বাজারে ক্রেতা এবং বিক্রেতা, উভয়ই দরকষাকষির মাধ্যমে নিজেদের উদ্বৃত্ত সবচেয়ে বেশি করার প্রচেষ্টা নেয়। বাজারে যদি কারসাজি না থাকে, উদ্বৃত্ত ভাগাভাগিতে উভয় পক্ষ তুষ্ট হয়ে বাড়ি ফেরে। মূল্যস্ফীতি ঘটলে, বিশেষত যাদের টানাটানির সংসার তাদের উদ্বৃত্ত হ্রাস পায় এবং উৎপাদকের বিশেষত দাম কারসাজিতে লিপ্ত সিন্ডিকেট সদস্যদের উদ্বৃত্ত ঊর্ধ্বমুখী হয়।
মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির সূত্রে ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং মানুষের অর্থনৈতিক অবনতি ঘটে এমন একটা ব্যাখ্যা নিতান্তই হালকা, সরলরৈখিক। বলা যেতে পারে, তা জলের ওপর ওড়াওড়ি কিš‘ জল স্পর্শ করা নয়। মূল্যস্ফীতির অগোচরে থাকা আসল প্রভাবটা আলোতে আসে যখন আমরা গরিবের পুষ্টির কথা ভাবি। বাংলাদেশে বর্তমানে চার সদস্যের একটা পরিবারে সুষম খাদ্য সরবরাহে প্রতি মাসে প্রয়োজন ১৯ প্রায় হাজার টাকা ‘একজন দিনমজুর, রিকশাচালক, চর্মকার কিংবা গৃহস্থালির কাজে নিযু ক্ত মানুষসহ যেকোনো নিম্ন আয়ের গরিব মানুষ এখন প্রতিদিন যে আয় করছে, তাতে এই পুষ্টি জোগানো প্রায় অসম্ভব।’ গরিবের কথা আপাতত বাদ দিলেও মুরগির বাজারের অস্থিরতা যে মধ্যবিত্তের পরিবারে পুষ্টির অভাব ঘটাবে তাতে সন্দেহ নেই। আজকের নিবেদন তাই ‘মূল্যস্ফীতি এবং মুরগি কাহিনি’।
দুই
সৈয়দ মুজতবা আলী খাবার-দাবার নিয়ে অনেক লিখেছেন। বিশেষত গোয়ালন্দঘাট থেকে ছাড়া রকেট স্টিমারে রান্না করা সুস্বাদু মুরগির তরকারি তার নজর এড়ায়নি। মুরগির তরকারি বাঙালির প্রিয় খাবার। অসুখ হলে মুরগির স্যুপ, বিয়ে বা মেহমানদারি হলে মুরগির রোস্ট আর এমনিতে প্রোটিন সমৃদ্ধ এই খাবারটির কদর তো আছেই।
মুরগিকে খুব বড় প্রাণী হিসেবে কেউ ভাবে না। ভীরু লোককে বলা হয়, চিকেন হার্টেড আর নিতান্তই সাদাসিধে বন্ধুদের বলা হয় ‘মুরগি’। সেই রাগে কিনা জানি না, বাজারে এখন মুরগি ক্ষেপে গিয়ে বেশি দাম হাঁকছে। তাও আবার রমজানের শুরুতেই। মাত্র এক দেড় মাস আগে যে ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল দেড়শ টাকা কেজি, এখন তা দ্বিগুণ ২৮০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। কিডনি রোগী আমার গিন্নির জন্য ডাক্ত ার প্রস্তাবিত প্রোটিন মাত্রা খুব কম, কিন্ত ‘বাজার দাম শুনে তার হৃদকম্পন প্রতিফলিত হয় রাগে, ক্ষোভে এবং চেহারায়। তার ওপর এই রমজান মাসে মুরগির দাম কেজিপ্রতি ৩০০ টাকা পার হতে পারে এমন প্রেক্ষাপন শুনে তার মাথায় হাত।
অন্যদিকে, শিশু অথবা অল্পবয়সীরা চিকেন ফ্রাই খেতে ভালোবাসে কিন্ত ‘বাবা-মা দুর্মূল্যের বাজারে নিজেরাই যে চিকেন ফ্রায়েড! সুতরাং, অর্থনীতির ক্লাসে স্যার পড়ান, চিকেন আর বিফ (এমনকি মাটন) পারস্পরিক বিকল্প দ্রব্য একটির দাম বৃদ্ধি পেলে অন্যটির চাহিদা বৃদ্ধি পায়। কিš ‘সব ক্রেতার মুখে এক কথা: এমন বেশি দাম আমরা কল্পনাও করিনি। যারা মুরগির মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ, তারা নিরুপায় হয়ে দুধের সাধ ঘোলে মেটাচ্ছেন অর্থাৎ, ১২০ টাকা কেজিতে মুরগির কলিজা, মাথা, গলা আর পা দুটো বাড়ি নিয়ে ফিরছেন।
জিনিসের দাম বাড়লে দুটো প্রভাব প্রত্যক্ষ করা যায়। অপেক্ষাকৃত কম গুণসম্পন্ন দ্রব্য কিনে বাড়ি ফেরা যেমন একটু আগে উল্লিখিত মুরগির বদলে মাথা, গলা, পা, কলিজা কিংবা বিকল্প দ্রব্যে ঝুঁকে পড়া যেমন মুরগির মাংসের জায়গায় বিফ বা মাটন চাহিদা করা। যখন ভোক্তা বিকল্পে ঢুকছে অতি চালাক বিফ এবং মাটন বিক্রেতা অমনি দাম চড়িয়ে দিচ্ছে কেজিপ্রতি ৫০-৭০ টাকা। যে গরুর মাংস মাত্র এক মাস আগে ছিল ৭০০ টাকা, তা এখন ৭৫০ টাকা। উপায় নেই গোলাম হোসেন বড় বড় একান্নবর্তী পরিবারে ৮টা মুরগি লাগলে বর্তমান দামে পড়বে ৫০০০ টাকার কিছু বেশি যে ব্যয় দিয়ে সাড়ে সাত কেজি বিফ কেনা যায় এবং কিনছেনও ক্রেতা। মাটনের দাম আরও বেশি চড়া। কৃষিমন্ত্রী নাকি বলেছেন, মাংসের দাম আগামী মাসগুলোতেও কমবার নয়।
তবে, পোলট্রি সমিতির সভাপতি বলছেন, সমস্ত আনুষঙ্গিক উৎপাদন ও বিতরণ খরচ সমেত খুচরা পর্যায়ে এক কেজি ব্রয়লার চিকেনের দাম ২২০ টাকার অধিক হওয়া উচিত নয়। তিনিই আবার সন্দেহ করছেন যে, মুরগির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে একটা সিন্ডিকেট এই দাম-কারসাজির সঙ্গে সম্পৃক্ত। নিন্দুকেরা বলছেন, কাবাব মে হাড্ডি!
