পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে আনছে পরিবর্তনের বিপদ

চট্টগ্রামের ডিটি-বায়েজীদ সংযোগ সড়ক যা লুপ রোড নামেও পরিচিত। পাহাড় কেটেই নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ এই রোড। এতে এই এলাকার অন্য পাহাড়গুলো যেমন ধ্বংস হয়েছে, তেমনি পরিবেশগত বিপর্যয়ও নেমেছে। এই এলাকায় কমে গেছে বনায়ন ও জীববৈচিত্র্য। এই পরিবর্তনও প্রাকৃতিকভাবে হয়নি। এটা মানুষই ঘটিয়েছে। ঠিক তেমনিভাবে আবহাওয়া ও জলবায়ুগত যত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে তার জন্য মানুষেরই দায় দেখছেন বিশেষজ্ঞেরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শহীদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত মানুষের অবৈজ্ঞানিক কর্মকা-ের ফলাফল হলো আজকের আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব।’

তাহলে কি প্রকৃতি পরিবর্তন হয় না এমন প্রশ্নের জবাবে ড. শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রকৃতিগত পরিবর্তন খুবই ধীর এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় হয়ে থাকে। কিন্তু মানুষ অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ভূমির অসম ব্যবহার, বন ধ্বংস, জলাধার ভরাট, কয়লা ও ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ নানাবিধ কর্মকা-ের কারণে ত্বরান্বিত হচ্ছে এই পরিবর্তন।’

আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মৌসুমভিত্তিক আবহাওয়া এখন আর নেই। চৈত্র-বৈশাখ মাসে বেশি তাপমাত্রা থাকবে, জুলাই-আগস্ট মাসে বেশি বৃষ্টিপাত হবে কিংবা জানুয়ারিতে বেশি শীত অনুভব হওয়ার কথা থাকলেও তা এখন আর নেই। এখন মার্চে এসেও শীতের অনুভব হচ্ছে, পরিবর্তন হয়ে গেছে বাতাসের গতিবেগ। আর এর সবকিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছে এখন আর আবহাওয়া আগের মতো নেই। দেশে গত বছর স্বাভাবিকের চেয়ে বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। শীতের মৌসুমেও শীত তেমন দেখা যায়নি।

এ বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রের আবহাওয়াবিদ কামরুল হাসান বলেন, ‘আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের জন্য প্রকৃতি না যতটুকু দায়ী মানুষ এরচেয়ে বেশি দায়ী।’

মানুষ কীভাবে দায়ী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আবহাওয়ার পরিবর্তনের প্রধান মাপকাঠি হলো তাপমাত্রা। আমরা অধিকহারে জীবাশ্ম জ¦ালানি (পেট্রোল, ডিজেল) ব্যবহার করছি। এতে বায়ুম-ল দ্রুত উত্তপ্ত হচ্ছে। এছাড়া প্রতিটি ভবনে এসির (শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র) ব্যবহার বেড়েছে, আমরা কয়লা ও ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র সচল রাখছি। এতে আমাদের তাপমাত্রা বাড়ছে এবং আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনে নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।’

তিনি আরও বলেন, বিশে^ এখন বৈদ্যুতিক চার্জের গাড়ি চালু হয়েছে। তাই আমাদেরও ডিজেল ও কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবর্তে জলবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ ও সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে হবে। তবেই তাপমাত্রা বৃদ্ধি কমে আসবে।

আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, চীন, নেপাল ও ভুটানের আড়াই হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকাজুড়ে হিমালয়ে বরফাকারে জমা রয়েছে প্রায় ১২ হাজার কিউবিক কিলোমিটার পানি। পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর বাইরে বরফের সবচেয়ে বড় আস্তরণ জমা রয়েছে এই হিমালয়ে। আর বরফগলা এই পানি পাথুরে পাহাড়ের মধ্য দিয়ে ভাটির দেশ (নেপাল, ভারত, বাংলাদেশ) হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ে। কিন্তু হিমালয়ের বরফ গলা পানি অনেকাংশে ভাটির দেশে আসছে না। ভারত যেমন বাংলাদেশের নদীর উজানে বাঁধ দিয়ে বরফগলা পানি নিয়ে নিচ্ছে এবং তেমনিভাবে উজানের অনেক দেশের এই বাঁধের কারণে ভাটিতে আসছে না পানি। এতে স্বাদু পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বেড়ে যাচ্ছে সাগরের লবণাক্ত পানির প্রভাব এবং উপকূলে প্রবেশ করছে সেই লবণ পানি।

এদিকে সাগরের লবণাক্ত পানির প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় চট্টগ্রামসহ দেশের উপকূলীয় এলাকার মাটিতে লবণাক্ততা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। লবণাক্ততার কারণে অনেক এলাকার কৃষিজমিতে ধানচাষ করা যেমন সম্ভব হয় না, খাবার পানির সংকটও দেখা দিচ্ছে। চট্টগ্রাম মহানগরীর হালিশহর ও পতেঙ্গা উপকূলে যেমন গভীর নলকূপে লবণ পানি পাওয়া যায়, তেমনিভাবে দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গের সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপজেলার গাবুরাসহ পুরো উপকূলীয় এলাকার নলকূপেও লবণ পানি পাওয়া যায়।

উজান থেকে নদীর পানি প্রত্যাহারের কথা উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিজাস্টার অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘পাহাড়ি ঝরনাগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে, উজান থেকে আসা নদীগুলোতে ওপরের দেশগুলো বাঁধ দিয়ে পানি ব্যবহার করায় কমে যাচ্ছে পানির উৎস, শিল্প ও পয়ঃবর্জ্যরে দূষণে সুপেয় পানির স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে গ্রামাঞ্চলের পুকুর ও দিঘি ভরাট হয়ে যাচ্ছে, শহরাঞ্চলের পতিত জমিগুলো ভরাট হয়ে নির্মিত হচ্ছে বহুতল ভবন উল্লেখ করে ড. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘নদী, পুকুর ও খালগুলো একসময় পানির আধার ছিল। শুষ্ক মৌসুমে এসব আধার থেকে পানি মাটিতে রিচার্জ হতো। এসব পুকুর ও জলাশয় ভরাট করেছি আমরা। নগর পরিবেশে এসব জলাধার পরিবেশকে অধিক তাপমাত্রা থেকে রক্ষা করে।’