শিয়া-সুন্নি ধর্মীয় বিভেদ এবং মধ্যপ্রাচ্যেজুড়ে প্রভাব বিস্তারের সহিংস প্রতিযোগিতা চলছিল সৌদি আরব-ইরানের মধ্যে। তিক্ততায় তলানিতে ঠেকেছিল দুই দেশের সম্পর্ক। তবে সম্প্রতি ভেঙে যাওয়া এ সম্পর্ক আবার জোড়া লাগতে শুরু করেছে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উষ্ণতাকে ত্বরান্বিত করেছে এপ্রিলের শুরুর সপ্তাহে চীনের বেইজিংয়ে সৌদি-ইরান পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক। এ বৈঠকে দুই মন্ত্রী ইরান-সৌদির মধ্যে পুনরায় ভিসা ও বিমান চলাচল কার্যক্রম শিগগিরই শুরুর কথা জানান। এর আগে মধ্যপ্রাচ্যের দুই ক্ষমতাধর দেশ গত ১০ মার্চ চীনের মধ্যস্থতায় তাদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে পৌঁছে। তবে, শিয়া মুসলিম অধ্যুষিত ইরান ও সুন্নি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ সৌদি আরব বছরের পর বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব বজায় রাখতে একে অন্যের বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধে জড়িয়ে আছে। ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক, লেবাননে এই নজির স্পষ্ট।
এখন দুই বৈরী দেশের সম্পর্কের বরফ গলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সুসম্পর্কের সুবাতাস বইবে এমন আশা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে এ আশা জাগিয়েছে ইয়েমেন ও সিরিয়া প্রসঙ্গে সৌদির বদলে যাওয়া মনোভাব। আট বছর পুরনো সংঘাতের অবসানে সৌদি আরব ও ওমানের দূতেরা আগামী সপ্তাহে ইয়েমেনের রাজধানী সানা যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন বলে জানিয়েছেন এ সংক্রান্ত আলাপে সম্পৃক্ত দুই ব্যক্তি। ইয়েমেনের ইরানঘনিষ্ঠ হুতি আন্দোলনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্থায়ী একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির বিষয়ে আলোচনা করতে ওই দুই দেশের কর্মকর্তারা সেখানে যাবেন বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন তারা।
সৌদি আরব ও ইরান সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে গত মাসে চীনের মধ্যস্থতায় চুক্তি করার পর দুই পক্ষের মধ্যকার বছরের পর বছর ধরে চলে আসা বৈরিতা ও ইয়েমেনসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে একে অপরের বিরোধী পক্ষকে সমর্থন দেওয়াসহ সম্পর্কের ফাটল যে ধীরে ধীরে জোড়া লাগছে, এই পদক্ষেপ সেই সংকেতই দিচ্ছে বলে ধারণা পর্যবেক্ষকদের।
রয়টার্স বলছে, সৌদি কর্মকর্তাদের সানা সফর রিয়াদ ও হুতি আন্দোলনের মধ্যকার আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত দেবে। জাতিসংঘের শান্তি প্রচেষ্টার পাশাপাশি ওমানের মধ্যস্থতায় এ দু’পক্ষের মধ্যে আলোচনার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ওমান কয়েক বছর ধরেই সীমান্তবর্তী প্রতিবেশী ইয়েমেনে সংঘাতরত পক্ষগুলোর বিরোধ মীমাংসা করে সেতু গড়তে চেষ্টা চালিয়ে আসছে। এ পক্ষগুলোর সঙ্গে ইরান, সৌদি আরবের মতো আঞ্চলিক শক্তি ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তি জড়িয়ে আছে। ইয়েমেন একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি হলে তা মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
দুইপক্ষের মধ্যে এই সংক্রান্ত কোনো চুক্তি হলে তা ২০ এপ্রিল থেকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে শুরু হতে যাওয়া ঈদের ছুটির আগেই ঘোষিত হতে পারে বলে জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা। তবে এ বিষয়ে সৌদি সরকার কিংবা হুতি বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য জানানো হয়নি।
২০১৪ সালের শেষভাগে সানার সরকারকে উৎখাত করা হুতিরা রাজধানী সানাসহ ইয়েমেনের অধিকাংশ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের দাবি, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা ও বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়ছে তারা। ইরানঘনিষ্ঠ এই গোষ্ঠীটি ২০১৫ সাল থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের বিরুদ্ধে লড়ছে। এ লড়াই এরই মধ্যে লাখো মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। যুদ্ধের কারণে ইয়েমেনের ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে বেঁচে থাকার জন্য আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর দেওয়া মানবিক ত্রাণ সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
