বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অন্তরের আত্যন্তিক মিল, যা সহজেই অনুমেয়। বার মাস ও ছয় ঋতুর আবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি কেবলই রূপ বদলায়। বাইরের সেই রূপান্তর মানুষের চিত্তেও আনে রূপান্তর। অন্তরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা প্রকৃতির রূপ বদলের সঙ্গে মানুষের সুখ-দুঃখের অনুভূতিতে পরিবর্তন আনে। প্রকৃতিকে মানুষ তাই তার সুখ-দুঃখের ভাগী করে নিয়েছে।
বার মাস ও ছয় ঋতুর আবর্তনের ভেতর দিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের মনের যে যোগ স্থাপিত হয় আমাদের লোকসাহিত্যে তার নানা প্রকাশ ঘটেছে। এদিক দিয়ে সারি গান লোকসাহিত্যের শাখা লোকসংগীতে স্থান করে নিয়েছে। আর যে লোকায়ত জীবন, যে লোকসংস্কৃতি আমাদের উন্নত ও অভিজাত সাহিত্য, সমাজ ও সভ্যতার উৎস, সারি গান সেই জীবন, সভ্যতা ও সংস্কৃতির অন্যতম আধার।
নড়াইল জেলার লোকসংস্কৃতিতে সারিগান একটি অন্যতম সংযোজন। জীবনের অনুষঙ্গ হিসেবে পরিবেশিত এ গান শ্রমসংগীত হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে । এ পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের এবারের পরিবেশনা ‘নড়ইিলের সারি গান।’
সারি গান বিশ্বের সব ভাষা ও সাহিত্যে দেখা যায়। তবে এই শ্রেণির গীত সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বাংলা সাহিত্যে ও বাংলাদেশে। বাংলাদেশে বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন যুগ ও সময়ের সারি গান এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সারি গান মূলত এক ধরনের কর্মসংগীত। লোকসংগীতের ধারাই সারি গানের উদ্দীপনা। ছাদ পেটানোর সময়, নৌকা বাইচের প্রতিযোগিতায়, ক্ষেতে কাজ করার সময় বা ধান ভানার ক্ষেত্রে সারি গান গাওয়া হয়। সারি গান অনেক সময় আমাদের জীবনবোধের কথা মনে করিয়ে দেয়। ইতিহাস, ধর্মকথার আশ্রয়ে রচিত হয় স্বভাব কবিদের রচিত এ গীত। এ ধরনের একটি সারি গান নড়াইল সদর উপজেলা থেকে সংগৃহীত, যা বিপিন সরকার রচিত।
রাবণের শক্তিশেলে লক্ষণ পৈলো
গাও তোলোরে ও ভাই লক্ষণ রাম কেঁন্দে মলো।।
ওই ওরে- পিতৃসত্য পালন করতে আমি এলাম বন
সঙ্গে এলো সীতাসতী অনুজ ভাই লক্ষণ।।
বনবাসে এলাম আমি দেশে মলো পিতা,
পঞ্চবটি বনে এসে হারা হইলাম সীতা,
সীতা গেলে সীতা পাবো প্রতি ঘরে ঘরে,
প্রাণের ভাই লক্ষণ হারালে, ভাই বলিবো কারে।। গাও-তোলো গাও-তোলো লক্ষণ চলো দেশে নাই,
এ সংসারে মিলবে নারে তোমার মতো ভাই।।
বাংলাদেশের সর্বত্র সারি গান অত্যন্ত জনপ্রিয়। আমাদের লোকসাহিত্যের সারি গানে সাধারণত আধ্যাত্মিক, বীরত্বব্যঞ্জক, হালকা প্রেমমূলক বিষয় সন্নিবিষ্ট হয়। এমন কিছু তথ্য আছে, যা সাহিত্যিক, সামাজিক এবং ঐতিহাসিক দিক থেকে মূল্যবান। কর্মরত অবস্থায় সারি গান সমবেতভাবে পরিবেশিত হয়ে থাকে। নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলা থেকে সংগৃহীত একটি গান উদ্ধৃত করছি :
জয় বাংলা বলিয়া আমরা গেয়ে যাব দেশের গান
হারে আমরা বাংলা মায়েরই সন্তান।।
ওরে বাংালাদেশের নদী করে সাগরের সন্ধান
হাল ধরে পাল তুলে মাঝি গাহে সারিগান রে ।।
ওরে বাংলাদেশের মাঠেঘাটে ফলে সোনার ধান
আমাদেরি খাটনির ফসল, বিশ্বপতির দান রে ।।
ওরে বিশ্বকবি সোনার বাংলা রেখেছিলো নাম
কবি নজরুল গেয়ে গেলো বাংলার জয়গান রে।।
হিন্দু মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান এক মায়ের সন্তান
বাংলা মায়ের গুণে মোদের নাইকো অভিমান রে।।
অসীম বলে বাংলা মায়ের চরণে জানাই
চির নির্বাণ হলে মাগো বক্ষে দিও ঠাঁই রে।।
নড়াইল জেলায় এক সময় প্রচুর সারি গান শোনা যেত। যার সুর টানাটানা ও চড়া এবং খুব জমাট। নৌকা চালানোর সময়, ছাদ পেটানোর সময়, ধান বা পাট কাটার সময় সমবেত কণ্ঠে যে গান গাওয়া হয় তাকে সারি গান বলে। সারি গানের সঙ্গে শ্রমজনিত কোনো কাজের যোগ থাকে। নদীমাতৃক নড়াইলে মাঝিমাল্লারা এই গান বেশি গেয়ে থাকে। এই গান সাধারণত নৌকা বাইচ, শব্দ তানের পর নৃত্য সহকারে গাওয়া হয়ে থাকে। লোহাগড়া উপজেলার দীঘলিয়া ইউনিয়নের আকরাবাড়ি গ্রামের সন্তোষ বিশ্বাসের একটি সারি গানের দল এখনো বিদ্যমান। আশ্বিন মাসে বিলে কাজ করার সময়, দুর্গাপূজায় এবং বড়দিয়ার নবগঙ্গা ও নড়াইলের চিত্রা নদীতে নৌকা বাইচের সময় সারি গান গেয়ে থাকে এ দলটি। এখানে তা উদ্ধৃত করছি :
সোনার কমল ভাসিয়ে কেরে জলেতে দিলো
আমার মা বুঝি কৈলাসে চলিলো
ঐ ওরে কালী ঘাটের কালী মাগো, কৈলাসে ভবানী,
বৃন্দাবনে রাধে তুমি গোকুলে গোপিনী
যাত্রাকালে সঙ্গে আমার এসেছিলো গুণের ভাই,
ওরে লক্ষণ গা তোলো দেশে যাই।।
বনে মলো বনরাজি, দেশে মলো পিতা
গুণের ভাই ছেড়ে হারা হলাম সীতা।
ওরে লক্ষণ গা তোলো দেশে যাই।।
সীতা গেলে সীতা পাব প্রতি ঘরে ঘরে
গুণের ভাই লক্ষণ হারালে ভাই বলিবো কারে।
ওরে লক্ষণ গা তোলো দেশে যাই
যে কালেতে আইলাম বনে, সীতা ছিলো ছোট
দিনে দিনে বাড়ে সীতা বাকল হলো খাটো।
ওরে লক্ষণ গা তোলো দেশে যাই।
সব শেষে বলি- নড়াইলের সারি গান বাংলার লোকসাহিত্যে বিপুল ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করে আছে। যা লোকায়ত বাংলার চিরায়ত সম্পদ।
জায়েদুল আলম
শিক্ষাবিদ ও লেখক