প্রত্যক্ষদর্শী সিডনি শনবার্গের চোখে সেইদিন

২৫ মার্চ ১৯৭১ পাকিস্তান  সেনাবাহিনী ঢাকায় যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, বিশ্ববাসীর কাছে সে খবর যারা পৌঁছে দিয়েছেন, তাদের অন্যতম নিউ ইয়র্ক টাইমস প্রতিনিধি সিডনি শনবার্গ।

২৭ মার্চ সকালে যে ৩৫ জন সাংবাদিক ও চিত্রগ্রাহককে বলপূর্বক হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে উঠিয়ে তাদের  দেহ ও লাগেজ তল্লাশি করে ফিল্ম ও নোটবই ছিনিয়ে নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে বের করে দেওয়া হয়, সিডনি শনবার্গ তাদের একজন। ২৮ মার্চ নিউ ইয়র্ক টাইমস তার দুটি বড় প্রতিবেদন প্রকাশ করে, প্রথম সংবাদটি তিনি ভারতের বোম্বে থেকে টেলিগ্রাম করে পাঠিয়েছেন। দ্বিতীয়টি দিল্লি থেকে।

১. বিদ্রোহ দমাতে সৈন্যরা কামান দাগাচ্ছে

২. পূর্ব পাকিন্তানে কামানের বিরুদ্ধে লাঠি ও বল্লম

১৯৭১-এ বাংলাদেশ ভূখ- ও সীমান্তের ওপারে কী ঘটেছে, তার বিশ্বস্ত সাক্ষী সিডনি শনবার্গ।

সাংবাদিককে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহিষ্কার করা হয়, সিডনি শনবার্গ তাদের একজন।

বিদ্রোহ দমাতে সৈন্যরা কামান দাগাচ্ছে

সাড়ে সাত কোটি মানুষের এ প্রদেশের স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন নস্যাৎ করতে পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কামান ও ভারী মেশিনগান ব্যবহার করছে।

কোনো রকম সতর্কতা সংকেত না দিয়েই বৃহস্পতিবার শেষ রাতে তারা আক্রমণ শুরু করে। সেনাবাহিনীতে যাদের প্রাধান্য, সেই পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যরা প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকার রাস্তায় নামে; তাদের লক্ষ্য স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান ঘাঁটিগুলো অবরোধ যেমন একটি ঘাঁটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বেসামরিক জনতার ক’জন নিহত হয়েছেন আর জখম ক’জন, তা জানার কোনো উপায় নেই। যদিও ঢাকায় আঘাত হানার আগে দেশের ভেতরে বেসামরিক জনতা ও পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর আসছিল, সেখানে কী ঘটছে, তারও কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না।

ঢাকা শহরের উত্তরাংশের হোটেল থেকে শহরের বিভিন্ন অংশে ভয়ংকর অগ্নিশিখা দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে- বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের ব্যারাক। এটি পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান বাঙালি জনগোষ্ঠীর সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত প্যারামিলিটারি বাহিনী। বেশ কটি স্থানে আগুন তখনো জ্বলছে, বিক্ষিপ্ত গোলাগুলির শব্দ ভেসে আসছে। হোটেলের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে একজন পাকিস্তানি অশ্রু সংবরণ করতে করতে বলল, ‘হায় আল্লাহ, হায় আল্লাহ, সৈন্যরা তাদের হত্যা করছে, তাদের জবাই করছে।’

বাড়িঘরে আগুন

সামরিক ট্রাকবহরের প্রহরায় এয়ারপোর্ট যাওয়ার পথে সাংবাদিকরা দেখলেন, সৈন্যরা রাস্তার দু’পাশের বস্তিতে আগুন দিচ্ছে। সেখানে দরিদ্র বাঙালিদের বাস, যাদের কেউ কেউ স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের জোরদার সমর্থক।

বৃহস্পতিবার রাতে যখন সামরিক অভিযান শুরু হয়, সৈন্যরা অটোমেটিক রাইফেল, মেশিনগান ও রিকয়েললেস রাইফেল দিয়ে বিভিন্ন বাড়ির ওপর গুলিবর্ষণ করে বিজয়ধ্বনি দিয়ে শহরের বিভিন্ন অংশে আগুন ধরিয়ে দেয়।

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থানরত বিদেশি সাংবাদিকরা কী ঘটছে জানার জন্য যখন বাইরে যেতে চান, নতুন করে ব্যাপকভাবে বলীয়ান সৈন্যরা বলপূর্বক তাদের আবার ভেতরে ঢুকিয়ে দেয় এবং তাদের জানায়, যদি কেউ হোটেল ভবনের বাইরে পা দিতে চান, তাহলে তাকে তখনই গুলি করা হবে। হোটেলের সন্নিকটে আগুন বাড়তে থাকে এবং রাত ১টা নাগাদ আগুন গোটা শহরেই ভয়াবহ আকার ধারণ করে। রাত ১টা ২৫ মিনিটে হোটেলের সব ফোন ডেড। বাইরের মিলিটারি গার্ডদের নির্দেশে টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ঠিক একই সময় টেলিগ্রাফ টাওয়ারের বাতিও নিভে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও শহরের অন্যান্য অংশ থেকে ভারী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গোলাগুলির শব্দ ভেসে আসতে থাকে।

বাজারে আক্রমণ

(ইন্টারকন্টিনেন্টাল) হোটেলের সামনে দিয়ে রাত প্রায় ২টা ২৫ মিনিটে মেশিনগানবাহী একটি জিপ এগিয়ে এসে বাম দিকে মোড় নিয়ে একটি বাজারের সামনে থামে।  মেশিনগান দোতলার জানালা বরাবর তাক করা। এক ডজন সশস্ত্র সৈন্য হেঁটে তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। তাদের একটি দল বহন করছে এক ধরনের রকেটজাতীয় অস্ত্র।

দোতলা থেকে চিৎকার ভেসে আসে ‘সব বাঙালি এক হও’। সৈন্যরা ভবনটির ওপর নির্বিচারে অবিরাম গুলিবর্ষণ করতে থাকে। সৈন্যরা তারপর বাজারের গা-ঘেঁষা কানাগলিতে গুলি করতে করতে রাস্তা আটকে রাখা একটি গাড়ি উল্টে দিয়ে এগোয়। সৈন্যদের গুলির ফ্লাশলাইটে দৃশ্যগুলো হোটেলের ১০ তলায় থেকে সাংবাদিকরা দেখছেন। এ এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য।

সৈন্যরা যখন গুলি করতে করতে এগোচ্ছে, প্রায় ২০০ গজ দূরে ১৫-২০ জন যুবক তাদের মুখোমুখি হয়ে চিৎকার করে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। কিন্তু মনে হলো তারা নিরস্ত্র, তাদের হাত খালি। সৈন্যরা তাদের জিপের মেশিনগান যুবকদের দিকে তাক করল, তারপর গুলি চালাল। স্বয়ংক্রিয় রাইফেল হাতে সৈন্যরাও তাদের সঙ্গে যোগ দিল। যুবকরা রাস্তায় দু’পাশে ছায়ায় ছিটকে পড়ল। ততক্ষণে তারা আহত না নিহত, এখান থেকে বলা অসম্ভব।

সৈন্যরা এবার তাদের দৃষ্টি ফেরাল কানাগলির দিকে। তারা গাড়ির স্পেয়ার পার্টসের গ্যারেজে আগুন ধরিয়ে দিল, আপাতদৃষ্টিতে তাদের মূল লক্ষ্য ইংরেজি দৈনিক দ্য পিপল পত্রিকার অফিস ও প্রেসের দিকে এগোনো। পত্রিকাটি শেখ মুজিবের জোরদার সমর্থক, একই সঙ্গে এই পত্রিকা সেনাবাহিনীকে বিদ্রুপ করে যাচ্ছে।

সৈন্যরা পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা উর্দুতে চিৎকার করে সতর্ক করে দিচ্ছে ভেতরে কেউ থাকলে যেন আত্মসমর্পণ করে, নতুবা গুলি করে হত্যা করা হবে। কোনো সাড়া নেই। ভেতর থেকে কেউ বেরিয়ে এলো না। সৈন্যরা দ্য পিপল অফিস ভবন তাক করে রকেট নিক্ষেপ করল, সঙ্গে চলল ছোট অস্ত্র ও মেশিনগানের গুলি। তারপর ভবনে আগুন ধরিয়ে দিয়ে ছাপাখানা ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি ভেঙে চুরমার করতে লাগল। আরও এগিয়ে তারা সব দোকানপাট ও বাজারের ছাপড়ায় আগুন ধরিয়ে দিল। অগ্নিশিখা দোতলা ভবনের ওপর দিয়ে দৃশ্যমান হলো। ভোর ৪টার কিছু পর গোলাগুলি কিছুটা কমে আসে, কিন্তু থেকে থেকে কামানের গোলা ও মেশিনগানের গুলির শব্দ ভেসে আসে। হোটেলের পাশ ঘেঁষে চলে যায় দূর থেকে আসা ট্রেসার বুলেট।

ভোর ৪টা ৪৫ মিনিটে পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস সদর দপ্তরের দিকে আরেকটি বিশাল গনগনে আগুনের কু-লি চোখে পড়ে। ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে ভোরের আবছা আলোয় চোখে পড়ল, চীনে তৈরি ছয়টি টি-৫১ হালকা ট্যাংকে চড়ে সৈন্যরা শহরে ঢুকেছে এবং প্রধান রাস্তাগুলোয় টহল দিতে শুরু করেছে। থেমে থেমে গুলি এবং মাঝে মাঝে কামানের বিস্ফোরণ গতকাল থেকে চলে আসছে, আজ ভোরেও ছিল; যখন সাংবাদিকদের বহিষ্কার করা হচ্ছে, তখন শোনা যাচ্ছে।

গতকাল সকাল থেকে মাথার ওপর হেলিকপ্টার ঘুরছে, আপাতদৃষ্টিতে লক্ষ্যবস্তুর ওপর আক্রমণের জরিপ চালাচ্ছে। (সত্তরের) নভেম্বরে পূর্ব পাকিস্তানে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর দুর্গতদের ত্রাণসহায়তা পৌঁছানোর জন্য সৌদি আরব চারটি হেলিকপ্টার দিয়েছিল। সামরিক অভিযানের জন্য সেই হেলিকপ্টার এখন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে।

ইয়াহিয়া পশ্চিম পাকিস্তানে সকালে সেনাবাহিনীর দখলে চলে যাওয়া ঢাকা  রেডিও থেকে ঘোষণা করা হয় প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান পশ্চিম পাকিস্তানে পৌঁছেছেন এবং রাত ৮টায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন।

ওই দিনই সকাল ৮টার পর পরই একটি কালো ১৯৫৯ মডেলের শেভ্রোলেট, সঙ্গে জিপ ও ট্রাকে সশস্ত্র সৈন্যের বহর নিয়ে হোটেলের সামনে এলো। পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার জন্য এ গাড়ির বহর জুলফিকার আলি ভুট্টো ও তার সঙ্গীদের এয়ারপোর্টে নিয়ে যায়।

(বাকি অংশ আগামীকাল)

লেখক: অনুবাদক ও সাহিত্যিক