বিশেষজ্ঞ মত

বেপরোয়া গতি না ঠেকালে দুর্ঘটনা থামবে না

মাদারীপুরের শিবচরে পদ্মা সেতুর এক্সপ্রেসওয়েতে গতকাল রবিবার অনুমোদিতের চেয়ে বেশি গতিতে চলা ইমাদ পরিবহনের বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে মৃতের সংখ্যা এরই মধ্যে ১৯ জনে দাঁড়িয়ে। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় বেশ কয়েকজনের অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে শুধু গতকালের এ ঘটনাই নয়, মাঝেমধ্যেই অতিরিক্ত গতির জন্য এরকম দুর্ঘটনা ঘটছে। আর শুধু তাই নয়, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়া ইমাদ পরিবহনের বাসটির চলাচলের অনুমতি ছিল না। বাসটির ফিটনেস সনদের মেয়াদও পেরিয়ে গেছে। চার বছর আগেও বাসটি গোপালগঞ্জে দুর্ঘটনায় পড়েছিল। সেই দুর্ঘটনায় পুলিশের একজন এসআইসহ চারজন মারা যান। এরপর থেকে বাসটির চলাচলের অনুমতি স্থগিত রাখা হয়েছিল। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এ তথ্য জানিয়েছে।

বিআরটিএ থেকে জানা যায়, এই একই বাস ২০১৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রাতে দুর্ঘটনায় পড়ে। গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার সোনাশুরে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের পেছনে ধাক্কা দিলে চারজন মারা যান। আহত হন আরও ১৫ জন। ভারতের অশোক লেল্যান্ড কোম্পানির বাসটি তৈরি হয়েছে ২০১৭ সালে। এর নিবন্ধন নেওয়া হয় ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে। নিবন্ধনে উল্লেখ করা হয় এ বাসের যাত্রী আসন ৪০টি। এরপর প্রায় প্রতি বছরই ফিটনেস সনদ নেওয়া হয়। তবে সর্বশেষ গত ১৮ জানুয়ারি বাসটির ফিটনেস সনদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এটি ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে খুলনা পর্যন্ত চলাচলের জন্য অনুমতি (রুট পারমিট) নেওয়া হয়েছিল। বাসটি সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পান্থপথ শাখা ও ইমাদ প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির যৌথ নামে কেনা। কোম্পানির মালিক হাবিবুর রহমান শেখ। তার বাড়ি গোপালগঞ্জ সদরের আলিয়া মাদ্রাসা রোডের হারুন টাওয়ারে।

মহাসড়কে চলাচলের সময় চালকদের গতিসীমা না মানা প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআরটিএর একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিআরটিএর লোকবল ব্যবস্থা এত নেই। যে সব সময় মনিটারিং করা যায়। এখন রোডে পুলিশ থাকে। তারা যদি দেখত বাসটি সড়কে চলার অনুমতি নেই। তাহলে তো এই বাস সড়কে চলতে পারত না।’

এ বিষয়ে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মানুষ সুযোগসন্ধানী হয়ে থাকে। সবাই চায় সুযোগসন্ধানী হতে। ধরার কেউ নেই তাই দ্রুত গতিতে গাড়ি চালানো যায়। সেজন্য চালকরা ইচ্ছেমতো গতি বাড়িয়ে দেয় হাইওয়েতে চলাচলের সময়। যার জন্য সড়কে প্রায়ই এরকম দুর্ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় যেমন চালকের দায়, একইভাবে যাদের মাধ্যমে চালানোর সুযোগ পায় তারাও সমানভাবে এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিশেষ করে সকালের দিকে গাড়ি কম থাকে। আর যাত্রীরা বেশিরভাগ ঘুমের মধ্যে থাকে। অনেক চালকেরও সে সময় ঘুম ঘুম ভাব থাকে। তখন চালকরা গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেয়। হাইওয়ের পুলিশ এত দিনে অনেক অভিজ্ঞ  হয়ে গেছে। তারা যদি সে সময়গুলোতে এনফোর্সমেন্ট না বাড়ায় তাহলে এরকম দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে। কারণ এনফোর্সমেন্টের ফলে তাদের প্রতিযোগিতার মনোভাব কমে যাবে। সেই সঙ্গে দুর্ঘটনা কমবে।’

প্রায় একই ধরনের তথ্য জানিয়ে পদ্মা সেতু এক্সপ্রেসওয়েতে মাঝেমধ্যে চলাচল করা এক যাত্রী মো. হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পদ্মা সেতু হওয়ার পর এক্সপ্রেসওয়েতে বাসগুলো খুব বেপরোয়া হয়ে চলে। ইচ্ছেমতো গতি বাড়িয়ে পাল্লাপাল্লি করে। যার জন্য প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। আর ইমাদ নামে যে গাড়ির জন্য এতগুলো মানুষ মারা গেল সেই কোম্পানির গাড়ি এই রোডে সবচেয়ে খারাপ সার্ভিস দেয়। যেখান সেখান থেকে যাত্রী ওঠানামা করে। মাঝেমধ্যে এই ইমাদ দুর্ঘটনা ঘটায়।’

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাইওয়েতে যে বাসগুলো চলাচল করে তার মধ্যে অনেক গাড়ির ফিটনেস নেই। সেই সঙ্গে রাস্তা ফাঁকা পাওয়ায় ইচ্ছেমতো গতি বাড়িয়ে দেয়। আর আমাদের দেশে হাইওয়েতে যে গতি নির্ধারণ করে দেওয়া আছে সেগুলো চালকরা কোনোভাবে মানে না। আর বাস মালিকরাও মনে করে বাস রোডে নামালাম মানে কাজ শেষ, আর কোনো কাজ নেই। কিন্তু এই বাসের সঙ্গে যে কতগুলো মানুষের জীবন জড়িত সেগুলো নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। তাই সরকারের উচিত ভালোভাবে মনিটরিং করে দুর্ঘটনা কমানো।’

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, ‘সরকারি সংস্থাগুলোর গাফিলতির জন্য এই রকম দুর্ঘটনা ঘটে। তাদের কোনো মনিটরিং নেই সড়কে দুর্ঘটনা কমানোর জন্য। যার জন্য সড়কে দুর্ঘটনা বাড়ছে।’

গতকাল দুর্ঘটনায় পড়া ইমাদ পরিবহনের এই বাসটি আগেও দুর্ঘটনায় পড়েছিল জানিয়ে বিআরটিএ চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, ‘যার জন্য তাদের চলাচলের অনুমতি স্থগিত রাখা হয়েছিল। এরপরও চলাচল করা মহা অন্যায়। এখন এই বাসের নিবন্ধন বাতিল ও মালিকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।’

গতকালের দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘হাইওয়েতে সর্বোচ্চ গতিসীমা দেওয়া আছে ৮০ কিলোমিটার। কিন্তু বেশিরভাগ চালকরা ওভার স্পিডে গাড়ি চালিয়ে থাকে। আমাদের ধারণা যেহেতু রাতে গাড়ি ছেড়ে আসছে (দুর্ঘটনাকবলিত ইমাদ পরিবহন) সেই ক্ষেত্রে চোখে সম্ভবত একটু বেশি ঘুম ছিল। এই দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে মনে হচ্ছে চালক তন্দ্রার মধ্যে চলে যায় এবং ওভার স্পিডের কারণেই দুর্ঘটনা হয়েছে।’