গাজীপুরের শ্রীপুরে এক শিশুকে তারাবির নামাজ থেকে ডেকে নিয়ে চুরির অভিযোগ তুলে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া বান্দরবানে স্বর্ণ চুরির অভিযোগে এক শিশুর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে ইউপি চেয়ারম্যান ও তার ছেলের বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, গাজীপুরের শ্রীপুরে নির্যাতনের শিকার শিশুর নাম সাগর আহম্মেদ। সে লোহাগাছ ফালু মার্কেট এলাকার মনির হোসেনের ছেলে। সোমবার রাতে পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের লোহাগাছ গ্রামের ফালু মার্কেট এলাকায় নির্যাতনের এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে এ ঘটনায় পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। গতকাল মঙ্গলবার গ্রেপ্তার তিনজনকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মোজাম্মেল হক (২৭), রাকিব হোসেন (৩০) ও শরিফুল ইসলাম (৩৫)। তাদের মধ্যে মোজ্জাম্মেল হক পৌর আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক। তার নেতৃত্বেই চলে নির্যাতন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সোমবার তারাবির নামাজ শেষের আগেই মোজাম্মেল হক তার লোকজন নিয়ে সাগরকে জোর করে তুলে আনেন ফালু মার্কেট এলাকার তার মাল্টিপারপাস অফিসে। তারা সাগরের হাত-পা দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে। পরে চলে বেধম মারধর। সাগর চুরির কথা অস্বীকার করলেও নির্যাতন থামেনি। একসময় তার হাতের দুটি আঙুলের নখ তুলে ফেলেন তারা। খবর পেয়ে সাগরের স্বজনরা এলে তাদেরও মারধর করা হয়।
নির্যাতনের শিকার শিশুর মা আসমা খাতুন বলেন, ‘ওই মাল্টিপারপাস অফিসটি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মোজাম্মেল হকের। সাগরকে সেখানে দড়ি দিয়ে বেঁধে মারধর করা হয়। এরপর মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে প্লাস দিয়ে চেপে তার হাতের দুই আঙুল থেঁতলে দেওয়া হয়। খবর শুনে ওখানে গেলে তার লোকজন আমাদের মারধর করেন। পরে বহু অনুরোধ করে তাদের কাছ থেকে সাগরকে উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাই।’ তিনি আরও বলেন, আমার ছেলের বিরুদ্ধে চুরির অপবাদ দেওয়া হয়েছে। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা।’
শ্রীপুর পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নূরে আলম মোল্লা বলেন, ‘যেকোনো অপরাধীকেই আইনের আওতায় আনা আবশ্যক। দলীয় বা কমিটির লোক হলেও আইনবহির্ভূত কাজকে আমরা সমর্থন করি না।’
শ্রীপুর মডেল থানার এসআই রিপন আলী খান বলেন, আমরা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাই। শিশু সাগরকে নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠিয়েছি।
এদিকে বান্দরবানে স্বর্ণ চুরির অভিযোগ তুলে সোয়াদ নামে এক শিশুকে নির্যাতন করেছেন বান্দরবানের লামা উপজেলার আজিজনগরের ইউপি চেয়ারম্যান জসীম উদ্দীন তার পরিবারের সদস্যরা। গত শনিবার এ ঘটনা ঘটে।
গতকাল সকালে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশু সোয়াদ বলে, ‘স্বর্ণ চুরি করছি বলে ওরা আমাকে প্রচুর মারছে। পা দিয়ে মাথা চাপা দিছে। পিঠে বেল্ট দিয়ে, শলার ঝাড়–র আগা দিয়ে আমাকে মারছে। হিমেল (ইউপি চেয়ারম্যান জসীমের বড় ছেলে) ঘরের দরজা বন্ধ করে আমাকে মারছে। আমি কোনো স্বর্ণ চুরি করিনি।’ সে আরও বলে, ‘ওরা আমাকে বলছে আমার মা-বাবাকে মেরে ফেলবে। চেয়ারম্যানও আমার মাকে মারছে। মারের ভয়ে আমি তাদের বলছি স্বর্ণ চুরি করে আমি আমার মাকে দিয়ে দিয়েছি।’
হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুর সঙ্গে থাকা মা সেলিনা আক্তার বলেন, ‘দুই বছর আগে থেকে আমার ছেলেকে ওদের (ইউপি চেয়ারম্যান) বাসায় দিয়েছি। আমার ছেলে কোনো দিন কোনো টাকা-পয়সা চুরি করেনি। গত শনিবার আমার ছেলে স্বর্ণ চুরি করছে বলে আমাকে আসতে বলে। আমি ওদের বাসায় আসি। আমি ছেলেকে চুরির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতেই জসীম চেয়ারম্যান আমাকে ঘাড়ে মারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জসীম চেয়ারম্যানের বড় ছেলের নির্যাতনের বিষয়টি আমার ছেলে গেঞ্জি উল্টিয়ে দেখায়। আমাদের বলা হয় ৩ লাখ টাকা দিয়ে যাবি, না হয়ে স্বর্ণ দিয়ে যাবি। আর টাকা না থাকলে জমির কাগজ দিয়ে যাবি। আমরা দিনমজুর মানুষ। আমরা স্বর্ণ চুরি করিনি। ওরা বলছে আমার ছেলে স্বর্ণের চুরি, কানের দুল ও আংটি চুরি করেছে।’ তিনি জানান, ছেলের বাবা লামা থানায় বাদী হয়ে মামলা করেছেন। জসীম চেয়ারম্যানও স্বর্ণ চুরি নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করছেন।
বান্দরবান সদর হাসপাতালের আবাসিক কর্মকর্তা ডা. মো. ইস্তিয়াকুর রহমান জানান, শিশুর মুখে, কপালে এবং আঘাতের চিহ্ন আছে। তবে মায়ের ক্ষেত্রে আঘাতের তেমন চিহ্ন দেখা যায়নি।
এদিকে আজিজনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জসীম উদ্দিন তার ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে জানান, অহেতুক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে একটা মহল ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে। মানহানির অংশ হিসেবে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। যা প্রচার করা হচ্ছে তাহা আদৌ সত্য নয়। তার নির্বাচনী প্রতিপক্ষ এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যোগসাজশে এ নীল নকশা তৈরি করছে।
লামা থানার ওসি শহিদুল ইসলাম জানান, নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ধারায় চেয়ারম্যানের পরিবারের চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।