সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতা রাহুলের কথাই বিশ্বাস করছে

যত যুক্তি, ওজর আপত্তি, সংবিধানের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ধারা, উপধারা গাজরের মতো সামনে ঝুলিয়ে রাখলেও নরেন্দ্র মোদির সরকার যে রাহুল গান্ধীর ওপর প্রতিহিংসার রাজনীতি করছেন তা একটা শিশুও বুঝতে পারছে। স্বাধীনতার পর সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে রাহুল গান্ধীর মতো একজন নেতার তুচ্ছ কারণে সংসদ পদ খারিজ করে দেওয়া নিঃসন্দেহে এদেশের রাজনীতিতে বিরল ঘটনা।

সমস্যা নিছক রাহুল গান্ধীর এমপি পদ খারিজ বা আগামী আট বছর তার ভোটে দাঁড়াবার অধিকার কেড়ে নেওয়া নয়। আমার ধারণা রাহুল টেস্ট কেস মাত্র। আগামী দিনে মোদি সরকার পুরোপুরি সংসদীয় ব্যবস্থা তুলে দিলে অবাক হব না। এমনিতেই এই চরম দক্ষিণপন্থি সরকারের লক্ষ্য এদেশের সংবিধানের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বদলে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র ঘোষণা করা। রাহুল গান্ধীকে সামনে রেখে নরেন্দ্র মোদি জানিয়ে দিলেন, ওসব পার্লামেন্ট টার্লামেন্ট থাকছে থাকুক, আমরা যা চাইব সেই অনুযায়ী দেশ চলবে। বহিষ্কৃত হওয়ার পর রাহুল গান্ধী বলেছেন যে, ‘প্রধানমন্ত্রী ভয় পেয়েছেন। তার চোখে স্পষ্ট আমি ভয়ের আভাস লক্ষ করেছি।’

ক্ষমতায় আসার পর থেকে একের পর এক কা- বিরামহীন ভাবে ঘটিয়ে চলেছে বিজেপি ও তার দোসর সংঘ পরিবার। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে কোনো সাংবাদিক সরকার নিয়ে প্রশ্ন করলেও তাকে জেলে পোরা হচ্ছে। আরএসএসের আস্থাভাজন যোগী আদিত্যনাথের রাজত্বে মা-মেয়েকে একসঙ্গে স্টিম রোলার দিয়ে পিষে ফেলার ঘটনাও ঘটছে।

এই সরকারের বড় বৈশিষ্ট্য সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ। ইতিহাস বিকৃতি এখন রোজকার ঘটনা। কল্পিত মহাকাব্য ও হিন্দু মিথোলজিকে ইতিহাসের মূল উপাদান করা হচ্ছে। বক্তৃতার মধ্য দিয়ে হেট স্পিচ বা ঘৃণা ছড়িয়ে দেওয়া শাসকদের প্রিয় এজেন্ডা। মন্ত্রিপরিষদে এমন সদস্য আছেন যার নাম দিল্লি দাঙ্গার সময় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ আছে। মাননীয় স্বরষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কুৎসিত ভাষা প্রয়োগ করেছেন এমন উদাহরণ কম নেই। ২০০২ সালে গুজরাট গণহত্যার সময় নরেন্দ্র মোদি ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। কোর্ট তাকে ওই সময়ের যাবতীয় অপরাধ থেকে ক্লিনচিট দিয়েছে ঠিক। কিন্তু আমাদের বিচারব্যবস্থার বড় অংশ যে নিরপেক্ষ নয়, ইদানীং তা নিয়ে কানাঘুষা ক্রমেই জনমনে বাড়ছে। গুজরাটের জেনোসাইড-কালে গণধর্ষিত বিলকিস বানোর অভিযুক্তদের যেভাবে জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া হলো তা নিয়ে বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে জনমনে অনাস্থা বাড়বে তা আর বলার অপেক্ষা করে না।

এই সরকার আবার বিরুদ্ধ মত দেখলেই তাকে আর্বান নকশাল বলে জেলে ঢোকাতে বড্ড তৎপর। স্ট্যান স্বামীর মতো ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান যাজককেও আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হওয়ার ‘অপরাধে’ জেলেই মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে।

আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আবার একটু নাটক করতে ভালোবাসেন। প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে সংসদে পা রেখেই তিনি চোখে জল নিয়ে পার্লামেন্টের সিঁড়িকে গণতন্ত্রের মন্দির বলে প্রণাম করেছিলেন। অথচ তার আমলে অধিকাংশ সময়েই গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত হয়েছে সংসদকে এড়িয়ে। কাশ্মীরের ৩৭০ বিশেষ ধারা রদ বা করোনাকালে তড়িঘড়ি লকডাউন বা ডিমনিটাইজেশন সবক্ষেত্রেই সংসদের ভূমিকা ছিল গৌণ।

এদেশের অর্থনীতি স্বাধীনতার পর থেকে সবচেয়ে খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নরেন্দ্র মোদি প্রথমবার ক্ষমতায় আসার আগে ঘোষণা করেছিলেন যে তিনি বিদেশের ব্যাংকে ভারতের যত কালো টাকা আছে সব ফেরত আনবেন। তার পরিমাণ এমন যে তিনি ভারতের সব নাগরিককে ১৫ লাখ টাকা করে দিতে পারবেন। আরও বলেছিলেন যে দু কোটি বেকার চাকরি পাবেন। বাস্তবে যে কোনোটাই হয়নি সে বিজেপির অন্ধ ভক্তরাও স্বীকার করবে। জিডিপি গ্রোথ পুরনো সব রেকর্ড ভেঙে কমের দিকে। লকডাউন সামলাতে মোদিজি হাততালি দিতে ও আলো জ্বালাবার নিদান দিলেও করোনাকালে ইমিগ্র্যান্ট শ্রমিকদের মৃত্যুর মিছিল এদেশ দেখেছিল, আজও সেই মর্মান্তিক দৃশ্যগুলো ভোলার নয়। নোট বাতিল মোদি সরকারের আর এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তাতে নাকি কালো টাকার উৎস বন্ধ হবে। বাস্তবে কতটা কী হয়েছে তা যেকোনো অর্থনীতিবিদই বলতে পারবেন। নিন্দুকেরা অবশ্য বলেন ওই সময় অজ্ঞাত কারণে বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপি অফিস প্রাসাদোপম অট্টালিকার চেহারা নিয়েছে। দিল্লির সদর দপ্তরটি তো প্রায় নবম আশ্চর্যের রূপ নিয়েছে। পাশাপাশি করোনাকালে যখন এদেশের লাখ লাখ লোক চাকরি হারিয়ে পথের ভিখারী হচ্ছেন, অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন, সেই সময় অদ্ভুত এক অলৌকিক পথে এদেশে কোটিপতি শিল্পপতিদের সংখ্যা বাড়তে লাগল। তার মধ্যে অগ্রগণ্য শিল্পপতির নাম গৌতম আদানি। বলা হয় তিনি গুজরাটের বাসিন্দা এবং নরেন্দ্র মোদির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। শোনা যায় যে ব্যবসায়ী ত্রয়ী নীরব মোদি, মেহুল চোকসী ও বিজয় মালিয়া এদেশের কোটি কোটি টাকা ব্যাংক জালিয়াতি করে বিদেশে পালিয়েছেন, তারাও ঘটনাচক্রে সবাই শাসক দলের ঘনিষ্ঠ। ফলে শত অপরাধ করলেও তারা দিব্যি বিদেশে রয়ে গেছেন। এদেশের সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার তৎপরতা দেখাচ্ছেন না। তাদের যত তৎপরতা বিরোধী স্বর বন্ধ করতে।

এই তৎপরতা সময় সময় হাসির ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। গুজরাট নির্বাচনের আগে দলিত নেতা কংগ্রেসের জিগনেশ মেভানিকে আটকাতে তুচ্ছ কারণ দেখিয়ে আসাম অবধি ধাওয়া করা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক এজেন্সি যেভাবে ছুতোনাতায় বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের শায়েস্তা করতে উঠেপড়ে লেগেছে তাতে সন্দেহ হবেই তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে। ইডি, সিবিআই ও অন্যান্য এজেন্সি দুটো লক্ষ্যে বিরোধীদের চাপে রাখতে চাইছে। এক. ভয় পাইয়ে, ব্ল্যাকমেইল করে বিরোধী দলকে মোদি অনুগামী করে তুলতে। দুই. আতঙ্ক ছড়িয়ে বিরোধীদের লড়াইয়ের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া। অনেক ক্ষেত্রেই ইতিমধ্যেই সরকারের উদ্দেশ্য যে সফল তা মায়াবতী ও অন্য কয়েকজনের ঝাঁঝ শীতল হয়ে যাওয়া দেখে আন্দাজ করা যায়।

