এক মাসে ৮ লাখ টাকা চাঁদা আদায় বাকলিয়া পুলিশের!

চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া থানা-পুলিশের সদস্যরা ভেজাল ও নিম্নমানের খাদ্যপণ্য বিক্রির অভিযোগ তুলে গণহারে চাঁদাবাজি করছে বলে অভিযোগ করেছেন চাক্তাই রাজাখালী এলাকার কিছু ব্যবসায়ী। তারা বলেছেন, বাকলিয়া থানায় কর্মরত পাঁচজন এসআই এক মাস ধরে ব্যবসায়ীদের অতিষ্ঠ করে তুলেছেন। গভীর রাতে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গুদামে হানা দিয়ে নিম্নমানের পণ্য বিক্রির অভিযোগ তুলে লাখ লাখ টাকা আদায় করছেন এই পুলিশ কর্মকর্তারা। গতকাল সোমবার বেলা ১১টায়ও রাজাখালী এলাকায় কথিত অভিযানে যান বাকলিয়া থানার এসআই আসাদুল্লাহসহ আরও কিছু পুলিশ সদস্য।

এ সময় আপেল মার্কা ‘আরজে সেমাই’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে হানা দেন তারা। ময়দা নিম্নমানের, ট্রেড লাইসেন্স না থাকা এমন বিভিন্ন অভিযোগ তুলে প্রতিষ্ঠানের মালিক রাকিবকে ধরে থানায় নিয়ে যান এসআই আসাদুল্লাহ। বেলা ১১টা থেকে গতকাল এই প্রতিবেদন লেখার সময় (সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত) রাকিবকে থানায় ‘আটক’ করে রাখা হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বাকলিয়া থানায় ‘আটক’ অবস্থা থেকে রাকিব মোবাইল ফোনে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আজ বেলা ১১টার দিকে এসআই আসাদুল্লাহসহ কিছু পুলিশ কনস্টেবল আমার প্রতিষ্ঠানে আসেন। এ সময় এসআই আসাদুল্লাহ আমার প্রতিষ্ঠানের ময়দার মান খারাপ বলে অভিযোগ করে আমাকে থানায় এনে আটক করে রেখেছেন। আমি তাদের বলেছি, আমার প্রতিষ্ঠানের জন্য পণ্য কেনার সব কাগজপত্র আমার কাছে আছে। আমার এবং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা মামলা নেই। তবুও কেন আমাকে থানায় বসিয়ে রাখা হয়েছে।’

রাকিবকে থানায় ধরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে এসআই আসাদুল্লাহ বলেন, ‘আজ সকালে রাজাখালী এলাকায় গিয়েছিলাম জমিজমা-সংক্রান্ত একটি মামলার তদন্ত করতে। এ সময় রাকিবের প্রতিষ্ঠানে যাই। থানার সেকেন্ড অফিসার তাকে (রাকিব) থানায় আনতে বলেছেন।’

রাকিবের এবং তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে থানায় কোনো অভিযোগ বা মামলা নেই। তা ছাড়া গতকাল সেখানে ভেজালবিরোধী কোনো অভিযানও হয়নি, তাহলে কেন রাকিবকে থানায় নিয়ে আটক করে রাখলেন? এমন প্রশ্ন করলে এসআই আসাদুল্লাহ বলেন, সেকেন্ড অফিসার বিস্তারিত জানাবেন।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে জানান, গত এক মাসের ব্যবধানে চাক্তাই-রাজাখালী এলাকার বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক-কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রায় আট লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছেন আলোচ্য পুলিশ কর্মকর্তারা। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে গতকাল রাতে নিজেদের ব্যবসায়ী সংগঠন চাক্তাই শিল্প ও বণিক সমিতি কার্যালয়ে জরুরি বৈঠক ডাকেন ভুক্তভোগীরা।

তাদের মধ্যে অন্যতম মেসার্স জননী পোলট্রি অ্যান্ড ফিশ ফিডের মালিক রিকু সেন অভিযোগ করে বলেন, ‘এক মাস ধরে বাকলিয়া থানার সাব-ইন্সপেক্টর আমীর হোসেন, মোরশেদ, বেলাল, আসাদ উল্লাহ ও তাজুল ইসলাম বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গভীর রাতে অভিযান পরিচালনার নামে ব্যবসায়ীদের অতিষ্ঠ করে তুলেছেন। ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্য বিক্রির অভিযোগ দিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এভাবে এক মাসে ৮-১০টি প্রতিষ্ঠান থেকে অন্তত আট লাখ টাকা চাঁদাবাজি করেছেন এই পাঁচ সাব-ইন্সপেক্টর।’

এক মাস ধরে চাঁদাবাজি চললেও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ না দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে ব্যবসায়ী রিকু সেন বলেন, ‘আমরা আজ রাতে সমিতির কার্যালয়ে বিষয়টি নিয়ে বসব। এরপর সিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করব।’

ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে পুলিশ চাঁদা আদায় করেছে সেগুলো হলো মেসার্স জননী পোলট্রি অ্যান্ড ফিশ ফিড, আবদুল্লাহ এন্টারপ্রাইজ, চাল ব্যবসায়ী আহমদ হোসেন, মেসার্স দেলোয়ার সওদাগরের সেমাই ফ্যাক্টরি, রাজাখালী রোডের আক্কাস সওদাগর ও মেসার্স জয়নাল সওদাগরের ময়দার ফ্যাক্টরি।

ভুক্তভোগী আহাম্মদ নুর সওদাগর অভিযোগ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিম্নমানের চাল মজুদের অভিযোগ তুলে ১৬-১৭ দিন আগে এসআই আমীর আমার কাছ থেকে ৮০ হাজার টাকা নিয়ে যান। এর ২০-২২ দিন আগে চাল গুদামজাত করার সময় একই অজুহাত তুলে আমার প্রতিষ্ঠানের ক্যাশিয়ার শফির কাছ থেকে সাব-ইন্সপেক্টর মোরশেদ আড়াই লাখ টাকা নিয়েছেন।’

মেসার্স জননী পোলট্রি অ্যান্ড ফিশ ফিড, প্রোপ্রাইটর রিকু সেন অভিযোগ করে বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমার প্রতিষ্ঠানের জন্য আনা ছোলা, মসুর ডাল ও সরিষা ট্রাক থেকে গুদামে নেওয়ার সময় নিম্নমানের অভিযোগ তুলে সাব-ইন্সপেক্টর আমীর হোসেন ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন।’

ভুক্তভোগী রাজাখালী এলাকার পেঁপে মার্কা সেমাই কারখানার মালিক দেলোয়ার সওদাগর বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠানে মজুদ থাকা ময়দার মান নিম্নমানের বলে অজুহাত তুলে ৬৫ হাজার টাকা নিয়েছেন বাকলিয়া থানার সাব-ইন্সপেক্টর আমীর হোসেন।’

ব্যবসায়ীরা জানান, একইভাবে মেসার্স আবদুল্লাহ এন্টারপ্রাইজের মালিক সোহাগের গুদামে ‘অভিযান’ চালিয়ে নিম্নমানের মৎস্য খাদ্য বিক্রির অভিযোগ তুলে ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা আদায় করা হয়। সোহাগের গুদামে ‘অভিযানের’ নেতৃত্ব দেন এসআই বেলাল, এসআই আমীর হোসেন ও এসআই তাজুল। রাজাখালী রোডের জনতা বিল্ডিংয়ের সামনে মেসার্স জয়নাল সওদাগরের সেমাই ফ্যাক্টরির ময়দার মান খারাপ বলে আদায় করা হয় ১০ হাজার টাকা, মুসলিম বেকারি গলিতে মেসার্স আবুল কালাম ফিড মিলের পণ্য ট্রাক থেকে নামানোর সময় নেওয়া হয় ১০ হাজার টাকা, রাজাখালী রোডের তেল ব্যবসায়ী আক্কাস সওদাগর থেকে নেওয়া হয় ৬৫ হাজার টাকা এবং চাক্তাই মুসলিম বেকারি গলির ভেতরে ঘি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কুইন কাউ নামক কারখানা থেকে এসআই আমীর নেন ৭০ হাজার টাকা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মনি বেগম, মোহাম্মদ কালু ও মো. আকাশ নামে তিনজন মাদক কারবারি চক্রের সদস্য। রাজাখালী ফায়ার সার্ভিস এলাকায় জুয়ার আসর চালায় কালু। স্থানীয় মুসলিম বেকারি গলি এলাকায় মাদক বিক্রি করে মনি বেগম। কিছু পুলিশের সঙ্গে তাদের সখ্য রয়েছে। পুলিশের সঙ্গে সখ্যকে পুঁজি করে চাক্তাই এলাকার বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের তারা নিয়মিত হয়রানি ও চাঁদাবাজি করছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠায় বাকলিয়া থানার এসআই আমীর হোসেনকে কিছুদিন আগে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে।

তবে বাকলিয়া থানার ওসি আবদুর রহিমের দাবি, পদোন্নতি পাওয়ার পর এসআই আমীরকে কিছুদিন আগে সদরঘাট থানাধীন মাদারবাড়ী ফাঁড়ির ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গত রবিবার রাত পৌনে ৮টার দিকে এসআই আমীর হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

এদিকে নিজের থানায় কর্মরত পাঁচ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে এমন চাঁদাবাজির অভিযোগ শুনে বিস্মিত হয়েছেন ওসি আবদুর রহিম। তিনি পাল্টা প্রশ্ন রেখে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ একটা সুশৃঙ্খল বাহিনী। এটা কি মগের মুল্লুক? ব্যবসায়ীরা কেন পুলিশকে বারবার টাকা দেবেন? তারা আমাকে জানাননি কেন? তবে অভিযোগের সত্যতা পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ওসি আবদুর রহিমের সঙ্গে কথা বলার কিছুক্ষণ পর অভিযোগকারীদের নাম-ঠিকানা ও মোবাইল ফোন নম্বর তাকে (ওসি) হোয়াটসঅ্যাপে দেন এই প্রতিবেদক। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলারও অনুরোধ করা হয়। এক ঘণ্টা পর গতকাল সন্ধ্যায় কল করলে ওসি আবদুর রহিম বলেন, ‘ভাই আমি অন্য কাজে ব্যস্ত আছি।’