বিএনপির নজরে ‘তৃণমূল বিএনপি’

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে রাজনীতিতে নানা মেরুকরণ চলছে। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে বিএনপির নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণার মধ্যে হঠাৎ প্রয়াত ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার গড়া তৃণমূল বিএনপিকে নিবন্ধন দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

তৃণমূল বিএনপির কার্যক্রমের বিষয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা গত মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে সরকারের ওপর দেশি-বিদেশি চাপ রয়েছে। আমাদের আশঙ্কা বিএনপি না গেলে তৃণমূল বিএনপিকে নির্বাচনে নিয়ে আসতে পারে সরকার। দলটির কিছু নেতাকে চাপ দিয়ে বা লোভ দেখিয়ে তারা নির্বাচনে নিতে পারে। সরকারের অপচেষ্টা রোধে বিএনপির নেতারা তীক্ষè নজর রাখছে “তৃণমূল বিএনপি”র নেতাদের ওপর।’ 

তৃণমূল বিএনপি ও জাতীয় ইনসাফ কায়েম কমিটির কার্যক্রমের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নানা মেরুকরণ চলছে। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না ঘোষণা দেওয়ার পর দেশি-বিদেশি চাপে পড়েছে সরকার। আবারও যেনতেন নির্বাচন করতে চায় সরকার। তবে এসব করে লাভ হবে না। যেনতেন নির্বাচন আমরা হতে দেব না। পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছি।’

গত ১৬ ফেব্রুয়ারি আদালতের নির্দেশে হুদার তৃণমূল বিএনপিকে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে ইসি। দলটির প্রতীক ‘সোনালি আঁশ’। নিবন্ধন পাওয়ার পর ২০ ফেব্রুয়ারি দলটির চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। দলটির নেতৃত্বে এখন কে আসবে তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে।

তৃণমূল বিএনপির কার্যক্রম সম্পর্কে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার জন্য সরকারের ওপর দেশি-বিদেশি চাপ আছে। তৃণমূল বিএনপিকে নির্বাচনে নিতেই তাদের নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিএনপি নির্বাচনে না গেলে তা বৈধতা পাবে না।’

যেভাবে নিবন্ধন পায় তৃণমূল বিএনপি : ১৯৯১ সালে ও ২০০১ সালে দুই দফায় খালেদা জিয়ার সরকারে মন্ত্রী ছিলেন নাজমুল হুদা। ২০১২ সালে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে বিএনএফ নামে নতুন দল গঠন করেন হুদা। পরে সেই দল থেকে তাকে বহিষ্কার করে দলটির প্রধান সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ। তিনি ২০১৪ সালে ঢাকা-১৭ আসন (গুলশান-বনানী-সেনানিবাস এলাকা) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

এরপর বাংলাদেশ ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স (বিএনএ) ও বাংলাদেশ মানবাধিকার পার্টি (বিএমপি) নামে দল গঠন করেন নাজমুল হুদা। একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে কে এম নূরুল হুদার ইসির সময় নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছিল তৃণমূল বিএনপি। তখন নিবন্ধন মেলেনি। এরপর আদালতের দ্বারস্থ হন নাজমুল হুদা। ১৯ ডিসেম্বর প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ রাজনৈতিক দল হিসেবে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার ‘তৃণমূল বিএনপি’কে নিবন্ধন দিতে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে। এর আগে ৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘উচ্চ আদালতের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে তৃণমূল বিএনপিকে যত দ্রুত সম্ভব নিবন্ধন দেওয়া হবে।’ ১৬ ফেব্রুয়ারি আদালতের নির্দেশে হুদার তৃণমূল বিএনপিকে নিবন্ধন দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্বাচন কমিশন। দলটিকে প্রতীক দেওয়া হয় ‘সোনালি আঁশ’।

তৃণমূল বিএনপির পর ১৬ মার্চ রাজধানীর বনানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে লেখক ও কবি ফরহাদ মজহার ও সাংবাদিক শওকত মাহমুদের নেতৃত্বে জাতীয় ইনসাফ কায়েম কমিটি নামে একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এতে যুক্ত হয় সরকারবিরোধী একাধিক রাজনৈতিক দল। সংগঠনটির অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গী নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণ অধিকার পরিষদের আহ্বায়ক ড. রেজা কিবরিয়া ও এলডিপির একাংশের চেয়ারম্যান অলি আহমদ। নৈশভোজে অংশ নেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী, অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ, সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিন আলী ও সাংবাদিক নেতা ইলিয়াস খান।

অনুষ্ঠানে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘অবিলম্বে অন্তর্র্বর্তীকালীন জাতীয় সরকার গঠন করতে হবে। তথাকথিত ‘সুষ্ঠু’ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যার সমাধান হবে না। কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে গিয়ে ন্যাশনাল কমিটি ফর সিভিল রাইটস গঠন করা হয়নি।’

সংগঠনের সদস্য সচিব শওকত মাহমুদ সংগঠনের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এতে বলা হয়, ‘জনগণের অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে নতুনভাবে বাংলাদেশ গঠনের এটাই সঠিক পথ। সবাইকে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার এবং এক কাতারে দাঁড়িয়ে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি।’

অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের বিষয়ে মাহমুদুর রহমান মান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তারা কোনো রাজনৈতিক দল করেন না। নির্বাচনেও অংশ নেন না। একটি ডিনার পার্টি ছিল। সেখানে গিয়েছিলাম। মঞ্চে আমার নাম ঘোষণাও করা হয়নি। ফরহাদ মজহার ও শওকত মাহমুদ মঞ্চে ছিলেন। তারাই বক্তব্য রেখেছেন।’

বিএনপির দপ্তরসংশ্লিষ্ট নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাতীয় ইনসাফ কায়েম কমিটির অনুষ্ঠানে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। বিএনপি নেতারা যাতে ওই অনুষ্ঠান বর্জন করে, সে জন্য দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে দপ্তরসংশ্লিষ্ট নেতারা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অনেকে সেই অনুষ্ঠান বর্জন করে। বিএনপির নেতারা বর্জন করলেও সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের কিছু নেতা এতে অংশ নেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন মাহমুদুর রহমান মান্না, গণ অধিকার পরিষদের আহ্বায়ক ড. রেজা কিবরিয়া ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান অলি আহমেদ।’