যেসব বৈষম্য দেখি না

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৈষম্যের ইতিহাস। দুই পাকিস্তানের মধ্যকার অর্থনৈতিক এবং অধিকারের বৈষম্য মানুষকে স্বাধীনতাকামী করে তোলে এবং যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে আপাত শান্তিপ্রিয় একটি অঞ্চল। যে যুদ্ধে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অংশ নেওয়া কিংবা স্বাধীনতার জন্য ভূমিকা রাখায় লিঙ্গবৈষম্য ছিল না। যদিও স্বাধীনতা-পরবর্তী নারী মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি প্রদান থেকে শুরু করে তাদের ভাতা দেওয়া, যথাযথ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানে ৪০ বছর লেগে যায়। এ ছাড়া শিক্ষা ক্ষেত্র থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বেতন থেকে পদোন্নতি, ছুটি সব ক্ষেত্রে যে বৈষম্য এখনো বিদ্যমান। আমাদের বলা হচ্ছে রাষ্ট্রপ্রধান নারী, সংসদের স্পিকার নারী এবং বিরোধী দলের প্রধান নারী। ব্যস, নারী উন্নয়ন ঘটে গেছে। অথচ তিনজন মাত্র নারী কিংবা ১% নারী বিভিন্ন উচ্চপদে থাকলেই নারীর ক্ষমতায়ন হয় না কিংবা এসব উন্নয়নের সূচক নয়, যেখানে সমতার প্রশ্নে নারীরা বহুগুণ পিছিয়ে আছে স্বাধীনতার ৫২ বছর পরেও। রাজনৈতিক দলগুলোতে মূলধারায় ক’জন নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেছে? মহিলা আসন বাদে মূল সংসদে পুরুষ সংসদ সদস্যদের বিপরীতে কতজন নারী সংসদ সদস্য আছেন? রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার সঙ্গে নারী স্বাধীনতা কতটা পাওয়া হয়েছে? বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে নারীশিক্ষা স্কুলে ফ্রি করে দেওয়ার পরেও কেন নারীদের উচ্চশিক্ষার হার বাড়ে না? কিংবা নারীদের বাল্যবিবাহের হার কেন কমে না? সামাজিক অবকাঠামো, গোঁড়ামি ইত্যাদি না কমিয়ে রাষ্ট্র স্বাধীন হলেও কি নারীমুক্তি ঘটবে? হয়তো নারীর উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্র বহু ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, কিন্তু সেসব মাঠপর্যায়ে কতটা ফলপ্রসূ তা না ভেবেই নারী উন্নয়নের নামে বিভিন্ন প্রজেক্ট করে তাতে টাকা ঢাললেই নারী স্বাধীনতা পাওয়া হয় না। সেদিন একটা ওয়েবিনারে অংশ নিয়ে জানতে পারলাম, গ্রামে বা উপজেলায় সরকারি বিভিন্ন বিদ্যালয়ে বা কলেজে  কম্পিউটার ল্যাব থাকা আবশ্যিক, যাতে করে ক্লাস শেষে ছাত্রছাত্রীরা আইটি এবং টেকনিক্যাল নানা কিছু স্কুল-কলেজ  থেকে শিখে দক্ষ হয়ে উঠতে পারে। নারী শিক্ষার্থীদের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে করে তারা আরও দক্ষ হয়ে উঠতে পারে পড়াশোনা শেষ করে চাকরির বাজারে। উদ্যোগটা নিঃসন্দেহে দারুণ, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বেশির ভাগ স্কুল ছুটি হয় বিকেল ৩টা বা ৪টা বাজে। এরপর সন্ধ্যা পর্যন্ত স্কুলে থাকাটা বাংলাদেশে গ্রামে বা মফস্বল শহরে কি ছাত্রীদের পরিবার বা সমাজ কি কিশোরী বা তরুণীদের সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘরের বাইরে থাকা মেনে নেবে কিনা। আবার স্মার্ট বাংলাদেশে সবার হাতে মোবাইল বা ল্যাপটপ দিতে গিয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিরাপদে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে তা শেখানো হচ্ছে না। সামাজিক বাধাগুলো অতিক্রম কীভাবে করা হবে, এ ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজকে বোঝানো,  নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করে হাজার হাজার কম্পিউটার ল্যাব বসানো ঠিক কতটা কার্যকরী নাকি এ ক্ষেত্রেও দক্ষ জনবল তৈরির ব্যাপারটা পুরুষকেন্দ্রিক হতে চলেছে। দক্ষ জনবল তৈরির প্রসঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত বৈষম্য আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে বসে আছে এবং আমরা অনেক বৈষম্যকে স্বাভাবিক বিষয় ধরে নিয়েছি।

একবার ক্লাসে জিজ্ঞেস করেছিলাম ছাত্রছাত্রীদের, জনগণ বা পিপল শব্দটা শুনলে নারী না পুরুষ কার মুখ ভেসে উঠে প্রথমে। সবাই বলল, অনেক পুরুষের মুখ। একই ব্যাপার ঘটে যখন রাষ্ট্রপ্রধান শব্দটা বলা হয়। কোনো এক পুরুষের ছবিই ভেসে ওঠে। গার্মেন্টেসে পুরুষ কাজ করার পরেও যেমন পোশাকশ্রমিক বলতে আমরা নারীকেই কল্পনা করি। আবার শুধু শ্রমিক বললে পুরুষের ছবি প্রাধান্য পাবে।  এমনকি শিক্ষক বলতেও পুরুষ কারও চেহারা অনেক বেশি মনে ভাসে। এসব নিয়ে যখন আলোচনা চলছিল ক্লাসে তখন একজন ছাত্রী বলেছিল, ‘কিন্তু ম্যাম, নার্সারি বা কেজির শিক্ষক বলতে তো নারীর মুখই মনে পড়ে!’ এর একটা ব্যাখ্যা আমি দিয়েছিলাম তাকে। এর একটা কারণ বাচ্চাদের ক্লাসে প্রচুর নারী শিক্ষক নিয়োগ হয় এই ভেবে যে, তারা বাচ্চা সামলাতে দক্ষ এবং মেয়েদের বাচ্চার ব্যাপারে ধৈর্য বেশি। একজন পুরুষকে আমরা আগেই খারিজ করে দিচ্ছি তার বাচ্চা সামলানোর দক্ষতা নেই বলে। এভাবে আমরা নারীর কাজ এবং পুরুষের কাজ কোনটা এবং কী কী হবে তা ঠিক করে ফেলি মনের অজান্তেই। আমার এক মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার কলিগ বলেছিলেন, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় টিকলেও মেকানিক্যাল আর সিভিল ইঞ্জিয়ারিং সাবজেক্টগুলো বেছে নিতে মেয়েদের নিরুৎসাহিত করা হয়, কারণ এই বিষয়গুলো নিয়ে পড়ে পুরুষ যেভাবে ফ্যাক্টরির ভারী মেশিন চালাতে পারবে কিংবা রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, ব্রিজ তৈরিতে রাতে দিনে কাজ করতে পারবে তা মেয়েদের জন্য খুব একটা সম্ভব না। বিষয়ভিত্তিক লিঙ্গবৈষম্যের আরেকটা উদাহরণ হচ্ছে, গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিষয়টি শুধু নারীদের জন্য কিংবা কৃষিশিক্ষা পুরুষের জন্য। গৃহকর্মে দক্ষ হতে কেবল নারীকেই হতে হবে, পুরুষকে নয়।

কোন পদে বা অবস্থানে কাকে মানাবে এসব নিয়ে স্টেরিওটাইপ ভাবনাগুলোকে আমরাই টিকিয়ে রাখি কোনো না কোনোভাবে। শব্দ যে ইমেজ বা ছবি মনে তৈরি করতে পারে তা যেকোনো পদ বা পেশাসংক্রান্ত প্রশ্নে বোঝা যায় ভালো। কগনিটিভ বিজ্ঞানী এবং প্রফেসর লিরা বড়োদিৎস্কি ২০১৮ সালে একটি বক্তৃতায় বলেন, আমরা যেভাবে ভাবি কথার মানেও সেভাবে দাঁড়ায়। তার মানে বিষয়ভিত্তিক বা পদভিত্তিক শব্দগুলো আমাদের মনে যেসব ছবি তৈরি করে তা মূলত আমরা সেসব পদে কোন লিঙ্গের মানুষ দেখতে চাই বা দেখে অভ্যস্ত তা-ই প্রকাশ করে। যেহেতু আমাদের সমাজ সব লিঙ্গীয় পরিচয় মানুষকে সমান চোখে দেখতে পারে না, তাই শব্দের ইমেজের মতোই আমরা কাজ বা পেশাকে নির্দিষ্ট লিঙ্গের ধরে নিয়ে বৈষম্য জারি রাখি। পেশা এবং দক্ষতা কীভাবে জেন্ডার বায়াসড ইমেজ তৈরি করছে আমাদের মনে সেই প্রসঙ্গে বলা যায় কর্মক্ষেত্রে পারিশ্রমিক বৈষম্যের কথা। সমান যোগ্যতা এবং দক্ষতা অনুসারে কাজ করার পরও দেখা যায় নারীকে পারিশ্রমিক বা পদোন্নতি দেওয়ার বেলায় অনীহা কাজ করে বহু কর্মক্ষেত্রে। এ ক্ষেত্রে অনেকে বলে থাকে, মেয়েরা পারিশ্রমিক নিয়ে উচ্চকিত নয়, যতটা পুরুষ। তা ছাড়া পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় পুরুষ ঘরের বা সংসারের খরচ চালায় এই মনোভাব থেকেও পুরুষের বেতন বেশি অথবা বেতন বাড়ানো যৌক্তিক মনে করা হয়। উল্টোদিকে উচ্চশিক্ষিত বা উচ্চবিত্ত শিক্ষিত নারীর চাকরি করাকে অনেকেই তার মূল পেশা ভাবতে রাজি নন বরং পার্টটাইম কিংবা শখের বশে চাকরি করতে এসেছে এমন মনোভাব পোষণ করা হয়। এই নারীরা বেশি বেতন বা পদোন্নতি দিয়ে কী করবে, বেতনের টাকা তার রূপসজ্জা বা পোশাকের পেছনে খরচ হয়, সংসারে লাগে না এমন কটাক্ষও বহু নারী শুনে থাকেন। একই সামাজিক অবস্থান বা শিক্ষাগত যোগ্যতার পুরুষের ক্ষেত্রে যদিও এমন কথা উঠে না।

গত বছরের আইএলওর একটা রিপোর্ট থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে ওয়েজ গ্যাপ বা পারিশ্রমিক বৈষম্য তুলনামূলক কম উন্নত বিশ্বের বহু দেশের তুলনায়। বাংলাদেশে শ্রমিক নারীরা মাত্র ২.২% কম আয় করেন পুরুষের তুলনায়। এই গবেষণায় যা উঠে আসেনি তা হলো উচ্চশিক্ষিত নারী শিক্ষক, সাংবাদিক, উন্নয়ন কর্মী কিংবা এমন যারা আছেন, তারা যখন প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন তখন তাদের বেতন তাদের পুরুষ সহকর্মীর সমান কিনা। তা ছাড়া যে বৈষম্য প্রবলভাবে আছে- মাতৃত্বকালীন ছুটির ক্ষেত্রে নারীদের বিনাবেতনে ছুটি নিতে হয়, নয়তো চাকরি ছেড়ে দিতে হয়।  এসব পেশার ক্ষেত্রে দেখা যায় বহু নারীই নিজ পেশায় টিকে থাকতে বা আরও সহজ করে বললে চাকরি টেকাতে এসব বৈষম্য মেনে নেন। মিডিয়া থেকে শুরু করে সর্বস্তরে সচেতনতা বাড়াতে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। নীতিনির্ধারণ করলেই যে এসব বৈষম্য থামবে বা কমবে এমন নয়। সরকারি পর্যায়ে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের বেতনসহ অন্যান্য বৈষম্য সরকারিভাবে মনিটর করা হয় না কিংবা হলেও তা দুর্নীতিমুক্ত না বলে এমনটা চলে আসছে।