ইরানের সঙ্গে সেতুবন্ধে সিরিয়ার সঙ্গেও দূরত্ব কমে আসছে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিধর সৌদির। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে আরব লিগ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা করছে সৌদি আরব সরকার। আগামী মে মাসে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে এ সম্মেলন। আসাদ এ সম্মেলনে অংশ নিলে আনুষ্ঠানিকভাবে সিরিয়ার আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটবে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিন কর্মকর্তা এ কথা জানিয়েছেন। আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র নিয়ে শিগগিরই সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান দামেস্ক যাবেন বলেও জানিয়েছেন দুই কর্মকর্তা।
আগামী ১৯ মে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে আরব লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এতে আসাদকে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়ে জানতে রয়টার্স থেকে সৌদি সরকারের যোগাযোগ কর্মকর্তা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে আরব লিগ মহাসচিবের মুখপাত্র জামাল রুশদি বলেন, ‘অনুমিত সফর সম্পর্কে আমাদের আগেভাগে কিছু জানানোর কথা না।’
সিরিয়া একসময় আরব লিগের সদস্য ছিল। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে বিক্ষোভ দমনে প্রেসিডেন্ট আসাদের চরম কঠোর অবস্থানের জেরে ২০১১ সালে দেশটিকে আরব লিগ থেকে বরখাস্ত করা হয়। ওই বছরই সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যা এখনো শেষ হয়নি। এবার ২২ সদস্যের আরব লিগে সিরিয়ার প্রত্যাবর্তন অনেকটা প্রতীকীই হবে। তবে এটি নিশ্চিতভাবেই গৃহযুদ্ধ নিয়ে সিরিয়ার প্রতি আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটাবে। এবছরের ফেব্রুয়ারিতে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে যোগ দিয়ে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ সিরিয়ার প্রতি আরব বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘আরব বিশ্ব থেকে সিরিয়াকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা কোনো কাজে আসছে না। আমাদের বরং দামেস্কের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করা উচিত। বিশেষ করে মানবাধিকার ইস্যু ও শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ার মতো বিষয়গুলোতে।’
প্রায় এক যুগের গৃহযুদ্ধ সিরিয়ার লাখো মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। অসংখ্য বিদেশি শক্তি ওই যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করেছে এবং দেশটিকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। গত মাসে রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, রোজার মাসের পর রিয়াদ এবং দামেস্ক পরস্পরের দেশে নিজেদের দূতাবাস পুনরায় চালু করার বিষয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে। যদিও সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, কনস্যুলার সার্ভিস পুনরায় শুরু করতে তারা সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলছে।
ইয়েমেন-সিরিয়ার মতো ইরাক, লেবাননেও সহিংস পরিস্থিতি কমে আসতে পারে। কারণ এ দুই দেশেও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির নেপথ্য কারণ হিসেবে ইরান-সৌদির দ্বন্দ্বকে দায়ী করা হয়। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন হামলায় সাদ্দাম হুসেইন ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ইরাকে রাজনৈতিক, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক প্রভাব গভীর করেছে ইরান। ২০১৯ সালে ইরাকের আকাশসীমা ব্যবহার করে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালায় ইরান। দুই দশকেরও বেশি সময় পর ২০২০ সালে সৌদি-ইরাকের সীমান্ত ক্রসিং পুনরায় খুলে দেওয়া হয়। এর ফলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নত হওয়ার আশা তৈরি হয়। বাগদাদ সরাসরি আলোচনায় বসতে চেয়েছিল। কিন্তু গত বছর ইরাক রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হওয়ায় সেই আলোচনা থমকে যায়।
অন্যদিকে, লেবানন রাষ্ট্রের ওপর ইরানপন্থি হিজবুল্লাহর দখল রয়েছে অভিযোগে ২০১২ সালে সৌদি আরব এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ সেখান থেকে তাদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেয়। বর্তমানে দেশটি নজিরবিহীন এক রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে সীমিত ক্ষমতার এক মন্ত্রিসভা দেশ পরিচালনা করছে। তেহরান এবং রিয়াদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ লেবাননের অচলাবস্থার অবসান ঘটাতে পারে, এই আশা তৈরি করেছে। লেবাননের সংসদের স্পিকার নাবিহ বেরি বলেছেন, ‘ইতিবাচক এসব সংবাদ লেবাননের রাজনীতিবিদদের ‘দ্রুত’ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে উৎসাহিত করতে পারে।’ হিজবুল্লাহ বলেছে, ইরান-সৌদির চুক্তি একটি ইতিবাচক ঘটনা।