পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশে আন্দোলন সংগ্রামের ক্ষেত্রে কখনো প্রকাশ্যে আবার কখনো নেপথ্যে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে সিপিবি। এসব আন্দোলনের মধ্য দিয়েই দলের গন্ডি পেরিয়ে মণি সিংহ, মোহাম্মদ ফরহাদরা জাতীয় নেতা হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। কিন্তু এখন দলটিতে এমন নেতা আর তৈরি হচ্ছে না বলে মনে করছে রাজনীতি সচেতন মহল।
মণি সিংহের নেতৃত্বে ‘টংক’ প্রথা বিরোধী আন্দোলন, ইলা মিত্রের নেতৃত্বে ‘নাচোল বিদ্রোহ, অজয় ভট্টাচার্য ও বারীণ দত্তের নেতৃত্বে নানকার আন্দোলন ব্যাপক প্রভাব ফেলে তৎকালীন পূর্ব বাংলার কৃষকদের মধ্যে। এরপর একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করতে এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে সিপিবি ছিল প্রথম সারিতে। মুক্তিযুদ্ধে সিপিবি নিজস্ব গেরিলা বাহিনী গড়ে তুলেছিল।
দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে প্রভাবশালী নেতা হয়ে উঠেছিলেন মণি সিংহ। উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের কিংবদন্তি এ নেতা সিপিবির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কাল থেকে শুরু করে পাকিস্তানি শাসক-শোষকদের বিরুদ্ধে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের সব আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল অসামান্য। মণি সিংহ মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা হিসেবে স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে অসামান্য ভূমিকা রাখেন, বিশেষ করে রুশ সরকার-ভারত সরকারের সমর্থন আদায়ে।
একইভাবে দেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফরহাদ। দেশ স্বাধীনের পর রাজনীতিতে সিপিবির প্রভাব কমতে শুরু করলে আশির দশকে এসে দলটির কাণ্ডারি হয়ে ওঠেন তিনি। ফরহাদের নেতৃত্বে আবার সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল একটি দল হয়ে ওঠে কমিউনিস্ট পার্টি। তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে বাংলাদেশে প্রগতিশীল ধারার ছাত্র আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, ক্ষেতমজুর আন্দোলন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন সর্বোপরি জাতীয় আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল।
মণি সিংহ ও মোহাম্মদ ফরহাদ প্রয়াত হয়েছেন। তাদের পর সিপিবির আর কোনো নেতা দেশের জাতীয় রাজনীতিতে তেমন কোনো প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠতে পারেননি। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও দলটির প্রভাব দিনে দিনে কমেছে।
সিপিবির সাবেক সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের যখন পতন হয় তখন পার্টিরই একটা অংশ পার্টি বিলোপের চেষ্টা করে। তখন আমাদের প্রধান কাজ হয়ে ওঠে শুধুমাত্র পার্টি রক্ষা করা। সেই পার্টি এখনো শক্ত গণভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি। এখন শ্রেণিসংগ্রামটা সেভাবে চলছে না, পার্টিও শক্তি সঞ্চয় করছে না। ফলে নেতৃত্বের বিকাশটাও হচ্ছে না। সেই সংগ্রামটা গড়ে তুলতে হবে। সেটা হলে আমরাও এগোতে পারব দেশও নেতৃত্ব পাবে।’
দলের বর্তমান সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম মনে করেন, ‘কমিউনিস্ট পার্টিতে মণি সিংহ বা ফরহাদের মতো নেতৃত্ব তৈরি না হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের অভিঘাত। আবার আদর্শগত বন্ধ্যত্বও চলছে বিশ্বব্যাপী। আরেকটি বিষয় হচ্ছে কৌশলগত সীমাবদ্ধতা।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমান বাংলাদেশের যে দ্বি-দলীয় রাজনীতি চলছে সেটারও অবসান হবে। কারণ দুই দলের শাসন মানুষ দেখেছে। তাদের মধ্যে নীতিগত কোনো পার্থক্য নেই। বিকল্প শক্তি গড়ে তোলার যে লড়াই সেটাই এখন কমিউনিস্ট পার্টি করছে। এই নির্বাচনে হয়তো ক্লিক করবে না। কিন্তু নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ক্লিক করবে, যদি আমাদের লড়াইয়ের ধারবাহিকতা বজায় রাখতে পারি।’
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘নেতৃত্ব তৈরি হয় আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। কমরেড মণি সিংহ বা ফরহাদরা যে সময়ে তৈরি হয়েছেন তখন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন বা পাকিস্তানের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলমান ছিল। তারা যে লড়াই করেছেন তাতে গণতন্ত্রের সংগ্রাম ও শ্রেণিসংগ্রামে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে নতুন করে সংকট সৃষ্টি হয়েছে এবং এই সংকটের কারণেই আমাদের সহযোদ্ধারা এগিয়ে আসতে পারছেন না। আবার অন্যদিকে বড় সংকট হচ্ছে পুঁজিবাদীব্যবস্থা আমাদের লোভ আর ভয়ের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। জনজীবনকে এত কঠিন করে তুলেছে যে, আগে কর্মীরা আত্মত্যাগী হয়ে কাজ করতে পারত, এখন সেটি পারছে না।’