এই জায়গাতেই অ্যাডভান্টেজ কংগ্রেসের। এবং অবশ্যই বামপন্থি দলগুলো। ওই দলগুলোর মধ্যেও রামভক্ত নিশ্চয়ই কিছু আছে। টাকা ও ক্ষমতার মোহে অনেকেই দলবদলে বিজেপিতে যান এমন ঘটনা বিরল নয়। আসামের অধুনা মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং ছিলেন কংগ্রেসী নেতা। তবুও কংগ্রেস দল হিসেবে বিজেপি ভজনা করবে এ অসম্ভব। কংগ্রেস দল হিসেবে কোনোদিনই চরম দক্ষিণপন্থি নয়। মধ্যপন্থি, লিবারেল। দেশভাগের আগে কংগ্রেসের মধ্যে দক্ষিণপন্থিদের দাপট থাকলেও পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর রাজত্বকালে সমাজতান্ত্রিক ঝোঁক ছিল প্রবল। কংগ্রেস আজও বহুত্ববাদ, ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী।

ফেডারেল কাঠামো নিয়ে কংগ্রেসের তেমন কোনো ছুঁতমার্গিতা নেই। ফলে আগামী নির্বাচনে বিজেপিকে হারাতে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য শক্তি, সর্বভারতীয় স্তরে কংগ্রেস ও বামেরা। তামিলনাড়ুর স্তালিন ও বিহারের লালুপ্রসাদ যাদব বাহিনী কংগ্রেসকে সামনে রেখে লড়লে বিজেপি নিঃসন্দেহে চাপে পড়বে। অন্য দলগুলোর বিজেপি বিরোধিতা কতটা অকৃত্রিম বলা মুশকিল। তারা নিজেদের স্বার্থে বিজেপিবিরোধী গরমাগরম বক্তৃতা দিলেও বিজেপির মূল এজেন্ডা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রসারে পরোক্ষ ভূমিকা নিতে দ্বিধা করেন না। মনে আছে, পশ্চিমবঙ্গের গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ভরাডুবি হওয়ার পরে আরএসএস নেতা হাসতে হাসতে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন যে, বিজেপি হেরেছে ঠিক, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কিন্তু হার হয়নি। ওয়াকিবহাল মহল জানে গত কয়েক বছর ধরে এ রাজ্যে কাদের মদদে সংঘ পরিবারের শক্তি কতগুণ বেড়েছে।

রাহুল গান্ধীর নেতৃত্ব সম্পর্কে, আর যাই হোক এক ইঞ্চি জমিও সে বিজেপিকে ছাড়বে না তা নিয়ে তর্ক নেই। ভারত জোড়ো কর্মসূচি নিশ্চিত সাফল্য রাহুলকে দিয়েছে আত্মবিশ্বাস ও মোদিকে পাইয়েছে ভয়। বাইরের দুনিয়া জানে মোদির জনপ্রিয়তা গগনচুম্বী। ভোটের রেজাল্ট সবসময় তা যে সঠিক নয় তা বলে দেয়। বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপি বিপুল টাকা খরচ করলেও শতাংশ হিসেবে খুব কিছু বিরাট ভোট পায় না। একাধিক রাজ্যে এখনো কংগ্রেস ও বিজেপিবিরোধী জোট ক্ষমতায়। নতুন প্রজন্মের ভোটারদের বড় অংশ ভারত জোড়ো কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দিয়েছে। গ্রামীণ সর্বহারার ভারত জোড়ো মিছিলে ব্যাপক অংশগ্রহণ মোদিকে চিন্তায় ফেলেছে। ২০১৫ সাল থেকেই মোদির বিজেপি ও তাঁবেদার কিছু আঞ্চলিক দল রাহুল গান্ধীকে নিশানা করেছে কংগ্রেসকে দুর্বল করতে। উল্টে রাহুল আরও ধারালো, আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছেন। ফলে সামান্য অজুহাতে রাহুল গান্ধীকে সংসদ থেকে বহিষ্কার করা হলো। তবে রাহুল নিজেই বলেছেন যে তিনি আদানি-মোদির আঁতাত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বলেই তাকে এভাবে হেনস্তা করা হলো। এই মুহূর্তে অন্তত ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতা রাহুল গান্ধীর কথাই বিশ্বাস করছে। রাহুল সংসদে প্রশ্ন তুলতে না পারলেও, এদেশের করপোরেট পুঁজি ও শাসকদের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন কিন্তু থেকে যাবেই।

লেখক: প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

sdastidar27@gmail.com