লিঙ্গ বৈচিত্র্যময়তা ও আমাদের স্বাধীনতা

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৩, ১২:০২ এএম

স্বাধীনতার ৫২ বছর, স্বাধীন বাংলাদেশে বসবাসরত সব নাগরিকের নাগরিক অধিকার আদৌ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে কি না, এই প্রশ্ন সামনে রেখে এই লেখার সূত্রপাত। বাংলাদেশের সাংবিধানিক অধিকার, মতপ্রকাশের সুযোগ, সব নাগরিকের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার নিশ্চিত করার প্রকল্পে লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর কথা আদতে আমরা মনে রেখেছি কি না এই প্রশ্নকে উত্থাপন করতে আমার এই প্রবন্ধ। বলাবাহুল্য ২০১৩ সালে লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর একাংশ অর্থাৎ হিজড়া জনগোষ্ঠীকে নারী-পুরুষ ভিন্ন পৃথক জনগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এই স্বীকৃতি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে প্রতিফলিত হয়। উল্লেখ্য, গবেষণার সূত্র ধরে দেখা যায় আমাদের প্রতিবেশী দেশসমূহ যেমন নেপাল, পাকিস্তান অথবা ইন্ডিয়ায় হিজড়া জনগোষ্ঠীর যে স্বীকৃতি প্রদান করা হয় সেটি তারা অর্জন করে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহ প্রতি ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর পক্ষে কোনো না কোনো সংগঠন অথবা ব্যক্তি বিচার বিভাগের কাছে লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর স্বীকৃতির দাবি জানায় এবং সেটি অর্জন করে। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশের এই স্বীকৃতি প্রদানের কৃতিত্ব এককভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। যদিও বাংলাদেশের গুটিকয়েক এনজিও এ বিষয় নিয়ে বারংবার কথা বলার চেষ্টা করেছে তথাপি এই স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব হতো না যদি না প্রধানমন্ত্রী, নিজ তাগিদে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে এই স্বীকৃতি প্রদানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব না করতেন।

প্রসঙ্গ হচ্ছে, অধিকার অর্জন এবং অধিকার প্রদান এই দুইয়ের ফারাকের এই আলাপটি কেন গুরুত্বপূর্ণ? গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, পার্শ্ববর্তী বা প্রতিবেশী দেশসমূহ যেখানে লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর অধিকারকে আদায় করেছে, ফলে তাদের অধিকার অর্জন করার সাংগঠনিক দক্ষতা বিশেষভাবে দৃশ্যমান। অন্যদিকে বাংলাদেশের হিজড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রসঙ্গে তৎপরতা ও সাংগঠনিক দক্ষতার ভঙ্গুরতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলের হিজড়া জনগোষ্ঠী ইতিহাস পর্যালোচনা করলে লক্ষ করা যায়, তারা নানা ধরনের শোষণ ও নিপীড়নের মধ্য দিয়েও টিকে থাকার লড়াই করে গেছে। এই অঞ্চলের আলোচিত প্রাচীন গ্রন্থ ‘কামসূত্র’, সেখানে উল্লেখ করা হয় মানুষের জনতা তিন ধরনের। স্ত্রী-প্রকৃতি, পুরুষ প্রকৃতি ও তৃতীয় প্রকৃতি। উল্লেখ্য যে এখানে তৃতীয় প্রকৃতির যৌনতাকে নির্দেশ করা হয়, যা কিনা প্রমাণ করে এই অঞ্চলের লিঙ্গে বৈচিত্র্যময় মানুষের উপস্থিতির ও ‘সেক্সুয়াল ফ্লুয়েডিটি’ বা ‘যৌন তারল্যতা’ ধারণার সামাজিক বৈধতা। এছাড়া সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সমূহ যেমন মহাভারত, রামায়ণ ও মনুসংস্কৃতিতে উল্লেখযোগ্য ভাবে হিজড়া, শিখন্ডি লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় মানুষের উপস্থিতি সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়। এক্ষেত্রে বিশেষ প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, পোশাক বা সাজসজ্জা দ্বারা নারী-পুরুষের ভিন্নতা নির্ধারণ করার চিত্র এই অঞ্চলে ততখানি লোকোট আকারে কখনোই দেখা যায়নি। যেমন লক্ষ করলে দেখবেন যে, মোগল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন সম্রাট হাতে চুড়ি, বালা, গলায় মালা, কানের দুল এমনকি যে ধরনের পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করতেন, তা দিয়ে নারী বা পুরুষের পোশাক সাজসজ্জার কৃতজ্ঞতা ততটা নির্দেশ হতো না। এমনকি সেলাইবিহীন শাড়ি, এক কাপড়ের ধুতি অথবা পুরোহিতদের পরিধার্য বস্ত্রকে যদি নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা হয়, এ বিষয়টি লক্ষ করা যায় যে এই অঞ্চলের নারী-পুরুষের পোশাক-পরিচ্ছদ কখনো বাইনারি বা বিপরীতধর্মী চরিত্র অনুসরণ করতে করেনি পাশ্চাত্যের সমাজব্যবস্থায় ভীষণভাবে দৃশ্যত।

অন্যদিকে, মুঘল শাসনকালে, সম্রাট বাবরের সময় ‘নাজির’ হিসেবে রাজদরবারে, পরে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের কাজে এই জনগোষ্ঠীর মানুষেরা। তাছাড়া তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় এলিট জনগোষ্ঠীর হয়ে বিভিন্ন ধরনের কাজে নিযুক্ত ছিল এই লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর মানুষেরা। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনকালে, তৎকালীন ব্রিটেনের লিঙ্গ বৈচিত্র্যের ধারণা ছিল ভীষণভাবে বাইনারি, তাই ব্রিটিশ অনুশাসন কালে এই অঞ্চলের লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর ওপর আরোপণ করা হয় ব্রিটিশ ক্রিমিনাল ট্রাইব অ্যাক্ট ১৮৭১। এই অ্যাক্ট এর ২৪, ২৬, ও ২৯ ধারা অনুসারে বলা হয়, যদি কোনো পুরুষ ‘মেয়েলি আচরণ’ করে, মেয়েদের মতো পোশাক পরিধান করে, প্রকাশ্যে মেয়েদের পোশাক পরে নাচ, গান করে তবে তাকে ক্রিমিনাল হিসেবে গণ্য করা হবে। এরই মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় মানুষ জনগোষ্ঠীকে ‘সামাজিক ক্যাটাগরি’ থেকে পরিণত করা হয় ‘লিগ্যাল ক্যাটাগরিতে’, যেখানে তাদের সংজ্ঞায়িত করা হয় অপহরণকারী তথা মিনাল হিসেবে। বাধ্যতামূলক ভাবে তাদের রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ারও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

এইরূপ ধারাই অব্যাহত থাকে ১৯৪৮ পরবর্তী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানে। তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধান আইয়ুব খানের শাসনামলে, ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার হেজমনিক ধারণার সূত্র ধরে তৎকালীন পাকিস্তানের লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীকে ট্যাবু বিবেচনা করা হয়, এবং তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘অবৈধ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সে সময় পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থানরত হিজড়া নেতৃবৃন্দ, খোজাছাড়া এবং খোজাছাড়াছিস নেতৃবৃন্দ তৎকালীন পাকিস্তান প্রধান আইয়ুব খানের বাসার সামনে অবস্থান ধর্মঘট করেন। তারা আইয়ুব খানের মায়ের কাছে, আবেদন করেন, যাতে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের অবৈধ ঘোষণা করা না হয়। তারা এও বলেন, ‘আইয়ুব যখন ছোট ছিল তখন তারা তাদের বাড়িতে এসে আইয়ুব খানকে আশীর্বাদ করার পরিপ্রেক্ষিতেই আজ আইয়ুব খান পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাদের এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আইয়ুব খানের মা তাকে অনুরোধ করেন সামাজিকভাবে লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় এই জনগোষ্ঠীকে যেন অবৈধ ঘোষণা না করা হয়। এই সূত্র আইয়ুব খান তার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। যার ফলে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়েও লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী তৎকালীন পাকিস্তান ও ১৯৭১ পরবর্তী সময় বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রে টিকে থাকে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে ১৯৭১ সাল পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের এই জনগোষ্ঠীর ইতিহাস বা তৎপরতা সম্পর্কিত কোনো তথ্য সেইভাবে দৃষ্টিগোচর হয় না।

পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের ১৯৯০ এর দশকে পৃথক বা স্বতন্ত্র স্বীকৃতি প্রদান না করা হলেও বেসরকারি সংস্থাসমূহ ও পশ্চিমা দাতা সংস্থাসমূহের আগ্রহের এইচআইভি ডিসকোর্সে, এই জনগোষ্ঠীকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী’ হিসেবে চিত্রায়ণ করা হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে এই জনগোষ্ঠী আরও প্রান্তিক হয়ে পড়ে। তথাপি ২০০০ পরবর্তী বিভিন্ন গবেষণা সমূহে, হিজড়াদের যৌন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী হিসেবে নির্দেশ করার পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে তাদের বিচ্ছিন্নতা নিয়ে ক্ষুদ্র পর্যায়ে আলাপ শুরু হয়। কিন্তু হিজড়াদের সামাজিক অবস্থার সে রকম উল্লেখযোগ্য তেমন পরিবর্তন লক্ষ করা যায় না। দুঃখজনক হলেও সত্য যে সরকারিভাবে হিজড়া বিষয়ক ও লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী সম্পর্কে ধারণার অপ্রতুলতার পরিপ্রেক্ষিতে নানা ধরনের অমানবিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হয়।

হিজড়া জনগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি প্রদান করা হলেও আজ পর্যন্ত তৈরি হয়নি তাদের জন্য কোনো প্রটেকশন আইন। স্কুল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচয় ভর্তি হওয়ার সুযোগ এখন পর্যন্ত পায়নি। শুধু তাই নয় হিজড়া পরিচয় নিয়ে বৈঠক সম্পর্কে যাওয়া অথবা তার চিকিৎসার সুযোগ সুবিধা রিসিভ করার প্রকল্পে কোনো ধরনের সরকারি বা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। কেবলই স্বীকৃতি প্রদানের মধ্য দিয়ে তাদের সীমায়িত করে রাখা হয়েছে। উপরন্তু নানা ধরনের বিভ্রান্ত ও ভ্রান্তিকর ধারণার মধ্য দিয়ে ধারণা করা হয়ে থাকে হিজড়া জনগোষ্ঠী হচ্ছে ইন্টারসেক্স জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী। আবার বিরেশষ ক্ষেত্রে তাদের ‘প্রতিবন্ধী’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয়। অর্থাৎ পূর্বেকার লিগ্যাল ক্যাটাগরি থেকে এই জনগোষ্ঠী পরিণত হয় একটি মেডিকেল ক্যাটাগরিতে। ফলে স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে তারা এখন পর্যন্ত তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত। যার প্রমাণ মেলে তাদের চিকিৎসাব্যবস্থা সুযোগ-সুবিধা বিবেচনায়।

যেহেতু হিজড়া বিষয় নিয়ে আমি দীর্ঘ ১২ বছর গবেষণা করেছি, এ বিষয় নিয়ে আমি নিউজিল্যান্ড থেকে অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছি, সেহেতু দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি যে, হিজড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বৈচিত্র্য। এর মধ্যে আছে জানকা, জানানা, ছিবড়ি, ভাবরাজের হিজড়া, কোতিসহ আরও নানা ধরনের বৈচিত্র্য। হিজড়া সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নানা ধরনের আচার। হিজড়া লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় এর মধ্যে রূপান্তরকামী জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও কম নয়। খুব স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন ধরনের সার্জিক্যাল প্রসেসের মধ্য দিয়ে, হরমোন গ্রহণের মধ্য দিয়ে রূপান্তরিত নারী তথা ছিবড়িতে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়াতে যুক্ত রয়েছেন কিছু নির্দিষ্ট চিকিৎসক। বলাবাহুল্য এই চিকিৎসা গ্রহণ প্রক্রিয়াটি ভীষণভাবে গোপনীয়। যদি হিজড়া জনগোষ্ঠীকে স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়, তবে তাদের এই চিকিৎসা গ্রহণের পদ্ধতিগত জটিলতা বা সামাজিক স্বীকৃতির কোনো জটিলতা থাকবার কথা ছিল না। যেমন উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ইরানে রূপান্তরকামী জনগোষ্ঠীর লিঙ্গ পরিবর্তনের বিষয়টি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত এবং রাষ্ট্রীয় খরচে তা বহন করা হয়। ওদিকে বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রে, এই জনগোষ্ঠী তাদের খাদ্য, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারগুলো থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

তাই আজ এই স্বাধীনতা দিবসে, এতটুকুই বাসনা থাকবে, যেন বাংলাদেশের লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী তাদের ন্যূনতম অধিকারগুলোতে সচেষ্ট হয়। বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্র তাদের নাগরিক অধিকার লিখিত বিবরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে, প্রকৃত অর্থে তাদের অধিকারের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে কাজ করে এবং সামাজিকভাবে আমরাও যেন এই জনগোষ্ঠীকে অবহেলিত হিসেবে বিবেচনা না করে, সামাজিকভাবে তাদের গ্রহণ করি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত