বিজেপি সাম্প্রদায়িক, বামপন্থি সূক্ষ্ম, তৃণমূল কী

পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে আজকাল একটা ধাঁধার খুব চর্চা হচ্ছে। তাদের যদি জিজ্ঞেস করেন, বিজেপি কেমন দল! একশো জনের মধ্যে অন্তত নব্বই জন উত্তর দেবে, বিজেপি চরম সাম্প্রদায়িক দল। মেরুকরণের রাজনীতি করা ছাড়া তাদের অন্য কোনো ইস্যু নেই।

বিজেপি যত অস্বীকার করুক না কেন, অভিযোগটা নিশ্চিত সত্য। খোদ প্রধানমন্ত্রী থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে ভাষায় মাঝেমধ্যে নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেন তা শালীনতা, শিষ্টাচারের যাবতীয় মাপকাঠি অতিক্রম করে যায়। বিজেপি সরকারের আমলে দেশে দাঙ্গা যে বেড়েছে তার জন্য আলাদা করে কোনো সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দরকার নেই। একটু আধটু চোখ-কান খোলা থাকলেই বোঝা যায়। ফলে বিজেপি সাম্প্রদায়িক তা নিয়ে এ রাজ্যের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বড় অংশের কোনো সন্দেহ নেই।

সিপিআই-এম বা বাম দলগুলো সম্বন্ধে মোটের ওপর সংখ্যালঘুদের ধারণা তাদের আমলে আর যাই হোক সেভাবে দাঙ্গা হয়নি। তাহলে ধরেই নেওয়া যায় যে বামেরা ধর্মনিরপেক্ষ। আপাত সেকুলার বামেরা নিশ্চিত। কিন্তু আপনি মুসলিম অন্দরমহলে খোঁজ নিন, দেখবেন তাদের মূল্যায়নে বামেরা সূক্ষ্ম সাম্প্রদায়িক। দাঙ্গা তাদের সময় না হলেও মুসলমানদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা নিতেও বামেদের কেউ দেখেনি। সাচার কমিটির রিপোর্টে তো বটেই, আমি যে ছবি করেছিলাম, ‘মুসলমানের কথা’, তা দেখলেও বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে যায়।

তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পেছনে মুসলমানদের বড় ভূমিকা ছিল। তারা অনেক স্বপ্ন নিয়ে চিরাচরিত বামপন্থি রাজনীতির সমর্থন ছেড়ে রাতারাতি দক্ষিণপন্থি তৃণমূলের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল দলে দলে। এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝতে পেরেছিলেন যে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে গেলে সংখ্যালঘুদের আস্থা অর্জন দরকার। তিনি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজের কাজ করুন না করুন, নিজের মুসলিম দরদী ইমেজ নির্মাণে প্রথম থেকেই সক্রিয় হলেন। ইমাম ও মুয়াজ্জিনের ভাতা বাড়ালেন। কবরখানা সংস্কার করলেন। আরও কিছু কিছু কাজ করলেন। তবে যেটুকু করলেন তার চেয়ে দ্বিগুণ করলেন বিজ্ঞাপন। ঈদের নামাজের দিন শত শত ধর্মভীরু মুসলমানের সঙ্গে রেড রোডে প্রকাশ্যে হিজাব মাথায় যোগ দিলেন। কথায় কথায় সভা-সমাবেশে ইনশাআল্লাহ বলতে লাগলেন। এই হাঁক ডাকে দেশ দেশান্তরে সংখ্যালঘুদের অধিকাংশের কাছে ‘আমি তোমাদের লোক’ বার্তাটি সযত্নে পৌঁছে দিলেন।

ফলে মুসলিম সমাজের উন্নতি ঘটুক না ঘটুক এ বঙ্গের রাজনীতিতে মেরুকরণ নতুন এক মাত্রা পেল। বিজেপি গরমাগরম বক্তৃতা দিয়ে জানান দিতে লাগল যে এ রাজ্য পাকিস্তান, নিদেনপক্ষে কাশ্মীর হবেই। গুজব ছড়িয়ে তারা সংখ্যাগুরু মনে দেশভাগের স্মৃতি উসকে দিয়ে বিদ্বেষ নির্মাণে সক্রিয় হলো। মমতা ব্যানার্জি সরকারের আপাত সংখ্যালঘু ‘প্রেম’ এ রাজ্যে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ভিত শক্ত করে তুলতে লাগল। সরকারিভাবেই এখন স্পষ্ট, পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস ও সংঘ পরিবারের অন্যান্য শাখা সংগঠনের রমরমা বিপুলভাবে ক্রমেই বাড়ছে। আরএসএস, দুর্গা বাহিনী সরকারি স্কুলের ভেতরে অস্ত্র ট্রেনিং নিচ্ছে এরকম অজস্র ছবি মিডিয়াতে মাঝেমধ্যেই আমরা দেখতে পাই। রামনবমীর দিনে প্রশাসনের নাকের ডগায় উন্মত্ত অস্ত্র মিছিল এখন এ রাজ্যে দস্তুর হয়ে গেছে।

কোনো রাজ্যে সরকারের অন্তত পরোক্ষ মদদ না থাকলে আরএসএস প্রভাব বাড়াতে পারে না। এ রাজ্যে হিন্দু সংহতি নামে এক চরম সাম্প্রদায়িক সংগঠন আছে। অনেকে বলেন তাদের কর্মী-সমর্থকদের বড় অংশ তৃণমূল দলের সঙ্গেও যুক্ত। মমতা ব্যানার্জির বিরুদ্ধে বিরোধী বাম ও কংগ্রেসের বড় অভিযোগ যে তিনি বিজেপির বিপক্ষে লড়াইয়ের যত কথা প্রকাশ্যে বলেন তা নিতান্তই লোক দেখানো। আরএস নেতারাও ঠারেঠোরে স্বীকার করেন এ রাজ্য বিজেপি না জিতলেও হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিপুল বিস্তারে কোনো সমস্যা নেই। কয়েক মাস আগে মমতা ব্যানার্জি নিজে খোলাখুলিভাবে বলেছেন যে, আরএসএসে সবাই খারাপ নন। পরিণত রাজনীতিবিদের এটুকু নিশ্চয়ই অজানা নয়, যে দ্বন্দ্ব নিছক ব্যক্তি প্রশ্নের নয়, পুরোপুরি মতাদর্শের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের মুসলিম দরদ নিয়ে ইদানীং মুসলমান সমাজেই অনেক প্রশ্ন উঠছে।

দিন যত যাচ্ছে তত আতস কাচে ফেলে এই সরকার সংখ্যালঘু স্বার্থে কতটা কী করেছে তার বিশ্লেষণ ইতিমধ্যেই পুরোদমে শুরু হয়ে গেছে। প্রথমত মুসলিম সমাজ একটা কৌম বা একমাত্রিক নয়। এই সমাজেও বহু মাত্রা রয়েছে। বিশেষ করে কয়েক বছরের মধ্যে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে মধ্যবিত্ত এক শ্রেণির জন্ম হয়েছে। অনেক ডাক্তার, প্রযুক্তিবিদ, অধ্যাপক উঠে এসেছেন। তরুণদের মধ্যেও শিল্পী-সাহিত্যিকদের অনেক নতুন নতুন নাম ইদানীং সামনে আসছে। যদিও পশ্চিমবঙ্গের তিরিশ শতাংশ বাঙালি মুসলমানের মধ্যে শতাংশের হিসাবে হয়তো এই মিডিল ক্লাস দুই শতাংশ মাত্র। তারা সরকারের নীতি ও কর্মপদ্ধতি নিয়ে মতামত দিতে শুরু করেছেন। সরকারি পর্যায়ে বাঙালি মুসলমানদের গুরুত্ব না থাকায় এই উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে ক্ষুব্ধ করে তুলছে। তৃণমূল দলের সমস্যা হচ্ছে তাদের নির্দিষ্ট কোনো মতাদর্শ না থাকা। ফলে সংখ্যালঘুদের মধ্যেও তৃণমূল মুখ বলে যারা পরিচিত তাদের ভয় করলেও, নিজেদের সমাজ তাদের পছন্দ করে না। এখনো মুসলমানদের অধিকাংশই খুব গরিব। তাদের অর্থনীতি আজও মূলত কৃষিনির্ভর। গ্রামীণ সর্বহারার বড় অংশ মুসলিম ও তফসিলি, আদিবাসী। তাদের অনেকেই এ রাজ্যে চাকরি না পেয়ে ভারতের অন্যান্য রাজ্যে রুটি রোজগারের আশায় চলে যেতে বাধ্য হন। কভিডের সময় কঠিন পরিস্থিতিতে পরিযায়ী শ্রমিকদের যে ঢল নেমেছিল এ রাজ্যে, বলাবাহুল্য তার বড় সংখ্যক মানুষ মালদা, মুর্শিদাবাদ এবং অন্যান্য মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার।

২০১১ সালে তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে। আর এখন ২০২৩ সাল। সাচার কমিটির রিপোর্টে সংখ্যালঘুদের দুর্দশা ছিল নির্বাচনের আগে বামেদের বিরুদ্ধে মমতার বড় অস্ত্র। সেই রিপোর্ট আদৌ কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে তা নিয়ে স্বয়ং রাজেন্দ্র সাচার মৃত্যুর আগে সন্দিহান ছিলেন। বিশিষ্ট সমাজকর্মী হর্ষ মান্দার ও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের একাধিক রিপোর্টেও সংখ্যালঘু উন্নয়ন নিয়ে অনেক প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নিরাপত্তা নিয়েও ইদানীংকালে মুসলিম জনসমাজে আতঙ্ক বাড়ছে। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে তো সমস্যা জটিল হচ্ছেই। এখানেও বেশ কিছু ঘটনা এই সরকারের নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। পশ্চিমবঙ্গের শিল্পাঞ্চল আসানসোলের এক নির্বাচনের আগে মর্মান্তিকভাবে স্থানীয় মসজিদের ইমাম রশিদির একমাত্র ছেলে খুন হন প্রকাশ্যে দিনের বেলায়। সেই ঘটনায় দোষীদের শাস্তি দূরের কথা, যার বিরুদ্ধে ঘটনায় ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ ওঠে, বিজেপির সেই নেতাই দল বদলে তৃণমূল কংগ্রেসে এলে তাকে শুধু স্বাগত জানানোই নয়, ঘটা করে উপনির্বাচনে প্রার্থীও করা হয়। গ্রামেগঞ্জে খোঁজ নিলে দেখবেন কত ওয়াক্ফ সম্পত্তি শাসক দলের নেতারা দখল করে রেখেছেন। সব সরকারের নির্দেশেই হচ্ছে এমন কথা বলব না। কিন্তু জনমনে দলের নেতাদের যাবতীয় কুকর্মের দায় সরকারের বিরুদ্ধেই যায়। মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়েও অনেক দুর্নীতির কথা কান পাতলেই শোনা যাবে। হাওড়ায়, ছাত্রনেতার রহস্যজনক মৃত্যু নিশ্চিত সংখ্যালঘুদের ব্যথিত করেছে। আরও ক্ষুব্ধ করেছে ভাঙ্গর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক তরুণ, মৃদুভাষী জনপ্রিয় নৌশাদ সিদ্দিকীকে প্রশাসনিকভাবে হেনস্তা করা।

এই লেখা লিখতে লিখতে জানলাম কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন শিক্ষানীতি মমতা সরকার মেনে নিয়েছেন। ধীরে ধীরে আরও অনেক নীতিই তিনি হয়তো মেনে নেবেন। ঈদে ছুটি যদি থাকে একদিন অন্যান্য সম্প্রদায়ের পরবে তা অনেক বেশি থাকে কেন, কেউ বলতে পারেন না। দুর্গাপূজা তো এখন পশ্চিমবঙ্গের ব্র্যান্ড। ফলে তার উৎসব তো একমাস হলেও অবাক হওয়ার নেই। ইদানীং ট্যুরিজমের নামে গঙ্গা আরতির চল বাড়ছে। বজরং, গণেশ, জগদ্ধাত্রী পূজা বাড়ছেই। নতুন এক কুম্ভ সেও এ রাজ্যে জায়গা করে নিয়েছে। প্রথমেই তাই লিখেছি, বিজেপি যদি সাম্প্রদায়িক হয়, যদি ধরেও নিই বামপন্থি দলগুলো সূক্ষ্ম সাম্প্রদায়িক। ধাঁধা ওটাই, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের

তৃণমূল তাহলে ঠিক কী!

লেখক: প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

sdastidar27@gmail.com