দুর্নীতি বাসা বেধেছে। গ্রাহক ও কোম্পানির টাকা অপচয়, অপব্যবহার, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আত্মসাতের ঘটনাও ঘটেছে। তারা এই সমস্যার সমাধানে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধ নিয়ে যেসব কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, সেসব কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদকে ডেকে আমরা বৈঠক করেছি। আমরা ইতিমধ্যে সাত কোম্পানির বোর্ডকে ডেকেছি এবং তাদের অবস্থান তুলে ধরেছি। তাদের প্রিমিয়াম কেমন এবং কী ধরনের সম্পদ আছে তা দেখেছি। যেসব পলিসির মেয়াদ শেষ হয় সেগুলো কীভাবে পরিশোধ করবে সেই পরিকল্পনা চেয়েছি। এসব তথ্যগুলো দিলে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নেব। কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে হলেও গ্রাহকের প্রাপ্য টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা মানা না হলে প্রয়োজনে কোম্পানির বোর্ড ভেঙে দেওয়া হবে।

আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, কিছু কোম্পানি অতিরিক্ত টাকা খরচ করেছে। কেউ ম্যানেজমেন্ট খরচ বেশি করেছে। কেউ জমি কিনেছে বেশি দামে। কয়েকটি জীবন বীমা কোম্পানির অবস্থা এতটাই নাজুক যে, এগুলো বন্ধ করে দেওয়া উচিত জানিয়ে জয়নুল বারী বলেন, কিন্তু গ্রাহকের টাকা পরিশোধ না করে বন্ধ করে দেওয়া হলে তারা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই বন্ধ না করে কঠোর মনিটরিং ও অন্যান্য সহযোগিতা দিয়ে কোম্পানিগুলোকে সংকট থেকে বের করে আনার বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবে তাতেও কাজ না হলে হয়তো বন্ধ করে দেওয়ার পথেই হাঁটতে হবে।

তিনি আরও বলেন,  ডেল্টা লাইফের অবস্থা পেয়েছি খুবই খারাপ। আইন অনুযায়ী দুইটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে হয়তো বোর্ড ভেঙে দেওয়া অথবা কোম্পানি বন্ধ করে দেওয়া যায়। কিন্তু আমরা ভেবে দেখলাম কোম্পানিটি ভালো ছিল, তাই চেষ্টা করেছি কীভাবে পুনরায় দাঁড় করানো যায় সে কাজ শুরু করলাম। এরপর আদালত থেকে একটা রায় হয়। সব মিলে তাদের স্টেকহোল্ডারদের মতামতের ভিত্তিতে আমরা কিছু শর্ত দিয়ে আদালতে পাঠালাম। আদালতের রায়ের পর তাদের কার্যক্রমের বিষয়ে অনুমোদন করেছি।

বীমার বিরাজমান সমস্যাগুলো রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়, আর আইডিআরএর একার পক্ষেও তা সম্ভব নয় জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা বীমা আইন সংশোধনের মাধ্যমে সময়োপযোগী করার উদ্যোগ নিয়েছি। এই আইন বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমরা দেখেছি বেশকিছু জায়গায় অসংগতি আছে, নানা অস্পষ্টতা রয়েছে। এত বেশি ধারায় রেগুলেশন করার কথা বলা আছে, যা একেবারেই বাস্তবায়ন অযোগ্য। তাই বীমা আইন সংশোধন করা জরুরি। ইতিমধ্যে সংশোধনীর খসড়া তৈরি শুরু করেছেন তারা।

বীমা খাতের উন্নয়নে ডিজিটালাইজেশনও অনেক জরুরি জানিয়ে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, নতুন প্রজন্ম অনলাইনে খাবার ও পোশাকসহ নানা পণ্য কিনে অভ্যস্ত। বীমার প্রোডাক্টও যদি অনলাইনে কেনা যায়, তাহলে তাদের মধ্যে আগ্রহ বাড়বে।