নাট্যজন মামুনুর রশীদ বলেছেন, 'আমরা একটা রুচির দুর্ভিক্ষের মধ্যে পড়ে গেছি। সেখান থেকে হিরো আলমের মতো একটা লোকের উত্থান হয়েছে। যে উত্থান কুরুচি, কুশিক্ষা ও অপসংস্কৃতির উত্থান।'
এমন মন্তব্য পড়লে সহজেই অনুমান করা যায় যে, মামুনুর রশীদের চিন্তার গভীরতা এবং দৃষ্টিশক্তি গভীর দৈন্যে পতিত হয়েছে। নইলে আমাদের রুচির দুর্ভিক্ষের এমন সরল বিশ্লেষণ আর এর জন্য হিরো আলমদের তিনি আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করাতেন না।
মনে আছে, বেশ ক বছর আগে কাসেম বিন আবুবাকার নামের এক ভদ্রলোকের উপন্যাস, গল্পের বই, সর্বোচ্চ বিক্রির রেকর্ড ভেঙেছিল। আর এমন খবরে আমাদের ভদ্রজনদের মাঝে মহা তোলপাড় ঘটেছিল। আর এখন নানা ঘটনায় তোলপাড়ের সুনামি বইয়ে দিচ্ছেন হিরো আলম।
এদের এই বিস্ময়কর উত্থানই প্রমাণ করে মামুনুর রশীদেরা কত নিম্নস্তরের ব্যর্থতায় টেনে নামিয়েছেন আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি, রুচির জগৎকে। অথচ একসময় এই মামুনুর রশীদদের হাতেই আমরা তুলে দিয়েছিলাম আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির সুশোভিত সাম্পানের হাল, বইঠা। মামুনুর রশীদেরা সে হাল ধরে রাখতে পারেননি। ফলে মামুনুর রশীদেরা যেখানে ব্যর্থ হয়েছেন, যেখানে আপস করে উটপাখির মত বালুতে মুখ গুঁজেছেন, সেখান থেকে, সে ফাঁক গলেই উত্থান ঘটেছে হিরো আলমদের।
মামুনুর রশীদের ভাষায় রুচির দুর্ভিক্ষে আমরা যদি পড়েই থাকি তা এই মামুনুর রশীদদের মত মানুষদের আপসকামিতা, অযোগ্যতা, ব্যর্থতা, স্বার্থপরতার জন্যই পড়েছি।
একটি জাতি যখন রুচির দুর্ভিক্ষে পরে তখন বুঝতে হবে এই দুর্ভিক্ষের পেছনে একজন হিরো আলম কিংবা একজন কাসেম বিন আবুবাকার দায়ী নন। কোনোভাবে, কোনো সূত্রেই সেটা সম্ভব নয়। আরও হাজারটা স্পষ্ট কারণ এর জন্য দায়ী। মামুনুর রশীদেরা কেন যে সেসব কারণ দেখতে পান না, বুঝি না!
বলতে দ্বিধা নেই, আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে চরমভাবে, আমাদের নীতি-নৈতিকতায় পচন ধরেছে ভয়াবহভাবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার, শিক্ষার মানের পতন ঘটেছে অবিশ্বাস্য মাত্রায়। রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন, লুটেরা অর্থনীতির অবাধ চাষাবাদ, লুটপাটের সর্বগ্রাসী উৎসব, সবকিছু মিলেই আমাদের রুচির দুর্ভিক্ষের জন্ম হয়েছে। আর এই জন্ম যে আঁতুড়ঘরে তার স্রষ্টা মামুনুর রশীদেরা, হিরো আলমরা নয়।
শ্রদ্ধেয় মামুনুর রশীদকে যদি প্রশ্ন করি, এই আঁতুড়ঘরের স্রষ্টা কী হিরো আলম, না তার ভক্ত শ্রেণি? হিরো আলম, কাসেম বিন আবুবাকার যে শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেন সেই শ্রেণি কী আমাদের রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতির নিয়ন্ত্রক? মোটেই না।
রুচির দুর্ভিক্ষ আসলে ওই সব আঁতুড়ঘরে জন্ম নেওয়া দানবতুল্য সন্তানদের হাতে। আর রুচির দুর্ভিক্ষ নামের বিষ ফসলের চাষি মামুনুর রশীদেরা যে শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেন সেই শ্রেণি, হিরো আলমদের শ্রেণি নয়। পাশাপাশি গত দুই যুগে লুটপাটের অর্থনীতির সিঁড়ি বেয়ে হিমালয়সম উচ্চতায় উঠে গেছে আমাদের সমাজের একদল অর্ধশিক্ষিত, সংস্কৃতি বিবর্জিত, দেশপ্রেমহীন একটি বিশাল লুটেরা শ্রেণি।
এরা, এদের সন্তানেরা বাঙালির সহজাত মন-মানস বিচ্যুত হয়ে আমাদের সামনে একটি বিকৃত, ভিন্ন সমাজকে মডেল হিসেবে খাঁড়া করিয়েছে। এঁদেরই একটি অংশ মিডিয়ার জগতের মহাজন। এ মহাজনরাই শিকড় বিচ্যুত, ময়ূরপুচ্ছধারী কাকের মত একটি এলিট শ্রেণি, একটি বিকারগ্রস্ত মুখোশধারী সোসাইটিকে দিনরাত প্রোমোট করে যাচ্ছে। এবং এরাই আমাদের রুচির মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিচ্ছে। মামুনুর রশীদরা এদের দাস।
মামুনুর রশীদের উচিত রুচির দুর্ভিক্ষের জন্য হিরো আলমদের দিকে আঙুল না তুলে এদের দিকে আঙুল তোলা। আমার গভীর বিশ্বাস মামুনুর রশীদেরা সেই মেরুদণ্ড বহু আগেই হারিয়ে ফেলেছেন।
লেখক: শিক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মী
আরও পড়ুন: দেশে রুচির দুর্ভিক্ষ চলছে