পুলিশের দায়ের করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলা ও জমিসংক্রান্ত বিরোধের মামলায় গতকাল শনিবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি সরকার। তাকে গাজীপুর মেট্রোপলিটন আদালতে পাঠানো হলে বিচারক মো. ইকবাল হোসেন মাহিকে জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দেন। বিকেল ৫টায় একই আদালত মাহিকে জামিন দিয়েছে। ফলে আদালতের আদেশে মাহিকে গাজীপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হলেও জামিন পাওয়ার পর মুক্তি দেওয়া হয়েছে। একই মামলার আসামি তার স্বামী রকিব সরকারকে পলাতক দেখানো হয়েছে।
মাহিয়া মাহির আইনজীবী অ্যাডভোকেট রিপন চন্দ্র সরকার জানান, ওমরাহ পালন করতে গিয়ে জানেন তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এ কারণে তিনি দেশে ফিরে এসেছেন। এ ছাড়া তিনি ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা এবং একজন সেলিব্রেটি হওয়ায় তার পালিয়ে যাওয়া আশঙ্কা নেই। তিনটি বিষয় বিবেচনা করে বিচারক তার জামিন মঞ্জুর করেছেন। তিনি আরও জানান, এর আগে আদালতে ওঠানো হলে তার জামিন চাওয়া হয়নি। যার কারণে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এখন আমরা তার জামিন চাইলে বিচারক দুটি মামলায় তার জামিন মঞ্জুর করেন। রাত পৌনে ৮টায় গাজীপুর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন মাহি।
পবিত্র ওমরাহ পালন শেষে সৌদি আরব থেকে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মাহি ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামেন। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বের হওয়ার সময় দুপুর পৌনে ১২টার দিকে বিমানবন্দর এলাকা থেকে তাকে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে বাসন থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও জমিসংক্রান্ত বিরোধে মারামারির ঘটনায় হুকুমের আসামি হিসেবে দুটি মামলা রয়েছে।
মাহিকে গ্রেপ্তারের পর গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলাম তার কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মাহির গ্রেপ্তার ও মামলার বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান।
তিনি জানান, চিত্রনায়িকা মাহি ও তার স্বামী রকিব সরকার মাহির ফেসবুক আইডি থেকে ভিডিও শেয়ার করে বাংলাদেশ পুলিশ এবং গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করেছেন। তিনি ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিয়ে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মিথ্যাচার, বানোয়াট, আক্রমণাত্মক, কুরুচিপূর্ণ ও মানহানিকর তথ্য প্রচার করছেন। বাসন থানার পুলিশ মাহির ফেসবুক আইডিতে প্রবেশ করে ঘটনার সত্যতা পায়। এ বিষয়ে বাসন থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন গাজীপুর মেট্রোপলিটনের বাসন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ রোকন মিয়া।
গতকাল দুপুর পৌনে ১২টার দিকে বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পরপরই জিএমপির একদল পুলিশ মাহিকে গ্রেপ্তার করে সরাসরি বাসন থানায় নিয়ে যায়। আদালতে হাজির করা হলে বিচারক শুনানি শেষে তাকে জেলহাজতে পাঠানের নির্দেশ দেন। আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার সময় মাহি বলতে থাকেন, আদালতে তাকে কোনো কথা বলতে দেওয়া হয়নি।
প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, জমি নিয়ে বিরোধে মো. ইসমাইল হোসেন বাদী হয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা ১০-১৫ জনের বিরুদ্ধে বাসন থানায় একটি মামলা করেন। এ ঘটনায় এ পর্যন্ত মাহিসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এর আগে সৌদি আরব থেকে মাহি শুক্রবার ভোরে ফেসবুক লাইভে আসেন। লাইভে তিনি অভিযোগ করে বলেন, তার স্বামী ব্যবসায়ী-আওয়ামী লীগ নেতা রকিব সরকারের গাড়ির শোরুমে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ওই ফেসবুক লাইভে পুলিশের বিরুদ্ধে ‘ঘুষ নিয়ে প্রতিপক্ষকে জমি দখল দেওয়ার চেষ্টারও অভিযোগ করেন তিনি। দেশে ফিরলে তিনি গ্রেপ্তার হতে পারেন বলেও ফেসবুক লাইভে বলেছিলেন।
একই লাইভে রকিব সরকার বলেন, গাজীপুর মহানগরের ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের পূর্ব পাশে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে ‘সনিরাজ কার প্যালেস’ নামে তার গাড়ির একটি শোরুম রয়েছে। স্থানীয় ইসমাইল হোসেন ও মামুন সরকার লোকজন নিয়ে শুক্রবার ভোর ৫টার দিকে হামলা চালিয়ে ওই শোরুমে ব্যাপক ভাঙচুর করে। অফিস কক্ষ তছনছ করে এবং টাকাপয়সা লুট করে নিয়ে যায়। খবর পেয়ে রকিব সরকারের লোকজন ঘটনাস্থলে গেলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) বিরুদ্ধে চিত্রনায়িকা মাহির অভিযোগ তদন্ত করা হবে। গতকাল রাজধানীর তেজগাঁও এতিমখানায় খাবার বিতরণ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।
মন্ত্রী বলেন, ‘আমি শুনেছি গাজীপুরের কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ফেসবুক লাইভে এসে মাহি কিছু বক্তব্য দিয়েছেন। এ জন্য মামলা হয়েছে। আমি সবকিছু জানি না, শুনেছি। এটা ভালো করে জেনে আমি বলতে পারব।’
মাহি তার স্বামীর শোরুম ভাঙচুর ও দখলের অভিযোগ করেছেন পুলিশের বিরুদ্ধে। এই অভিযোগ তদন্ত করা হবে কি না, জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যখন একটা অভিযোগ আসে, তখন তদন্ত করতে হয়। তদন্তে সবকিছু বেরিয়ে আসবে। মাহির বক্তব্য সঠিক কি না, কিংবা পুলিশ যেটা করেছে, সেটি সঠিক কি না, তদন্তেই বেরিয়ে আসবে।’
রকিব সরকারের পুরনো তিন মামলা সচল হচ্ছে : গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘রকিব সরকারের বিরুদ্ধে খুন, ধর্ষণ ও অস্ত্র মামলা রয়েছে। মামলাগুলোর ঘটনা সত্য, কিন্তু সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় সে সব মামলার পুলিশ ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছিল। পুলিশ যেকোনো সময় মামলাগুলো সচল করতে পারে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে। আমরা মামলাগুলো খতিয়ে দেখছি।’
মারামারি মামলার বাদী যা বলেন : মারামারি মামলার বাদী ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘রকিব জোর করে আমার জমি দখল করে রেখেছে। জমির দখল ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে রকিব আমার কাছে এক কোটি টাকা দাবি করেছিলেন। যেখানে এক কোটি টাকা দিলে সমস্যা সমাধান হয়, সেখানে কেন আমি পুলিশকে দেড় কোটি টাকা দেব? পুলিশ আমার পক্ষে থাকলে আজ আমি কেন মার খেলাম, কেন আমি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে গিয়ে অভিযোগ দিলাম?’
মামলায় যারা গ্রেপ্তার : ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে পুলিশের করা মামলায় আসামি মাহি ও তার স্বামী রকিব। আর মারামারি মামলায় আসামি ২৮ জন। এ মামলায় মাহি ও রকিব হুকুমের আসামি। এ মামলায় শনিবার দুপুর পর্যন্ত মাহি ছাড়া আরও ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলো সাজ্জাদ হোসেন সোহাগ (৩৮), আশিকুর রহমান (৩২), ফাহিম হোসেন হৃদয় (২২), জুয়েল রহমান (২৫), জমশের আলী (৪৪), মোস্তাক আহমেদ (২২), খালিদ সাইফুল্লাহ জুলহাস (৩০), সুজন ম-ল (৩৪) ও মাহবুব হাসান সাব্বির (১৮)।
লাইভে পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে বলায় অনুশোচনা প্রকাশ : জামিনে মুক্তির পর গাজীপুর মহানগরের তেলিপাড়া এলাকায় স্বামী রকিব সরকারের ফারিশতা রেস্টুরেন্টে যান মাহি। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে বলেন, গ্রেপ্তারের পর পুলিশ তার সঙ্গে মানবিক আচরণ করেনি। তিনি এক গ্লাস পানি চাইলেও পুলিশ তাকে পানি দেয়নি। পুলিশ সদস্যদের বলেছিলেন, তিনি নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা এবং প্রচণ্ড গরমে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। তারপরও তার প্রতি অমানবিক আচরণ করা হয়। বিমানবন্দরে কারও সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলতে দেওয়া হয়নি।
মাহিয়া মাহি আরও বলেন, ফেসবুক লাইভে তিনি পুলিশ প্রশাসন নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি একজন ব্যক্তিকে নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, পুলিশ তার সঙ্গে যে আচরণ করেছে তার স্বামী দেশে এলে তার সঙ্গে আরও বেশি খারাপ আচরণ ও হয়রানি করা হতে পারে।
ফেসবুক লাইভে এসে কথা বলার কারণে ক্ষমা চাইলেও এই চলচ্চিত্র নায়িকা পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ থেকে সরে যাননি বলে উল্লেখ করেন। সুষ্ঠু তদন্তসাপেক্ষে তিনি এসব ঘটনার বিচার দাবি করেন। মাহি বলেন, ‘অন্যায়ভাবে আমাদের গাড়ির শো-রুমে হামলা ও ভাঙচুর করা হলো, অথচ পুলিশ উল্টো আমাদের এবং আমাদের কর্মচারীদের নামে মামলা দিয়েছে। কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে।’ তবে তিনি কারা কর্র্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান। কারা কর্র্তৃপক্ষ তাকে সম্মান দেখিয়ে মানবিক আচরণ করেছে বলে জানান।