স্বাস্থ্যে অর্জনের পাশে অপ্রাপ্তি

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৩, ১২:০২ এএম

সূচনা

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মলগ্নে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যাত্রা শুরু। অবিরাম আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা, অগণিত শরণার্থীর চিকিৎসা, নিহতদের মরদেহ সৎকার চলছে, গড়ে উঠছে ক্যাম্প। চিকিৎসাযুদ্ধ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

বিশ্বখ্যাত মেডিকেল জার্নাল, ল্যানসেটের বিশেষ প্রকাশনা ২০১৩ অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অর্জনের অন্যতম নিয়ামক হলো মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

১৭ এপ্রিল ১৯৭১, মুজিবনগরে শপথ নেয় বাংলাদেশ সরকার এবং ঘোষণা করা হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার সনদ। ১৯৭১ সালের ২ মে প্রবাসী সরকারের সভায় ডা. তফাজ্জেল হোসেন, যিনি টি হোসেন নামে সমধিক পরিচিত তাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো।

এদিকে ২ এপ্রিল জিঞ্জিরায় গণহত্যায় যে শত শত মানুষ প্রাণ হারালেন, আহত হলেন, এদের হাসপাতালে নিয়ে সেবা দেওয়ার সুযোগ ছিল না। তখন এগিয়ে এসেছিলেন পল্লী চিকিৎসক, কম্পাউন্ডার আর সাধারণ মানুষ। মিটফোর্ড হাসপাতালে পাকিস্তানি সেনারা ঘাঁটি গাড়ল। আমি তখন তরুণ চিকিৎসক, আমার মা অসুস্থ হাসপাতালে ভর্তি। আমাদের কেবিনের ওপর কামান বসানো। গর্জে উঠছে বারবার, তাকে সেবা দেওয়ার সঙ্গে হাত মেলালাম অনেকের সঙ্গে আহতদের সেবায়।

যুদ্ধের মধ্যে স্বাস্থ্যসেনাদের আরেক মহাযুদ্ধ শুরু হলো। চিকিৎসক, নার্সদের কেউ ভারতের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে আর কেউ প্রত্যন্ত গ্রামে। কখনো রাতের অন্ধকারে টর্চ জ্বালিয়ে অপারেশন করতে হয়েছে কোনো সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই। বছরজুড়ে করতে হয়েছে নির্যাতিতা নারীদের গর্ভমোচনের দায়িত্ব।

ডা. টি হোসেনের নেতৃত্বে এক হাজার চারশ স্বাস্থ্যসেনার এক বাহিনি। পরবর্তীতে দুই হাজার স্বাস্থ্যকর্মী হলো নিয়োজিত। এমবিবিএস ডাক্তারের দৈনিক ১৫ রুপি আর এলএমএফদের ১০ রুপি নির্ধারণ করা হলো। ৬০ লাখ শরণার্থী পৌঁছেছে। এরা বিধ্বস্ত, ক্লান্ত, আহত, নির্যাতিত আর অবসন্ন। মহামারী আকারে দেখা দিয়েছে নানা সংক্রামক রোগ।

মূল প্রসঙ্গ

একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠন, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আর বেসামরিক নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, জনসংখ্যা সমস্যা, পুষ্টি সমস্যা, নানা দীর্ঘমেয়াদি আর স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন।

এরপর দেশের চিকিৎসা পরিষেবা আর মেডিকেল শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা। বঙ্গবন্ধুর হাতে স্থাপিত হয় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের মূল স্তম্ভ।

পাঁচটি মৌলিক অধিকারের একটি স্বাস্থ্যসেবাকে তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। তার স্বাস্থ্যচিন্তা ছিল বিজ্ঞানসম্মত, যুগোপযোগী আর জনকল্যাণমুখী। প্রান্তিক জনগণের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোর প্রতি তিনি অধিক গুরুত্ব আরোপ করেন।

ওষুধশিল্পে বঙ্গবন্ধুর অবদান ছিল অসামান্য। স্বাধীন বাংলাদেশে ওষুধশিল্প ছিল নাজুক অবস্থায়। দেশের ৮০ শতাংশ ওষুধ বিদেশ থেকে আমদানি হতো। এতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় হতো। ওষুধ ছিল বিদেশি কোম্পানিদের নিয়ন্ত্রণে, বাংলাদেশে ওষুধশিল্পের বিকাশ হয় বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, আজ আমাদের দেশের বিকশিত ওষুধশিল্পের জন্য দেশ ঋণী বঙ্গবন্ধুর কাছে।

উল্লেখযোগ্য অর্জন

১৯৭০ সালে মানুষের গড় আয়ু ছিল ৫০ বছর, এখন তা এসে দাঁড়িয়েছে ৭৪ বছর ৩ মাসে। স্বাস্থ্য খাতে অসামান্য অর্জনের জন্য তা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি এক উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। করোনার টিকা বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ পেয়েছেন বিনামূল্যে ।

তবু রয়ে যায় অতৃপ্তি আর অপ্রাপ্তি

রোগী আর জনগণের বিরাট এক অংশ তবু স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর ক্ষুব্ধ। আমাদের অনেক অর্জন। তবে কিছু কারণে ম্লান হয়েছে।

জনগণের চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি উদ্বেগজনক। একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ব্যক্তি খাতে চিকিৎসা বায় বেড়েছে ৪৭ শতাংশ।

সরকারের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের হিসাবে দেখা যায়, ২০১৫ সালের তুলনায় ২০২০ সালে দেশের মানুষের ব্যক্তিগত খাতে চিকিৎসা বায় (আউট অব পকেট এক্সপেন্সেস) অনেক বেড়েছে, ৬৭ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৯ শতাংশ। ২০২০ সালে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় ছিল ২৩.৮ শতাংশ উন্নয়ন সহযোগী এ খাতে ব্যয় করেছেন ৫ শতাংশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বরাত দিয়ে বলা যায়, এই ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মানুষের দারিদ্র্য বাড়ছে।

চিকিৎসাকেন্দ্রে দালালদের উৎপাত আর আধিপত্য অসহায় আর গ্রাম থেকে আসা প্রান্তিক মানুষের অহেতুক খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং তাদের হয়রানির শিকার করেছে। এর সমাধান পেতে হলে স্বাস্থ্যকে বিনিয়োগ হিসাবে ভাবতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর সঙ্গে এর পরিকল্পনা আর ব্যয় করার দক্ষতা বৃদ্ধি করা উচিত।  চাহিদা নিরুপণ করে ওষুধের সরবরাহ বাড়ানো আর মানসম্পন্ন জীবন রক্ষাকারী ওষুধের প্রাপ্তি বাড়াতে হবে।

চাহিদা অনুযায়ী জনবল কেবল ডাক্তার নয়, আনুপাতিক হারে নার্স আর টেকনোলজিস্ট বাড়াতে হবে। রোগ নির্ণয় করার মৌলিক সব পরীক্ষা সরকারি হাসপাতালে নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি নির্মূল করতে হবে আর চিকিৎসা ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে। আমাদের এক্ষেত্রে সুশাসন, সবল আর দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারি-বেসরকারি দুই সেবার মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে এলে সমাধানের পথ পাওয়া যাবে। আর প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন।

 বাংলাদেশের বেসরকারি খাত সরকারের চেয়ে বেশি সেবা দিচ্ছে মানুষকে। এর বিস্তৃতি বেশি হওয়ার জন্য আর সরকারি সেবার দুর্বলতার জন্য মানুষ বেসরকারি খাতের দিকে বেশি ঝুঁকছে।

এ জন্য স্বাস্থ্য খাতে এক ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

মেডিকেল শিক্ষা আর গবেষণা

আমাদের দেশে মেডিকেল শিক্ষার প্রসার ঘটাতে গিয়ে অনেক মেডিকেল কলেজ হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসংখ্যার অনুপাতে দেশে মেডিকেল কলেজ বেশি।

জনগণের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য মানহীন ডাক্তার তৈরি করার মতো কাজ কি করে সমর্থনযোগ্য হতে পারে? এর দায় কার?

চিকিৎসা গবেষণা

আমাদের চিকিৎসা ক্ষেত্রে সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হচ্ছে এই গবেষণা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও একে এভাবে চিহ্নিত করেছেন অথচ তিনি নিজে এ ব্যাপারে উন্নয়নে আগ্রহী, তাই গবেষণার জন্য অনুকূল পরিবেশ, অর্থ জোগান, প্রণোদনা, চিকিৎসক গবেষকদের আলাদা বর্ধিত বেতন আর সুবিধা। এক্ষেত্রে মৌলিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে যারা অধ্যাপক তাদের দিয়ে এই মহাযজ্ঞ শুরু করা যায়।

মৌলিক বা ক্লিনিকেল যারা শিক্ষক তারা সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক প্র্যাকটিস করে শিক্ষাদান আর গবেষণায় বেশি সময় দিতে পারেন ল্যাবে এবং ক্লিনিকেল গবেষণায় মনোযোগ যারা দেবেন তাদের বাড়তি প্রণোদনা আর সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। অধ্যাপনা আর কনসালট্যান্ট দুটি আলাদা ক্যাডার তৈরি করা যেতে পারে ।

আমাদের দেশে চিকিৎসকের তুলনায় আনুপাতিক হারে নার্স আর টেকনোলজিস্ট কম অথচ এদের কথা খুব আলোচনায় আসে না আর এরা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পর্যায়ে আসেন না।

তাদের দক্ষতা আর জনবল বৃদ্ধি আর এদের পদায়ন খুব জরুরি চিকিৎসা সেবাকে সফল করতে হলে। এদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন।

তরুণ চিকিৎসক

তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট ক্যারিয়ার প্লানিং নেই আর ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ নেই। ফলে অনেকে হতাশ। বেসরকারি হাসপাতালে যারা কাজ করেন, তাদের শ্রমের বিনিময়ে মূল্যায়ন এত কম যে, তা লজ্জাজনক।

এরা ভবিষ্যতের চিকিৎসা পেশার হবেন কান্ডারি। তাদের উৎসাহিত করা উচিত আর ইতিবাচক ভবিষ্যতের ইশারা তাদের সামনে থাকা উচিত।

তাদের জন্য একটি সুনির্দেশিত আরোহণ পথ থাকা উচিত আর মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের মূল্যায়ন করা জরুরি ।

বর্তমান সরকারের যিনি কাণ্ডারি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগ নিলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় সাধারণ মানুষের জন্য সহনীয় পর্যায়ে আসবে স্বাস্থ্যসেবা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত