যুগল মাইলফলকে দেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন

বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয় ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ’-এর হাত ধরে, ১৯৬৩ সালের ২৫ অক্টোবর। স্বাধীনতার পরে সংগঠনটি নাম বদলে হয় ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ’। ১৯৭৩ সাল নাগাদ দেশে চলচ্চিত্র সংসদের সংখ্যা ছিল ডজনের ওপরে। সে বছর ২৪ অক্টোবর সক্রিয় চলচ্চিত্র সংসদগুলো একত্রিত হয়ে গঠন করে এই আন্দোলনের একটি ফেডারেটিভ বডি। নেতৃত্বে ছিলেন আলমগীর কবির।

তখনকার ‘বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ’-ই নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এখনকার ‘ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশ’ হিসেবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ৬ দশকপূর্তির সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের এই ফেডারেটিভ বডিরও পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হচ্ছে এ বছর।

এই দীর্ঘ যাত্রায় দেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিয়েছে ফেডারেশন। আর এই আন্দোলন নেতৃত্ব দিয়েছে দেশের চলচ্চিত্র সংস্কৃতির উৎকর্ষে। এই আন্দোলনের সক্রিয় দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দেশে প্রতিষ্ঠিত হয় ফিল্ম আর্কাইভ ও চলচ্চিত্র ইনস্টিটিউট। প্রবর্তিত হয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। সুস্থ চলচ্চিত্র নির্মাণকে উৎসাহিত করতে সরকারি পৃষ্ঠপোষণা হিসেবে চালু হয় অনুদান। দেশের চলচ্চিত্র বিষয়ক প্রকাশনার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে চলচ্চিত্র সংসদগুলো।

বিশেষ করে বলতে হয়, দেশের এ আন্দোলনের প্রাণপুরুষ মুহম্মদ খসরু ও তার পত্রিকা ‘ধ্রুপদী’র কথা। এছাড়াও ‘ক্যামেরা যখন রাইফেল’, ‘চলচ্চিত্রপত্র’, চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ৪০ বছরপূর্তিতে প্রকাশিত ‘তিমির হননের নান্দীপাঠ’ প্রভৃতির কথাও বলতে হয়।

চলচ্চিত্র শিক্ষা নিয়েও বরাবরই উচ্চকণ্ঠ চলচ্চিত্র সংসদগুলো। নিজেদের উদ্যোগে তারা আয়োজন করেছে অসংখ্য কর্মশালা। সেগুলো থেকে তৈরি হয়েছে অসংখ্য পরিচালক ও অন্যান্য শিল্পী-কুশলী। পাশাপাশি সরব থেকে চলচ্চিত্র বিষয়ক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যাপারেও। তারই ধারাবাহিকতায় এখন সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথক বিষয় হিসেবে পাঠদান হচ্ছে চলচ্চিত্র নিয়ে।

এর বাইরে সুস্থ চলচ্চিত্র নির্মাণে উৎসাহ প্রদান ও সচেতন দর্শকশ্রেণি গড়ে তুলতে প্রচারণা ও বিভিন্ন উৎসব ও সেমিনার আয়োজন করছে ফেডারেশনের সদস্য সক্রিয় চলচ্চিত্র সংসদগুলো। এমনকি দেশের চলচ্চিত্রে অশ্লীলতাবিরোধী আন্দোলনেও সামনের সারিতে ছিল চলচ্চিত্র সংসদগুলো।

বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা সে আন্দোলনকে সফল করতে রেখেছিল বিশেষ ভূমিকা।

চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ৬০ বছর ও ফেডারেশনের ৫০ বছরপূর্তিএই দুই যুগল উপলক্ষ উদযাপন করতে ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশ হাতে নিয়েছে বছরব্যাপী কর্মসূচি। তার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে আজ ১৯ মার্চ রবিবার সন্ধ্যা ৬টায়। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে সে আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন মাননীয় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।

বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন প্রবীণ শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। আরও থাকবেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক নাট্যজন লিয়াকত আলী লাকী। দেওয়া হবে ‘ছয় দশকের সেরা চলচ্চিত্র সংসদ সম্মাননা’। দেখানো হবে চলচ্চিত্র সংসদকর্মী নুরুল আলম আতিকের ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’।

বছরব্যাপী আয়োজনে আরও থাকবে- চলচ্চিত্র উৎসব, সেমিনার, কর্মশালা, স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ ও নৌভ্রমণ। আগামী ৮ থেকে ১৭ জুন হবে চলচ্চিত্র সংসদকর্মীদের নির্মিত চলচ্চিত্রের উৎসব। তার অংশ হিসেবে, দুটি সেমিনারও আয়োজন করা হবে। পরে পৃথক একটি সেমিনার আয়োজন করা হবে বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ওপর। তাতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন, এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও চলচ্চিত্র গবেষক লোটে হোয়েক।

আগামী ১৮ থেকে ২৮ অক্টোবর আয়োজন করা হবে, বাংলাদেশের ৫০ বছরের শ্রেষ্ঠ নির্বাচিত চলচ্চিত্র উৎসব। তাতে কাহিনিচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রএই তিন বিভাগে সর্বোচ্চ ১০টি করে চলচ্চিত্র বাছাই করা হবে। প্রদান করা হবে ‘বাংলাদেশের ৫০ বছরের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র’ সম্মাননা। অনুষ্ঠিত হবে, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে।

পাশাপাশি কর্মশালা আয়োজন করা হবে- ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, রংপুর, খুলনা, কুষ্টিয়া ও রাঙ্গামাটিতে। পরে দেশের সব জেলায় কর্মশালা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। ফেডারেশনের নেতৃত্বে এই কর্মশালাগুলো আয়োজন করবে স্থানীয় সদস্য চলচ্চিত্র সংসদ।

গত ১৪ মার্চ মঙ্গলবার শিল্পকলা একাডেমির সেমিনার কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানানো হয় ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। উপস্থিত ছিলেন- চলচ্চিত্র সংসদকর্মী ও বরেণ্য নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম, প্রবীণ চলচ্চিত্র সংসদকর্মী ও লেখক কাইজার চৌধুরী, চলচ্চিত্র সংসদকর্মী ও নির্মাতা মসিহউদ্দীন শাকের, ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব মোস্তাফিজ, চলচ্চিত্র সংসদকর্মী ও নির্মাতা ফাখরুল আরেফিন, চলচ্চিত্র সংসদকর্মী কাজী জাহিদুল ইসলাম প্রমুখ।

উপস্থিত ছিলেন ফেডারেশনের বর্তমান সভাপতি লায়লুন নাহার স্বেমি, সাধারণ সম্পাদক বেলায়াত হোসেন মামুন, যুগ্ম-সম্পাদক রিপন কুমার দাশ, অর্থ সম্পাদক মো. সাদেক হোসেন, দপ্তর সম্পাদক অদ্রি হৃদয়েশ, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক নাবীল আল জাহান ও কার্যকরী সদস্য রোদেলা নিরুপমা ইসলাম।

সংবাদ সম্মেলনে এই আয়োজনের গুরুত্ব বর্ণনা করে তার সাফল্য কামনা করে বক্তব্য রাখেন বিপ্লব মোস্তাফিজ। বলেন, ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের যা কিছু ভালো অর্জন তার সবগুলোর পেছনেই আছে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের অবদান। দেশের চলচ্চিত্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল ঘটেছে এই আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে। তাই এই আন্দোলনের ষাট বছরপূর্তি ও ফেডারেশনের পঞ্চাশ বছরপূর্তি দুটোই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক।’

লেখক : প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক

ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশ

nabeelaljahan@gmail.com