ঋণের সুদের হারে থাকছে না ক্যাপ সুবিধা। আগামী জুন মাসে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে, যা আগামী জুলাই থেকে কার্যকর হবে। এর ফলে ৯ শতাংশ ঋণ সুদহার তুলে দিয়ে ট্রেজারি বিল, বন্ডের ছয় মাসের গড় সুদহার (ওয়েটেড) বিবেচনা করে প্রতি মাসে একটি রেফারেন্স রেট নির্ধারণ করে দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর সঙ্গে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ সুদ যোগ করে ঋণ সুদহার নির্ধারণ করতে পারবে বাণিজ্যিক ব্যাংক। এখন ৬ মাস মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ৬ দশমিক ৯৯। ফলে এখনকার হিসাবে ঋণের সুদ হতে পারে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ। তবে ব্যাংকঋণের সুদের সর্বোচ্চ হার কত হবে, বাংলাদেশ ব্যাংক তা প্রতি মাসে নির্ধারণ করে ঘোষণা করবে। এ হার ঠিক করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক তার নির্ধারিত সূত্র অনুসরণ করবে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘শর্টটার্ম মান্থলি এভারেজ রেট’ বা স্মার্ট।
গতকাল রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় এ নিয়ে আলোচনার পর এমন সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। তবে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। পাশাপাশি ভোক্তা ঋণে সর্বোচ্চ সুদহার কত হবে, তা-ও নির্ধারণ করে দেওয়া হবে।
এ ছাড়া রপ্তানি পণ্যের সঠিক মূল্য নির্ধারণে তদারকি, বাজারভিত্তিক ডলারের দাম নির্ধারণ, ব্যাংকারদের জন্য আলাদা হাসপাতাল তৈরি ও খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রয়োজনী পদক্ষেপের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সভাপতিত্বে সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর, প্রধান অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সেলিম আর এফ হোসেনের নেতৃত্বে সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডিরা ব্যাংকার্স সভায় যোগ দেন।
ব্যাংকার্স সভায় মূল আলোচ্য বিষয় ছিল ঋণের সুদহার নির্ধারণ পদ্ধতি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্তের অন্যতম হলো সুদহার নির্দিষ্ট করে না রেখে করিডর প্রথা চালু করে তা বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া। এর পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ৬ মাস মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদের হারের সঙ্গে ৩ শতাংশ যুক্ত করে যে সুদ হয়, তা নিতে পারবে ব্যাংকগুলো।
সভায় জানানো হয়, প্রতি মাসে ট্রেজারি বিলের একাধিকবার নিলাম হয়। ফলে এর সুদের হারের ওপর ভিত্তি করে একটা গড় হার নির্ধারণ করা হবে। যদি ট্রেজারি বিলের সুদহার কমে যায়, তবে অতিরিক্ত হার বাড়িয়ে সুদের হার বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি মাসে গড় সুদহার কত হবে, তা নির্ধারণ করে জানিয়ে দেবে
সভায় ডলারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রার নির্ধারণের বিষয়েও আলোচনা হয়। এ ক্ষেত্রে দাম নির্ধারণে বিভিন্ন উপকরণ উঠে যাবে। কার্যকর হবে একক দর। আইএমএফ ডলারের দরের হরেক রকম উপকরণ এবং এগুলোর বিভিন্ন ধরনের দাম নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তারা বাংলাদেশকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ডলারের দর বাজারভিত্তিক করার শর্ত দেয়। এর সঙ্গে ডলার বেচাকেনায় স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে দামের ক্ষেত্রেও একক দর চালুর কথা বলে। এ শর্ত জুনের মধ্যেই বাস্তবায়ন করতে হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বেসরকারি খাতের ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, সভায় ডলারের একক দাম নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ডলার বেচাকেনায় হরেক রকম উপকরণ ও দাম উঠে যাবে। ডলারের একক দর কার্যকর হবে। এতে ডলার বেচাকেনায় স্বচ্ছতা আসবে বলেও জানান এই এমডি। পাশাপাশি ডলারের দামে কারসাজি করলে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থারও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংকারদের হাসপাতাল নির্মাণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এ সময় সবার কাছে এ বিষয়ে পরামর্শ চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যাংকাদের হাসপাতালের জায়গা ক্রয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া হতে পারে। আর খেলাপি ঋণ উত্তোলন এবং নতুন করে ঋণ বিতরণে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আগে যে পণ্য আনতে সাড়ে আট বিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছিল, এখন সাড়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলার দিয়েই এসব পণ্যের ঋণপত্র খোলা যাচ্ছে। আমদানি পণ্যের মূল্য পরীক্ষা করায় ডলার খরচ কমে আসছে। বেশি ডলার খরচ করে পণ্য আনা কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন ৩০ লাখ ডলারের বেশি ঋণপত্রের মূল্য যাচাই করে অনুমোদন দিচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ঋণপত্রের মূল্য আগের চেয়ে বেশি যাচাই-বাছাই করছে। অপ্রয়োজনীয় আমদানির অনুমোদন দিচ্ছে না। ফলে ঋণপত্র খোলা কমে গেছে। এখন যেসব পণ্য রপ্তানি হচ্ছে, তার সঠিক মূল্য নির্ধারণ করা হচ্ছে কি না, তা তদারকি শুরু করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, এতে রপ্তানির আড়ালে অর্থ পাচার কমে আসবে। ফলে প্রবাসী আয়ে যে হুন্ডি প্রথা আছে, তা-ও কমে আসবে।
সভা শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, হুন্ডির চাহিদা কমিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। এতেই অতিরিক্ত ডলার খরচ কমে আসবে। পাশাপাশি সুদহার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া নিয়ে কাজ হচ্ছে, যা আগামী জুলাই থেকে কার্যকর হবে।