কেমন আছে দ্বীপ দেশ শ্রীলঙ্কা?

দ্বীপ দেশ শ্রীলঙ্কা সবময়ই সমৃদ্ধ একটি দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল, বিশ্বজুড়েই খ্যাতি দেশটির সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, অপরূপ সমুদ্রসৈকত আর উষ্ণ আতিথেয়তার। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি ব্যাপকভাবে আলোচিত এর অর্থনৈতিক সংকট এবং এ থেকে জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে। গত ৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় যখন দেশটির প্রধান বিমানবন্দরে নামলাম, আমাদের জন্য তখন অপেক্ষা করছিল বিস্ময়কর মিশ্র কিছু অভিজ্ঞতা। প্রায় একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি গত কয়েক দিন এখানকার মানুষজনের সঙ্গে কথা বলে, বিভিন্ন এলাকায় বিচরণ করে।

বন্দরনায়েকে বিমানবন্দরে নেমেই কিন্তু শ্রীলঙ্কার আর্থিক সংকটের কোনো হদিস পাওয়া যায় না। বরং বিমানবন্দরটিকে আগের চেয়েও আরও বেশি ঝকঝকে, সাজানো-গোছানো মনে হলো। পর্যটক বা যাত্রীর সংখ্যা খানিকটা কম মনে হয়েছে অবশ্য। তবে পরিবর্তনের প্রথম পরিচয়টা পাওয়া যায় ইমিগ্রেশন বুথে যাওয়ার পর। সাধারণত শ্রীলঙ্কার ট্যুরিস্ট ভিসার আবেদন অনলাইনে করা যায়, অনলাইনেই ভিসা আবেদনের অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে পাসপোর্ট দিলে সেখানে সাদা রঙের একটি ভিসা লাগিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এবার আর সেই ভিসা দেওয়া হলো না, শুধু ‘এরাইভাল সিল’ দিয়েই কাজটা সারা হলো। যাত্রীর চাপ তেমনটা না থাকায় পুলিশের কাছে ভিসা না দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি হাসতে হাসতেই বললেন, অযথা খরচের কী দরকার? বুঝতে অসুবিধা হয়নি মিতব্যয়ের প্রচেষ্টার কথা।

বাংলাদেশের পাসপোর্ট দেখলে প্রায় প্রতিবারই ইমিগ্রেশন পুলিশ কেন এসেছি, কদিন থাকব ইত্যাদি কয়েকটা প্রশ্ন করতেন, এবার একদমই কোনো প্রশ্ন করলেন না। সম্ভবত দেশটি চায় পর্যটক বেশিসংখ্যক আসুক, এর জন্য সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াগুলোও সহজ করে দেওয়া হয়েছে। ভিসার জন্য আমার অনলাইন আবেদন অনুমোদন করা হয়েছে আবেদনের কয়েক মিনিটের মধ্যেই।

সবকিছুতে খরচ কমানোর আরেকটা প্রমাণ পেলাম স্থানীয় সিমকার্ড কিনতে গিয়ে। সব প্রক্রিয়া শেষ করে দোকানি জানালেন, ক্রয় রসিদ এসএমএসের মাধ্যমে মোবাইল ফোনে চলে যাবে, কাগজে ছাপা কোনো রসিদ নেই। দেখলাম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেই এসএমএস চলে এলো।

ধারণা করেছিলাম, কলম্বোর দোকানগুলোতে হয়তো জিনিসপত্রের অভাব চোখে পড়বে। মনে হলো, শ্রীলঙ্কানরা প্রাথমিক সেই অর্থনৈতিক ধাক্কাটা সামলে নিয়েছে। বিমানবন্দরে ডিউটি ফ্রি শপগুলোতে নানা পসরার চাকচিক্য চোখে পড়ার মতো। বিমানবন্দর থেকে প্রায় আধা ঘণ্টা দূরের হোটেলে আসার পথে রাস্তার দুই পাশে দোকানপাটগুলোতে সাজানো পণ্যের পসরা অবাক করার মতো। হোটেলে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যাও দেখছি বেশ স্বাভাবিক। পর্যটন এলাকা নিগোম্বোতে বেশ রাত পর্যন্ত রেস্টুরেন্টগুলোতে পর্যটকদের হৈচৈ দেখলাম। আর জিনিসপত্রের দামও বিদেশি মুদ্রায় হিসাব করলে খুব একটা বেশি বলা যায় না, যদিও দেশটির মুদ্রার মান কমে গেছে প্রায় অর্ধেক। এখানে রাতের বেশ ভরপুর খাবার খাওয়ার জন্য দিলাম ২ হাজার রুপি, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৬৫০ টাকার মতো।

নিগোম্বোর গ্রিনস রোড এলাকার শপিংমলগুলো দেখেও বোঝার কোনো উপায় নেই অর্থনৈতিক সংকটের কথা। অলঙ্কারের দোকান, ওষুধের দোকান, জামা-কাপড়ের দোকান কোথাও অপ্রতুলতার ছিটাফোঁটা নেই, বরং আছে প্রাচুর্য। স্থানীয় টুকটুকওয়ালা, স্থানীয় দোকানি, ক্রেতাদের মধ্যেও দেখা মেলিনি কোনো অস্বাভাবিকতা, সবকিছুই বরং স্বাভাবিক।  

বলা বাহুল্য, ২০২১ সাল পর্যন্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় তুলনামূলকভাবে শ্রীলঙ্কার অবস্থান ছিল স্পষ্টভাবেই ভালো। মানব উন্নয়ন সূচকে  শ্রীলঙ্কা ছিল এই অঞ্চলের সবচেয়ে সেরা, গড় আয়ু ছিল ৭৭ বছর, এটাও এই অঞ্চলে সর্বোচ্চ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি ব্যাপকভাবে বদলে গেছে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, উচ্চমাত্রার ঋণ এবং কোভিড-১৯ মহামারীর প্রভাবই মূলত এই সংকটের জন্য দায়ী। দেশটিতে বর্তমান সময়ে বিশ্বের সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ঘটেছে, শ্রীলঙ্কার রুপি মূল্যমান এখন সর্বকালের সর্বনিম্নে অবস্থান করছে।

শ্রীলঙ্কার মানুষের সঙ্গে আমার যোগাযোগ দীর্ঘদিনের, দেশটিতে এসেছিও কয়েকবার। সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস, শ্রীলঙ্কার মানুষ এই সংকট কাটিয়ে উঠবে খুব শিগগির। আমার এই বিশ্বাস সাধারণ মানুষের নম্র, বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের ওপর ভিত্তি করে। সংকট সমাধানের আশার আলোও উঁকি দিতে শুরু করেছে।

এখানে অনেকের সঙ্গে কথা বললাম দেশটির অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে, জানতে চাইলাম মূল শিক্ষণীয় বিষয়গুলো। মোটা দাগে সবাই রাজাপাকসে সরকার এবং তার পরিবারের অদূরদর্শিতাকেই দেশটির সংকটের জন্য দায়ী করা হয়। অনিয়ন্ত্রিত পরিবারতন্ত্রই দেশটির সংকটের প্রধান কারণ বলে প্রায় সব বিশেষজ্ঞই মনে করেন। শ্রীলঙ্কার মোট জাতীয় বাজেটের প্রায় ৭৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত একটি মাত্র পরিবার, রাজাপাকসে পরিবার। এই পরিবারের সদস্যদের ক্ষমতার অপব্যবহার দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।

অবশ্য কোভিড-১৯ না এলে হয়তো সংকট প্রকট হতে আরও কিছুটা সময় বেশি লাগত। কোভিডের কারণে দেশটির আয়ের অন্যতম প্রধান খাত পর্যটন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভুল নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষি। অন্যদিকে অহেতুক ব্যয়বহুল উন্নয়ন প্রকল্প দেশটিকে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যায় যে, নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করতে হয়।

শ্রীলঙ্কার সংকট কিন্তু জাতীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বকে আমাদের সামনে নিয়ে আসে। অবকাঠামো এবং অত্যাবশ্যকীয় খাতে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয়, কিন্তু এ ধরনের বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশে আমরা দেখছি অনেক টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো বছরের পর বছর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। খরচ হচ্ছে অস্বাভাবিক। এই বিষয়গুলো কিন্তু আশঙ্কা তৈরি করে। উন্নয়ন এবং অপচয়ের পার্থক্য কঠোরভাবে নির্ণয় এবং ব্যবস্থাপনা করা না গেলে সংকট মোকাবিলা করা একটা সময় চলে যাবে সাধ্যের বাইরে।

লেখক: উন্নয়ন কর্মী, যুগ্ম পরিচালক, কোস্ট ফাউন্ডেশন

munir.coastbd@gmail.com