ব্যাংকঋণের সুদহার নির্ধারণের নতুন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের কথা ভাবছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য লাইবর কিংবা এসওএফআর-এর মতো বন্ডের সুদহারের ভিত্তিতে দেশে ব্যাংকঋণের হার নির্ধারণ করা হবে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন মেয়াদের সরকারি ট্রেজারি বন্ডের গড় সুদহার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। এর সঙ্গে অতিরিক্ত সুদ যোগ করে ব্যাংকঋণের হার নির্ধারিত হবে।
গতকাল রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিষয়ক বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। ট্রেজারি বন্ডকে ভিত্তি হিসেবে ধরে বাণিজ্যিক ঋণের সুদহার চালু হলে বর্তমানের এক অঙ্কের (সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ) সুদব্যবস্থা বাতিল হয়ে যাবে। তাহলে বিনিয়োগের জন্য বাড়তি সুদ আরোপ করতে পারবে ব্যাংকগুলো।
বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে সাধারণত লাইবর কিংবা এসওএফআর রেট ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। বিদেশে লাইবর কিংবা এসওএফআর-এর সঙ্গে নির্ধারিত সুদ যোগ করে মোট সুদহার নির্ধারণ করা হয়। ঠিক একই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে সরকারি পাঁচ ধরনের ট্রেজারি বন্ডের সুদহারের গড় সুদহারের সঙ্গে একটি রেট নির্ধারণ করে দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই রেট চার থেকে পাঁচ শতাংশের মধ্যে রাখার চিন্তা করছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈঠক সূত্রে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার হচ্ছে ৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এছাড়া পাঁচ বছর মেয়াদি ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ, দশ বছর মেয়াদি ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ, ১৫ বছর মেয়াদি ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার হচ্ছে ৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ। অর্থাৎ এই পাঁচ ধরনের বন্ডের সুদহারের গড় ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। এই রেটের সঙ্গে যদি বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচ শতাংশ করিডর রেট নির্ধারণ করে দেয় তাহলে ব্যাংকঋণের সুদহার হবে ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এই নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে এক লাফে চার শতাংশীয় পয়েন্ট বৃদ্ধি পাবে ব্যাংকঋণের সর্বনিম্ন সুদহার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আইএমএফের ঋণ পাওয়ার শর্ত পূরণ করতেই এই সিদ্ধান্তের কথা ভাবছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আগামী অর্থবছরের মুদ্রানীতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। বৈঠক সূত্রে আরও জানা যায়, নতুন মুদ্রানীতিতে পলিসি রেট ও ঋণের সুদহার নির্ধারণের বিষয়ে কাজ চলছে। ব্যাংকঋণের সুদহারের ক্ষেত্রে রেফারেন্স রেট ও করিডর রেট নিয়ে প্রাথমিকভাবে চিন্তা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রেফারেন্স রেট হবে মূলত বন্ডের সুদহারের গড় সুদহার। আর করিডর রেট বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারণ করে দেওয়ার কথা রয়েছে। দুটো যোগ করে যে রেট হবে সেটাই হবে ব্যাংকঋণের সুদহার।
আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য জুনের তৃতীয় সপ্তাহ নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেদিনই ঋণের সুদহার বেঁধে দিয়ে বর্তমানের নির্দেশনা বাতিল করে সুদহারের নতুন ব্যবস্থা প্রচলনের ঘোষণা দিতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, নতুন মুদ্রানীতি নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। আগামী জুনের তৃতীয় সপ্তাহে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে। চলমান মুদ্রানীতির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও আগামী মুদ্রানীতি কী কী থাকবে সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে আজকের বৈঠকে।
তিনি আরও বলেন, নতুন মুদ্রানীতিতে ব্যাংকঋণের সুদহার কী করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এখানে ব্যান্ডিং ও রেফারেন্সের রেটের কথা ভাবা হচ্ছে। এসব বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। আগামী মুদ্রানীতিতে এসব বিষয়ে বিস্তারিত ঘোষণা করা হবে।
এর আগে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের আয়োজনে আন্তর্জাতিক বিজনেস সামিটে ব্যাংকঋণের সুদহারে পরিবর্তন আসছে এমন ইঙ্গিত দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। ওই অনুষ্ঠানে গভর্নর বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক পলিসিগত কাজ করছে। চাহিদা কমিয়ে মূল্যস্ফীতি কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
এছাড়া ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টার কথা জানিয়ে একাধিক হার বাদ দেওয়ার কথা জানান গভর্নর। বিনিময় হার হবে বাজারভিত্তিক ও এক। শিগগির একটি বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা দেখা যাবে বলে ব্যবসায়ীদের আশ^াস দেন। তিনি আরও বলেন, সুদের হার নিয়েও কাজ শুরু করেছি। এরই মধ্যে আমানতের সুদের হারের ফ্লোর ও সিলিং প্রত্যাহার করেছি। বাজারভিত্তিক সুদহার নির্ধারণ করে করিডর প্রথা চালু করা হবে। শিগগির আমরা এ নতুন উদ্যোগ চালু করতে সক্ষম হব।
উল্লেখ, ২০২০ সালে ১ এপ্রিল থেকে ক্রেডিট কার্ড ছাড়া অন্য সব ধরনের ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই নির্দেশনা এখনো কার্যকর রয়েছে।