তিন
রমজানে ব্যবসায়ীদের কারসাজি এবং জিনিসপত্রের দামের ঊর্ধ্বগতি একেবারে নতুন কিছু নয়। যেমন নতুন নয়, বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার চোখের সামনে এদের কাজকারবার। অন্তত এই পবিত্র মাসে মানুষ যাতে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার মুখে দিতে পারে তার ব্যবস্থা করা জরুরি। এমনিতে মূল্যস্ফীতির মদদে ওষ্ঠাগত প্রাণ যাকে বলে মুরগির প্রাণ!
একটা বাংলা দৈনিকে ছাপানো খবর কিছুটা আশার আলো দেখায়। আর দেখাবে না কেন, কারণ বাংলাদেশে দুর্ঘটনা না হলে নাকি কারও টনক নড়ে না। সামান্য মুরগি তার আবার এত লম্ফঝম্ফ? হইচই আর শোরগোলের পর শুরু হয় তোড়জোড় এবং পরবর্তী সময়ে দাম কমল ২০ টাকা। বলা বাহুল্য, পোলট্রি খাতের শীর্ষস্থানীয় চার প্রতিষ্ঠান খামার পর্যায়ে ব্রয়লার মুরগির দাম ১৯০-১৯৫ টাকায় নির্ধারণের পর খুচরা বাজারে দাম কমতে শুরু করেছে।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এর মধ্যে নাকি গত ৫২ দিনে মুরগি ও বাচ্চার দাম বাড়িয়ে করপোরেট কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত হাতিয়ে নিয়েছে ৯৩৬ কোটি টাকা। পত্রিকান্তরে প্রকাশ, এই অভিযোগ তুলেছেন স্বয়ং প্রান্তিক খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। তিনি বলতে চাইছেন, প্রান্তিক খামারিদের উৎপাদন ব্যয় যেখানে কেজিপ্রতি ১৬০-১৬৫ টাকা, সেখানে করপোরেট উৎপাদকের খরচ ১৩০-১৪০ টাকা এবং করপোরেট থেকে প্রতিদিন দুই হাজার টন বাজারে এসে থাকলে দিনে তাদের অতিরিক্ত মুনাফা দাঁড়ায় ১২ কোটি টাকা কিংবা ১২ী৫২=৬২৪ কোটি টাকা মোট মুনাফা। তার সঙ্গে আছে একদিনের মুরগির বাচ্চা বিক্রি বাবদ তাদের মোট মুনাফা ৩১২ কোটি টাকা। সংগঠনটির দাবি, দেশে কোম্পানিগুলো কর্র্তৃক প্রতিদিন, প্রতি বাচ্চায় খরচ ২৮-৩০ টাকা, মুরগির বাচ্চা উৎপাদন হয় ২০ লাখ। প্রতি বাচ্চার দাম ৬২-৬৮ টাকায় দেওয়ার কথা থাকলেও বিক্রি হচ্ছে ৮০-৮৫ টাকায় এবং একটি মুরগির বাচ্চা থেকে অতিরিক্ত মুনাফা এসেছে ৩০ টাকা।
পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দাবি, ‘সরকারি তদারকি না থাকায় হরিলুট করেছে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। গত ৫২ দিনে তারা মুরগি ও বাচ্চার দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত ৯৩৬ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে।
চার
এ দাবি আমাদেরও। মুক্তবাজার অর্থনীতি মানে এই নয় যে, বাজারে সরকারি তদারকি থাকবে না। বাজারের বেহাল অবস্থার জন্য দায়ী, হোক চাল-ডাল বা তরিতরকারি, মাংস। নিয়মিত বাজার পর্যবেক্ষণ ও তদারকির অভাব এবং তার সঙ্গে অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা। অন্তত পবিত্র রোজার মাসে ভোক্তার উদ্বৃত্ত যাতে পকেটমার হয়ে উৎপাদকের ঘরে না যায় সেই কামনা সবার। একমাত্র রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিই পারে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে, সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ। সাবেক উপাচার্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়