বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের নন-কটন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পোশাক রপ্তানি ৪৫ বিলিয়নে পৌঁছালেও পণ্যের ম্যাটেরিয়াল ডাইভারসিফিকেশন তেমন একটা হয়নি। পোশাকে মোট ক্রয়াদেশ কমলেও, উচ্চমূল্যের পোশাকের প্রবৃদ্ধি ও নতুন বাজারে অবস্থান শক্ত হওয়ায় রপ্তানি আয়ে তেমন প্রভাব পড়েনি। গতকাল শনিবার পোশাক শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিজিএমইএর সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সভাপতি ফারুক হাসান এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, বাংলা ভাষাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ পাশপাশি ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশে উৎপাদিত সব পোশাক পণ্যের লেবেলে বাংলা বর্ণমালায় ‘বাংলাদেশে তৈরি’ লেখাটি থাকবে। রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় বাজারের জন্য পোশাক প্রস্তুতকারী সব শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রতিও আহ্বান জানান তিনি।
ফারুক হাসান বলেন, সম্প্রতি ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যার প্রভাব পড়েছে আমাদের অর্থনীতি ও শিল্পে। প্রধান বাজারগুলোতে ভোক্তারা ভোগ্যপণ্যের ব্যয় কমিয়ে দিয়েছেন, ফলে কমে আসছে পোশাকের চাহিদা। তাই, পোশাকের অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে অফ প্রাইস বা ডিসকাউন্টেড পণ্যের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে। উচ্চমূল্যের পোশাকের ক্রয়াদেশও বেড়েছে।
তার মতে, ক্রেতারা তাদের সোর্সিং কৌশল পরিবর্তন করছেন, একসঙ্গে বড় অর্ডার না দিয়ে ছোট ছোট স্লটে অর্ডার দিচ্ছেন, ফলে কারখানা পর্যায়ে উৎপাদন পরিকল্পনা বিপর্যস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ মানবাধিকার ও ডিউ ডিলিজেন্স প্রটোকল গ্রহণ করছে, যেগুলো প্রতিপালন করতে আমাদের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। আবার এই প্রটোকলগুলো ব্যবহারকারী পর্যায়ে যেন কোনো হতাশা তৈরি না করে সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পথটি মসৃণ করতে নেশন ব্র্যান্ডিংয়ের পাশাপাশি অ্যাপারেল ডিপ্লোমেসি নিয়ে কাজ করছে। ফারুক হাসান জানান, আগামী মাস থেকে থেকে প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার এবং ব্লকগুলোর সঙ্গে লবিং শুরু করবে বিজিএমইএ, যাতে বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার পর আরও ছয় বছরের জন্য স্বল্পোন্নত দেশের সুবিধাটি সম্প্রসারণ করতে সহায়তা করে।
২০২২ সালে আমাদের পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৪৫ দশমিক ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০২১-এর তুলনায় ২৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেশি। যে প্রবৃদ্ধি দেখছি তা মূলত মূল্যভিত্তিক প্রবৃদ্ধি। কিন্তু পরিমাণের দিক থেকে কোনো প্রবৃদ্ধি হয়নি, বরং ঋণাত্মক হয়েছে বলে জানান বিজিএমইএ সভাপতি।
রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধির পেছনে মূলত তিনটি কারণ রয়েছে বলে জানান ফারুক হাসান। তার মতে, প্রথমত, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, ইত্যাদি কারণে আমাদের উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। যার প্রভাব পোশাকের মূল্যের ওপর পড়ছে। দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের শিল্পে উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্যে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ হয়েছে। বেশ কিছু কারখানা অপেক্ষাকৃত উচ্চমূল্যে পণ্য রপ্তানি করছে যেমন জ্যাকেট, অ্যাক্টিভ ওয়্যার এবং স্যুট। এর ফলে পোশাকের ইউনিট প্রাইস বেড়েছে। অতএব, আমাদের যে হারে মূল্যভিত্তিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে সেই অনুপাতে পরিমাণভিত্তিক বা ভলিউমে প্রবৃদ্ধি হয়নি।
তৃতীয়ত নতুন বাজারগুলোতে রপ্তানির ক্ষেত্রেও আমরা ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। সরকার বাজার বহুমুখীকরণের জন্য যে প্রণোদনা দিয়েছিল, তার ফলে অপ্রচলিত বাজারগুলোতে আমাদের পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
ফারুক হাসান বলেন, বর্তমান বিশ্বে ভোক্তাদের ক্রমাগত জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পোশাকের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে নন-কটন পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। সুতরাং এই খাতে আমাদের বিপুল সম্ভবনা রয়েছে। আমরা যদি নন-কটনে আমাদের শেয়ার বাড়াতে পারি তবে আমাদের রপ্তানি বাড়বে, নতুন বিনিয়োগ আসবে, কর্মসংস্থান বাড়বে, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেবা খাতে ব্যাপক সুযোগ তৈরি হবে, সর্বোপরি সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ রাজস্ব আহরণের পরিমাণ বাড়বে।
আন্তর্জাতিক ভোক্তাদের আচরণেও বেশ পরিবর্তন এসেছে। তারা এখন সার্কুলার ফ্যাশন ও রিসাইকল পণ্যের ব্যাপারে অনেক বেশি আগ্রহী। এখন আমরা পোস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়েস্ট বা ঝুট কাপড় পুনরায় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছি।
বর্তমানে প্রতি বছর টেক্সটাইল ও পোশাক খাত থেকে প্রায় ৫ লাখ টনের মতো ঝুট তৈরি হয়। এর একটি অংশ আমরা প্রায় রপ্তানি করে থাকি, যার মাধ্যমে বছরে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার আয় হয়। আমরা যদি এই ঝুটগুলোকে রিসাইকেল করতে পারি তবে তা দিয়ে আমরা প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের পণ্য উৎপাদন করতে পারব।
শুধু তাই নয়, অনুকূল নীতি সহায়তা পেলে আমরা পোস্ট কনজ্যুমার ওয়েস্ট বা ব্যবহৃত পোশাক আমদানি করে সেগুলোকে আপ-সাইক্লিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন লাইফস্টাইল পণ্য বা ফ্যাশনেবল পণ্য তৈরি করে তা রপ্তানি করতে পারব। এর মাধ্যমে পোশাক খাতের পাশাপাশি একটি নতুন শিল্প গড়ে উঠবে, যা আমাদের শিল্প খাত বহুমুখীকরণে একধাপ এগিয়ে যাবে।
সম্প্রতি আমরা আমেরিকান অ্যাপারেল অ্যান্ড ফুটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশনের (এএএফএ) সঙ্গে কনভেনশনাল লেবেলিংয়ের পরিবর্তে কিউআর কোডের মাধ্যমে ডিজিটাল লেবেলিংয়ের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে আহ্বান জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, অতীতে কেবলমাত্র বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম কাঁচামাল তুলা এবং সুতা আমদানি করা যেত, বর্তমানে আরও ৪টি স্থলবন্দরের মাধ্যমে এসব পণ্য আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে বেনাপোল বন্দরের জট কমবে, আমদানি খরচ ও সময় কমবে।