মূল্যস্ফীতিতে আইয়ুব খানের আমল টপকে গেল পাকিস্তান!

কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি চলছে পাকিস্তানে। চলতি বছরে মার্চ মাসে যা ৩৫ দশমিক ৩৭ শতাংশে এসে পৌঁছায়। গতকাল শনিবার দেশটির পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রকাশিত তথ্য বলছে, মূল্যস্ফীতির এ হার ১৯৬৫ সালকেও ছাড়িয়ে গেছে। যদিও সাবেক সেনাশাসক আইয়ুব খানের শাসনের ওই সময় পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতির উল্লম্ফন ছিল অনেকটা ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের প্রভাবে। সে সময় অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নতুন শিল্প-কলকারখানা নির্মাণ, সড়ক নির্মাণ, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তার আমলে বৈদেশিক বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্যও নিতে থাকেন নানা পদক্ষেপ। তবে পাঁচ দশক পর এসে পাকিস্তানের অবস্থা অনেক বদলেছে। অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে দেশটি এখন দেউলিয়া হওয়ার পথে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্তপূরণ করতে তড়িঘড়ি উদ্যোগ নেওয়ার ফলে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

পাকিস্তানের পরিসংখ্যান ব্যুরোর বরাতে দেশটির সংবাদমাধ্যম ডন বলছে, বার্ষিক ভিত্তিতে চলতি বছরের মার্চ মাসে দেশটির মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৩৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ হয়েছে, যা ১৯৬৫ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ। ২০২২ সালের মার্চে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১২ দশমিক ৭২ শতাংশ। পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, শহর ও গ্রামাঞ্চলে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে যথাক্রমে ৩২ দশমিক ৯৭ শতাংশ ও ৩৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, বছর ব্যবধানে শুধু খাদ্য, পানীয় এবং পরিবহনসেবার দামই বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদন বলছে, কয়েক বছর ধরে পাকিস্তানের আর্থিক অব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনীতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্বব্যাপী শক্তি সংকট এবং বিধ্বংসী বন্যার কারণে ২০২২ সালে দেশের এক-তৃতীয়াংশ জলমগ্ন হয়। পরিস্থিতি সে সময় থেকে শুরু হয়েছে। বর্তমানে দেশটির যা ঋণ, এর ফলে তাদের কোটি কোটি ডলার অর্থায়নের প্রয়োজন। এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস পেয়েছে এবং পাকিস্তানি রুপির মান কমে গিয়েছে।

দরিদ্র পাকিস্তানিরা এই অর্থনৈতিক অস্থিরতার শিকার। মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব কমাতে সরকার-সমর্থিত কর্মসূচির আওতায় সারা দেশে আটা-ময়দা বিতরণের কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। রমজান মাস শুরু হওয়ার পর থেকে খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রে ভিড়ে পিষ্ট হয়ে অন্তত ২০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। গত শুক্রবারও করাচিতে রমজান মাস উপলক্ষে একটি কেন্দ্রে খাবার বিতরণ করা হচ্ছিল। সেখানে ভিড় পিষ্ট হয়ে কমপক্ষে ১২ জন মারা যান। খাবার লুট হওয়ার অভিযোগও এসেছে।

করাচির এক অর্থনৈতিক এক বিশ্লেষক শাহিদা উইজারাত এই প্রসঙ্গে বলেন, যেভাবে মুদ্রাস্ফীতি বা মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, আমি মনে করি দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় বলেছে, অত্যাবশ্যকীয় জিনিসপত্রের আপেক্ষিক চাহিদা এবং সরবরাহের ব্যবধান, বিনিময় হারের মূল্যহ্রাস এবং সম্প্রতি পেট্রল ও ডিজেলের নিয়ন্ত্রিত দামের ঊর্ধ্বমুখী সমন্বয়ের ফলে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ে পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক মুখপাত্র বলেন, বৃদ্ধির এই হার সত্তর দশকে মাসিক রেকর্ড ব্যুরো শুরু হওয়ার পর সর্বোচ্চ। তার কথায়, এটি আমাদের তরফে নথিভুক্ত হওয়া সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতি।

বিনিয়োগ কোম্পানি আরিফ হাবিব করপোরেশনের বরাত দিয়ে ডন বলছে, মার্চে পাকিস্তানে মূল্যস্ফীতির যে হার পাওয়া গেছে, তা ১৯৬৫ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ।