ক্ষমতাকে সেবার সুযোগ হিসেবে দেখি : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তার সরকার ক্ষমতাকে জনগণের সেবা করার সুযোগ হিসেবে দেখে। তিনি ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৩ প্রদান অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন।

সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমরা ক্ষমতাকে জনগণের সেবা করার সুযোগ হিসেবে দেখি। অনেক বাধা-বিপত্তি মোকাবিলা করে ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকায় দেশের উন্নয়ন করা সম্ভব হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক ও তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যার পর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বারবার বাধাগ্রস্ত হয় এবং স্থিতিশীলতার অভাবের কারণে বাংলাদেশ এর আগে খুব একটা অগ্রগতি দেখতে পায়নি।’

দেশের সার্বিক উন্নয়নে তার সরকারের সময়োপযোগী ও সুপরিকল্পিত পদক্ষেপের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, ‘বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জন করেছে। কারণ আমরা কখনো অ্যাডহক ভিত্তিতে কোনো পরিকল্পনা নিইনি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অক্ষুন্ন রেখে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছি। সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী পরিকল্পনা নিয়ে আমরা সবকিছু করেছি। পরিকল্পনার ক্ষেত্রে আমরা সবসময় দেশের জনগণের কল্যাণকে প্রাধান্য দিই।’

এ বছর ৯ বিশিষ্ট ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ জাতীয় বেসামরিক পুরস্কার ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। মুক্তিযুদ্ধ ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) শামসুল আলম, প্রয়াত লেফটেন্যান্ট এজি মোহাম্মদ খুরশীদ (মরণোত্তর), শহীদ খাজা নিজামউদ্দিন ভূঁইয়া (মরণোত্তর) এবং মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী (মায়া) বীরবিক্রম।

‘সাহিত্য’ ক্যাটাগরিতে প্রয়াত ড. মোহাম্মদ মাইনুদ্দিন আহমেদ (সেলিম আল দীন) (মরণোত্তর) এবং ‘সাংস্কৃতিক’ এবং ‘ক্রীড়া’ ক্যাটাগরিতে যথাক্রমে পুরস্কার পেয়েছেন পবিত্র মোহন দে এবং এএসএম রকিবুল হাসান। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর ‘সমাজ সেবা/জনসেবা’ বিভাগে এবং ‘গবেষণা ও প্রশিক্ষণ’ ক্যাটাগরিতে বেগম নাদিরা জাহান (সুরমা জাহিদ) এবং ড. ফেরদৌসী কাদরী পুরস্কার পেয়েছেন।

এর আগে ৯ মার্চ স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। পুরস্কারপ্রাপ্তরা প্রত্যেকে একটি করে স্বর্ণপদক, একটি সার্টিফিকেট এবং সম্মানী চেক পেয়েছেন।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এবং পুরস্কারপ্রাপ্তদের সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত তুলে ধরেন। পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে ড. ফেরদৌসী কাদরী অনুষ্ঠানে তার নিজস্ব অনুভূতি ব্যক্ত করেন।

বাংলাদেশকে একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে তার সরকার ‘রূপকল্প-২০২১’ বাস্তবায়নে প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০-২১ ও পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভের পর তার সরকার এখন ‘রূপকল্প ২০৪১’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও ‘স্মার্ট বাংলাদেশে’ পরিণত করতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও সরকার একটি দীর্ঘমেয়াদি ‘ডেল্টা প্ল্যান-২১০০’ গ্রহণ করেছে, যাতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম অন্যের ওপর নির্ভর না করে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে উন্নত ও সম্মানজনক জীবন কাটাতে পারে। 

সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমরা খেলাধুলা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, অর্থনীতি এবং অন্যান্যে প্রতিটি ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু করছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার দারিদ্র্য ৪০ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে এনেছে ও মাথাপিছু আয় বাড়িয়েছে। আমরা সম্ভবত একটি বিশ্লেষণের পর দারিদ্র্য হ্রাস সম্পর্কে কিছু সুসংবাদ দেব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ দিয়েছে এবং প্রত্যেক গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষকে বিনামূল্যে বাড়ি দিচ্ছে। জনগণের দোরগোড়ায় সঠিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিচ্ছে এবং প্রতিটি খাতে অগ্রগতির লক্ষ্যে গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেÑ যার মধ্যে কৃষি, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও বিজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

দরিদ্রদের জন্য খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি সম্পর্কে তিনি বলেন, সরকার পারিবারিক কার্ডের মাধ্যমে এক কোটি মানুষকে প্রতি কেজি ৩০ টাকা ভর্তুকি দিয়ে চাল দিচ্ছে ও অন্য ৫০ লাখ মানুষকে ১৫ টাকা কেজি দরে চাল দেওয়া হচ্ছে।

রমজান মাসে সরকার আরও ৫০ লাখ মানুষকে (প্রতি কেজি ১৫ টাকায়) চাল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, চাল দেওয়ার পাশাপাশি রমজান মাসে (দরিদ্রদের জন্য ভর্তুকি মূল্যে) ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি ও ছোলাসহ আরও কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। আমরা সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নিচ্ছিÑ যাতে রমজানে কাউকে খাবারের জন্য কষ্ট করতে না হয়।

শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দারিদ্র্য ও ক্ষুধা, বৈষম্য ও নিপীড়নমুক্ত একটি দেশ বিনির্মাণে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে সবকিছুই করেছে। জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে দুস্থ মানুষকে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও সুন্দর জীবন দিতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাংলাদেশের অগ্রগতি থেমে যায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস ও ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়।’

৩ বছর পর সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী : তিন বছরেরও বেশি সময় পর পর সচিবালয়ে গেলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্বাধীনতা পদক প্রদান অনুষ্ঠান শেষে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি সচিবালয়ে প্রবেশ করেন। দুপুর আড়াইটার দিকে তিনি সচিবালয় ত্যাগ করেন।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০২০ সালের মার্চে করোনা ভাইরাস মহামারী শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে এসেছিলেন।

এর মধ্যে গত বছরের ২৪ নভেম্বর সচিবালয়ে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার) ও সচিব সভায় প্রধানমন্ত্রীর সশরীরে উপস্থিত হওয়ার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল হয়। দুটি সভায়ই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে হয়েছিল।

গতকাল প্রধানমন্ত্রী ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠান শেষে সচিবালয়ে ৬ নম্বর ভবনের (২০ তলা ভবন) ১৩ তলায় তার কার্যালয়ে যান। সেখানে তিনি অফিস করেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেখানে দেখা করেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন।

প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে আসার বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (মন্ত্রিসভা ও রিপোর্ট অনুবিভাগ) সৈয়দা সালমা বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ের তার অফিসে বসেছিলেন। তবে স্পেসিফিক কোনো মিটিং করেননি।’