পণ্য সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এর সঙ্গে সমন্বয় করে পণ্যমূল্য বাড়ানো যায়নি। ফলে প্রকৃত মুনাফা অনেক কমে গেছে। কিন্তু ব্যবসায় মুনাফা কমে গেলে কিংবা ক্ষতি হলেও বিদ্যমান টার্নওভার কর ব্যবসায়ীদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাটের আওতাবহির্ভূত ব্যবসায়ের বার্ষিক টার্নওভারের ঊর্ধ্বসীমা তিন কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে চার কোটি টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)।
গতকাল বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আয়োজিত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় এমন প্রস্তাব করেছে বিসিআই। এ সময় এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট আলোচনাকালে প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, মোট লাভ খাতভিত্তিক নির্ধারণ করা হয়, যা যুক্তিসংগত নয়। আবার মোট লাভ কমলে অথবা ব্যবসায় লস হলে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। এমনকি পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় বিক্রি কম হলেও কর কর্তৃপক্ষ বিবেচনায় নিতে রাজি হয় না এ ধারণার সমাপ্তি টানা দরকার। তিনি বলেন, ব্যবসায় ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও টার্নওভার কর নির্ধারণ করা হয়ে থাকে, যা প্রতিষ্ঠানের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। আয়কর আইনের ৮২ সি-ধারা অনুসারে সর্বনিম্ন কর হিসেবে উৎসে কর কর্তন করা হয়ে থাকে। কিন্তু পরে তা আবার অ্যাসেসমেন্ট নেওয়া হয়। আমরা উৎসে কর চূড়ান্ত কর দায় হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব করছি।
বিসিআইয়ের প্রস্তাবে সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তন না করা হলে তা অন্যান্য উৎসের আয় হিসেবে বিবেচিত হওয়ার বিধান বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে শূন্য থেকে ৩ শতাংশ উৎস কর নির্ধারণ এবং মাইক্রো, কুটির ও ক্ষুদ্রশিল্প খাতে সব ধরনের ইউটিলিটির ওপর ভ্যাট অব্যাহতি চেয়েছে সংগঠনটি। বিসিআইয়ের প্রস্তাবে ক্ষুদ্রশিল্প এবং নারী উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে খাতভিত্তিক যৌথ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ডেড-ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রদান, তরুণ শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য ন্যূনতম পাঁচ বছর কর অবকাশ প্রদান এবং পরে ১০-১৫ শতাংশের মধ্যে কর নির্ধারণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
অন্যান্য বাণিজ্য সংগঠনের মতো বিসিআইও আড়াই শতাংশ কমানোর দাবি জানিয়েছে। এ ছাড়া সব রপ্তানি খাতে সমহারে উৎসে শূন্য দশমিক ১ শতাংশ এবং আয়কর ১০ শতাংশ নির্ধারণ, করব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে ডিজিটাল করা, ডিভিডেন্ডের ওপর কর ১০ শতাংশ করা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ২ শতাংশ কর রেয়াতের সুবিধা চাওয়া হয়েছে। ব্যক্তি খাতে করমুক্ত আয়ের সীমা পাঁচ লাখ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছে বিসিআই।
এদিকে নিরীক্ষকদের সংগঠন দি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেনস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) তাদের বাজেট প্রস্তাবে অনলাইন ডিজিটাল মধ্যস্থতা পরিষেবা প্রদানকারীদের ‘ডিজিটাল পরিষেবা কর’ (ডিএসটি) দেওয়ার জন্য দায়বদ্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ছাড়া অনাবাসীর শেয়ার আয়ের বিপরীতে উৎসে কর কর্তন, কর প্রশাসনের স্বয়ংক্রিয় করা, অন্যান্য সংবিধিবদ্ধ সংস্থার সঙ্গে অটোমেশন, কর অব্যাহতি নীতি ও কর হার নির্ধারণ, আগাম কর ধাপে ধাপে বিলুপ্তি, মূসক চালান আধুনিকীকরণ ও একত্রীকরণ, ভ্যাট সিস্টেমের প্রতিটি স্তরে ডিজিটালাইজেশন এবং ভ্যাট সফটওয়্যার বাধ্যতামূলক ব্যবহারের জন্য সীমাবর্ধিতকরণের অনুরোধ জানিয়েছে।
নতুন কাস্টমস আইন বাস্তবায়ন, অ্যাসাইকুডাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা, অনলাইন বা ই-ডেলিভারির মাধ্যমে কেনা সফটওয়্যারকে সেবা হিসেবে গণ্য করা ও মূলধনি যন্ত্রপাতির ওপর আমদানি শুল্ক আরোপ না করার প্রস্তাবও দিয়েছে আইসিএবি।
বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমএ) সরবরাহ পর্যায়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণের পাশাপাশি সেল্ফ কপি পেপারের শুল্ককরসহ অন্যান্য শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেছে। বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশন সব পর্যায়ে আমদানি শুল্ক ২০ শতাংশ ও করপোরেট কর ৫ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছে।
বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন ভোক্তাপর্যায়ে অটোগ্যাসের বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে সংযোজিত মূসক প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে। এ ছাড়া এলপিজি গ্যাসাধার উৎপাদনে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও যন্ত্রপাতি আমদানিপর্যায়ে শুল্কমুক্ত চায় সংগঠনটি।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যামিউজমেন্ট পার্কস অ্যান্ড অ্যাট্রাকশনস (বাপা) পর্যটন ও বিনোদন পার্কের উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির আয়কর কমানো এবং প্রচলিত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূসকের স্থলে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে।
প্রাক-বাজেট আলোচনায় সবার বক্তব্য শোনার পর তা বিবেচনা করার আশ্বাস দেন এনবিআর চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, আমাদের সামনে রয়েছে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের সক্ষমতার জায়গা তৈরি করতে হবে। এজন্য যুগোপযোগী শিল্পায়ন যেমন করতে হবে, তেমনি করের আওতাও বাড়াতে হবে। আমাদের কাছে যেসব প্রস্তাবনা এসেছে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সবকিছু বাস্তবায়ন করতে পারব না। কিন্তু ভবিষ্যতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে আগামীতে বিষয়গুলো বিবেচনা করা হবে।