ডিপ্লোমা পাস না করেও পদোন্নতিতে পূর্ণ নম্বর

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩৬ এএম

ব্যাংক কর্মকর্তাদের পদোন্নতিতে ব্যাংকিং প্রফেশনাল (ডিপ্লোমা) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়েও পূর্ণ নম্বর পাওয়ার বিধান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ঐক্য পরিষদের দাবি, এ নিয়ম বহাল থাকলে মেধা ও দক্ষতার মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হবে এবং ডিপ্লোমা পরীক্ষার গুরুত্ব কমবে। সংগঠনটি বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা এ সংক্রান্ত বিধান বাতিল করে শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কর্মকর্তাদের নির্ধারিত নম্বর দেওয়ার বিধান পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে পাঠানো এক আবেদনে সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, পদোন্নতির ক্ষেত্রে ব্যাংকিং প্রফেশনাল পরীক্ষায় কেবল উত্তীর্ণ কর্মকর্তারাই নির্ধারিত নম্বর পাবেন এমন বিধানই কার্যকর থাকা উচিত। পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও বা উত্তীর্ণ না হয়েও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সুযোগ মেধাভিত্তিক মূল্যায়নের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ব্যাংক কর্মকর্তারা মনে করেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে পেশাগত দক্ষতা ও জ্ঞান যাচাইয়ের অন্যতম স্বীকৃত মাধ্যম হলো ব্যাংকিং প্রফেশনাল ডিপ্লোমা পরীক্ষা। দীর্ঘদিন ধরে এই পরীক্ষার ফল কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও পেশাগত সক্ষমতার মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। ফলে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ও অনুত্তীর্ণ কর্মকর্তাদের একইভাবে মূল্যায়ন করলে ডিপ্লোমা ডিগ্রির মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে।

জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা বিআরপিডি সার্কুলার ০২-এর ২(খ) ধারায় বলা হয়, ২০২৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জারিকৃত বিআরপিডি সার্কুলার ০৩ কার্যকর হওয়ার আগে নিয়োগপ্রাপ্ত বা পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তাদের বর্তমান ধাপের পরবর্তী এক ধাপ পদোন্নতির ক্ষেত্রে ব্যাংকিং প্রফেশনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলেও পরীক্ষার জন্য বরাদ্দকৃত পূর্ণ নম্বর পাবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া এই বিধানকে কেন্দ্র করেই আপত্তি তুলেছে কর্মকর্তা ঐক্য পরিষদ। তাদের দাবি, এতে যেসব কর্মকর্তা কঠোর পরিশ্রম করে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেছেন, তাদের সঙ্গে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া কর্মকর্তাদের কোনো পার্থক্য থাকছে না। এর ফলে মেধা ও পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক মোতাহের হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পদোন্নতির ক্ষেত্রে ব্যাংকিং প্রফেশনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই তাদের প্রাপ্ত নম্বর দেওয়া হোক। পাস আর অটো পাস কখনো সমান নয়। পাস না করে অটো বা স্বয়ংক্রিয় নম্বর পাওয়ার বিধান বাতিল চাই।’

সার্কুলার জারির পর এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে জনতা ব্যাংক পিএলসি, সোনালী ব্যাংক পিএলসি ও অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির কয়েকজন কর্মকর্তা হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। আবেদনকারীদের দাবি, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়েও সমান নম্বর দেওয়ার বিধান সংবিধানের সমতা ও মেধাভিত্তিক মূল্যায়নের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা একটি মামলা এখনো উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এরই মধ্যে ২০১৯ সালে সোনালী ও রূপালী ব্যাংকে নিয়োগপ্রাপ্ত জুনিয়র কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়ায় সাধারণ কর্মকর্তাদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ভুক্তভোগীদের আশঙ্কা, বর্তমান নীতি বহাল থাকলে বৈষম্য আরও প্রকট হবে এবং পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।

সর্বশেষ, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর কাট অফ ডেট-ভিত্তিক সোনালী ও রূপালী ব্যাংকের পদোন্নতি ফলাফলে দেখা যায়, যাদের ডিপ্লোমা সনদ নেই কিন্তু চাকরিতে যোগদান করছেন ২০১৯ বা এর পরে তারাই পদোন্নতি পেয়েছেন। আর যারা ২০১১ বা ২০১২ সালে যোগদান করেছেন, তারা ওই নীতিমালার কারণে পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন।

জানা গেছে, ব্যাংকিং প্রফেশনাল ডিপ্লোমা পরীক্ষা শুধু পদোন্নতির জন্য নয়, ব্যাংক কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ঋণ কার্যক্রম, বৈদেশিক বাণিজ্য, ট্রেজারি, আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো সম্পর্কে জ্ঞান মূল্যায়নের অন্যতম স্বীকৃত পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রতি বছর হাজারো কর্মকর্তা এ পরীক্ষায় অংশ নেন। অনেক ব্যাংক পদোন্নতি, ইনক্রিমেন্ট ও দক্ষতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও এই পরীক্ষার ফল বিবেচনায় নেয়।

এ ব্যাপারে পলিসি থিংক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ সেন্টারের (পিটিইআরসি) চেয়ারম্যান, মাজেদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যাংকিং পেশায় দক্ষতা ও পেশাগত যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে সার্টিফিকেটধারীদের প্রাপ্য স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। এতে ব্যাংকারদের মধ্যে জ্ঞানচর্চা ও সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ বজায় থাকবে। পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে ওঠার মাধ্যমে ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী হবে।

অর্থনীতি বিশ্লেষক ও গবেষক হেলাল আহমেদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতক পাস করেই ব্যাংকিং খাতের চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ থাকায় পেশাগত ব্যাংকিং জ্ঞানের ঘাটতি থেকে যায়। এ বাস্তবতায় ব্যাংকিং ডিপ্লোমার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে পদোন্নতিতে যোগ্যতা ও পেশাগত দক্ষতার এ বিষয়টি প্রতিফলিত হয় না, যা ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বড় দুর্বলতা। তিনি বলেন, এ সংস্কৃতি শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে নয়, বেসরকারি ব্যাংকেও পরিবর্তন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দক্ষ ও পেশাদার ব্যাংকার তৈরির স্বার্থে ব্যাংকিং ডিপ্লোমাকে বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো বক্তব্য নেই। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর পদোন্নতির নিয়ম কানুন অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে করা হয়। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশ ব্যাংক এই সার্কুলার জারি করেছে। কোনো কর্মকর্তা নতুন বা পুরনো ডিপ্লোমা পাস করল বা করল না তাদের বিষয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকই এই সিদ্ধান্ত নেবে।

তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, সার্কুলারটি প্রণয়নের সময় পুরনো কর্মকর্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। এখন আবেদনের পর বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ঐক্য পরিষদ বলছে, পদোন্নতির ক্ষেত্রে কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কর্মকর্তাদেরই নির্ধারিত নম্বর দেওয়ার বিধান পুনর্বহাল করা হলে মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন নিশ্চিত হবে এবং কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা অর্জনের আগ্রহও বাড়বে। অন্যদিকে বর্তমান বিধান বহাল থাকলে ডিপ্লোমা পরীক্ষার প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক এ আবেদন কীভাবে বিবেচনা করে এবং আদালতে চলমান মামলার পরবর্তী অগ্রগতি কী হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে বিতর্কিত এই বিধানের ভবিষ্যৎ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত