‘ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে থাকি। ঘরে ছয় মাস বয়সের ছেলে আছে, তার দুধ কেনার টাকাটাও নাই আমার কাছে। বৃদ্ধ বাবা, ছোট বোন ও স্ত্রীকে নিয়ে মানবেতর দিন কাটছে। মার্কেটে আগুন লাগার পর থেকে দোকানের কাগজপত্র নিয়ে অপেক্ষা করছি কখন একটু সাহায্য পাব। শুধু আশ্বাসই পাচ্ছি, আমাদের সাহায্য করা হবে। কিন্তু কেউ সাহায্য করছে না। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের না খেয়ে মরা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।’
গতকাল শুক্রবার চৈত্রের ভরদুপুরের তপ্ত রোদে আগুনে পোড়া রাজধানীর বঙ্গবাজারের ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে এ প্রতিবেদকের কাছে এভাবেই নিজের দুরবস্থার কথা তুলে ধরছিলেন মো. বিল্লাল হোসেন জিন্না। বঙ্গবাজারের অন্য হাজারো ব্যবসায়ীর মতোই তিনিও এখন হঠাৎই পথের ফকির।
পোড়া জিনিসপত্রের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় জিন্নাকে। হাতে ছিল কিছু কাগজপত্র। মাঝেমধ্যে এদিক-সেদিক ঘুরছিলেন। কোথাও মানুষের জটলা দেখলেই এগিয়ে যাচ্ছিলেন যুবক ব্যবসায়ী জিন্না।
তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, চার দিন আগে লাগা আগুনে পুড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এ মার্কেটের একটি দোকানে সেলসম্যান হিসেবে চাকরি করেছেন এক যুগ। খেয়ে না খেয়ে তিল তিল করে জমানো টাকা দিয়ে বছর দুয়েক আগে নিজেই একটি দোকান নেন বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের নিচতলায়। দোকান মালিককে অগ্রিম হিসেবে দিতে হয়েছিল সাড়ে ৩ লাখ টাকা। এ ছাড়া মার্কেটের তৃতীয় তলায় ১ লাখ টাকা দিয়ে নিয়েছিলেন একটি গুদামঘরও। গত মঙ্গলবারের আগুনে সব পুড়ে যাওয়ায় নিঃস্ব এখন জিন্না। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে পরিবারের সদস্যদের তিনবেলা খাবার জোগানোই দায়। এখন দিনভর পোড়া দোকানের কাছে থাকেন সহায়তার আশায়।
নাজিরাবাজার চৌরাস্তার ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে থাকা জিন্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে দোকানের কাগজপত্র নিয়ে অপেক্ষা করছি কখন একটু সাহায্য পাব। কিন্তু শুধু আশ্বাস পাচ্ছি আমাদের সাহায্য করা হবে। কেউ সাহায্য দিচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে না খেয়ে মরা ছাড়া উপায় থাকবে না।’
তার দোকানে মেহেদী ও সাকিব নামে দুজন কর্মচারী ছিল জানিয়ে জিন্না বলেন, ‘তাদের বেতনও দিতে পারি নাই। কীভাবে চলবে তারা তাও জানি না।’
আরেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী আদর ফ্যাশনের মালিক রকিবুল ইসলাম বাবু জানান, বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সে তার চারটি দোকান পুড়ে গেছে। এ ছাড়া পাশের বঙ্গ ইসলামী মার্কেটে ‘৫০০ ক্লাব’ নামে তার একটি দোকান ছিল। আগুন লাগার পর সেই দোকান লুট করে দুর্বৃত্তরা।
সাহায্যের জন্য গত বৃহস্পতিবার থেকে কয়েক দফায় আইডি কার্ড ও দোকানের কার্ড জমা দিয়েছেন জানিয়ে রকিবুল বলেন, ‘সহায়তার আশ্বাসে কার্ড ও ছবি দিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোথাও থেকে একটি টাকাও পেলাম না।’
কর্মচারীদের নিয়ে দোকানের পোড়া শাড়ি হাতড়াতে দেখা যায় আরাফাত শাড়ি হাউজের মালিক মিজানুর রহমানকে। পাশাপাশি তিনটি দোকানের মালিক ছিলেন তিনি। মিজানুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত এক টাকাও সহায়তা পাইনি। প্রধানমন্ত্রী আমাদের যে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন তা যেন দ্রুত বাস্তবায়ন করেন। আমরা যারা নিঃস্ব হয়ে গেছি তাদের যেন পুনর্বাসন করে দেন। না হলে আমাদের আত্মহত্যা করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।’
জিন্না, রকিবুল ও মিজানুরের মতোই কয়েক হাজার দোকানির একই অবস্থা। বঙ্গবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কোটিপতি থেকে রাতারাতি পথের ফকির হয়ে যাওয়া অসংখ্য দোকানি একটু সহায়তার আশায় পথে পথে ঘুরছেন। অগ্নিকাণ্ডের চার দিন অতিবাহিত হলেও ক্ষতিগ্রস্তরা কোনোরকম আর্থিক সহায়তা পাননি বলে জানিয়েছেন। সরকারের বিভিন্ন মহলের পাশাপাশি মার্কেট কর্তৃপক্ষ সহায়তার আশ্বাস দিলেও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা গতকাল পর্যন্ত এক টাকাও পাননি বলে দাবি করেছেন।
দোকানিরা বলছেন, কয়েক দফায় তাদের নাম তালিকাবদ্ধ করা হয়েছে। দোকান থাকার প্রমাণস্বরূপ বিভিন্ন তথ্য নিয়েছে, কিন্তু কোনো সহায়তা এখনো পাননি তারা। আদৌও পাবেন কি না তাও জানা নেই তাদের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের বঙ্গবাজার মার্কেট ইউনিট দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি দ্রুতই তাদের সহায়তা দেওয়ার।’
এদিকে আগুন লাগার তিন দিন পর গতকাল সকালে বঙ্গবাজারের আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণ হয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (মিডিয়া সেল) মো. শাহজাহান শিকদার বলেন, ‘আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণ করা গেছে। সর্বশেষ আমাদের দুটি ইউনিট কাজ করেছিল। আজ (গতকাল শুক্রবার) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণে আসে।’
সূত্রপাত হওয়ার সাড়ে ছয় ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে বলে জানিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস। তবে পুরোপুরি নির্বাপণ করতে পারছিল না সংস্থাটি। গতকাল আগুন নেভার ঘোষণার পরই ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যান ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। এরপর অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে পোড়া মালামাল অপসারণের কাজ শুরু হয়।
গতকাল দুপুরে ধ্বংসস্তূপে গিয়ে দেখা গেছে, ধ্বংসাবশেষের ফাঁকফোকর দিয়ে তখনো ধোঁয়া বের হচ্ছে। তবে অন্যান্য দিনের তুলনায় এদিন পোড়া দোকানগুলোতে জনসাধারণের প্রবেশ সীমিত করা হয়। এরপরও অনেকে ভেতরে ঢুকে পোড়া মালামাল হাতড়াতে থাকেন। ব্যবসায়ীরা অস্থায়ীভাবে তাদের নিজেদের পুড়ে যাওয়া দোকানের জায়গায় দোকান বসানোর অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। তবে তিনতলার কাঠ ও টিনের ভবনটির দোকানিদের কীভাবে সেখানে বসার সুযোগ হবে তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অনেকে ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের মূল সড়কের সামনে দোকান বসিয়ে মালামাল বিক্রি করছেন। তারা বলছেন, আগুন লাগার আগে কিছু মালামাল সরাতে পেরেছিলেন। সেগুলোই বিক্রি করছেন।
পোড়া মার্কেটে ঢুকতেই চোখে পড়ে বঙ্গবাজার এনেক্স টাওয়ারের সামনে তিনটি ট্রাকে পোড়া টিন ও লোহালক্কড় তুলছেন শ্রমিকরা। কেউ রড কেটে ট্রাকে তুলছেন। জানতে চাইলে শ্রমিকরা জানান, সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে মালামাল নিয়ে যাচ্ছেন তারা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এসব ময়লা মাতুয়াইলে সিটি করপোরেশনের ময়লার ভাগাড়ে নেওয়া হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তরে হামলার মামলায় গ্রেপ্তার ১০ : অগ্নিকাণ্ডের সময় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ তুলে হামলা করে বিক্ষুব্ধ জনতা। হামলায় ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তরে সরকারি সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয় ২৫০-৩০০ জনকে আসামি করে বংশাল থানায় মামলা করেছে ফায়ার সার্ভিস। বংশাল থানার ওসি মো. মুজিবুর রহমান জানান, ফায়ার সার্ভিসের করা মামলায় ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এদের মধ্যে পাঁচজনকে এক দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশের করা মামলাতেও ওই ১০ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। পুলিশের ওপর হামলা ও কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে অজ্ঞাতপরিচয় ২৫০-৩০০ জনকে আসামি করে বৃহস্পতিবার পুলিশের পক্ষ থেকে আরেকটি মামলা করা হয়েছিল।
গত মঙ্গলবার সকাল ৬টা ১০ মিনিটে বঙ্গবাজারে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছায় তারা। পরে প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসের ৫০টি ইউনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে তার আগেই আগুনের লেলিহান শিখা পুড়িয়ে তছনছ করে বঙ্গবাজার এলাকার ছয়টি মার্কেট। এতে পাঁচ হাজার বেশি ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান।