জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ দেশের মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংসদীয় গণতন্ত্র ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। তিনি স্বল্পতম সময়ের মধ্যে জাতিকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সংবিধান উপহার দিয়েছিলেন। জাতীয় সংসদের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সরকারি দলের সদস্যরা এসব কথা বলেন। অন্যদিকে বিরোধী দলের নেতারা বলেছেন, সংসদের অনেক অর্জনের সঙ্গে দুর্বলতাও আছে। এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ে জড়িতদের চিহ্নিত করতে এখন পর্যন্ত কমিশন গঠন না হওয়া এবং এখনো দায়মুক্তি আইনের মতো কালো হয়।
গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদ সংসদের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ১৪৭ বিধিতে উত্থাপন করা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের নেতারা এসব কথা বলেন।
জাতীয় সংসদের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত শুক্রবার জাতীয় সংসদে স্মারক বক্তব্য দেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। ওইদিন সংসদ নেতা এই প্রস্তাব আনেন।
গতকাল আলোচনায় অংশ নিয়ে গণপরিষদের সাবেক সদস্য ও চট্টগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমার আক্ষেপ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে দেশে কোনো প্রতিবাদ হয়নি। আমরা অঝোরে কেঁদেছি। আমাদের হাতে কিছুই ছিল না। কিছুই করতে পারিনি। আমরা মুক্তিযোদ্ধা আমাদের হাতিয়ার ছিল না, কিছুই ছিল না। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরে আমরা সংগঠনকে শক্তিশালী করেছি।’
মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘জেনারেল ওসমানীকে বঙ্গবন্ধু ভালোবাসত। তাই তার ওপরে সব দায়িত্ব দিয়েছিল। বীরউত্তম, বীরবিক্রম সবকিছু। সে যাকে পাইছে, তাকে দিছে। এর কোনো হিসাব ছিল না।
ইতিহাস বিকৃতি, মিথ্যাচার এবং রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন উল্লেখ করেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের কারণে রাষ্ট্র আজ হুমকির সম্মুখীন। ভবিষ্যতে কী হবে তা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী আনিসুল হক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী প্রমুখ সরকারি দলের সদস্যরা আলোচনায় অংশ নেন। তারা বলেন, বঙ্গবন্ধু আমাদের শুধু স্বাধীনতা দেননি। স্বাধীনতার ১০ মাস ১৩ দিনের মধ্যে আমাদের একটি সংবিধান দিয়েছিলেন। তিনি এই সংসদের মাধ্যমে ৩ বছর ৭ মাস ৫ দিন শুধু আইন প্রণয়ন করেই এই দেশের আইনের ভিত স্থাপন করে দেননি সংসদের অধিবেশনের মাধ্যমে তিনি সংসদের রীতিনীতি, সংসদীয় চর্চা ও সংসদের মর্যাদা স্থাপন করে দিয়ে গেছেন। এই সংসদেই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ পাস হয়েছে। আবার এই সংসদেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আন্দোলনের মাধ্যমে আবার সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে পেয়েছে দেশের মানুষ।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেছেন, সংসদের অনেক অর্জনের সঙ্গে দুর্বলতাও আছে। তিনি বলেন, ‘আজ পর্যন্ত একটা কমিশন (বঙ্গবন্ধু হত্যা) গঠন করতে পারছেন না। কারা জড়িত ছিল এই জাতি যদি জানতে না পারে, তাহলে ইতিহাসের ভগ্নাংশ রেখে লাভ নেই। কারণ বঙ্গবন্ধুকে মারা ছিল বিশাল ষড়যন্ত্রের কাজ। ডালিম, ফারুক, রশিদ গিয়ে করল, তা নয়। এর পেছনে ষড়যন্ত্র ছিল, তা আপনারা বের করলেন না।’
রাজনীতি জীবনকে রাতারাতি বদলে দেওয়ার একমাত্র পন্থা বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ। তিনি বলেন, ‘রাজনীতি এখন একটা পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে রাজনীতি নেশা ছিল, জীবনকে বাজি রেখে রাজনীতি করত। এখন সেই নেশা নেই। এটা সবচেয়ে বড় পেশা।’
ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘পাকিস্তান আমলে দেখা যেত পাত্র যদি রাজনীতি করে তাহলে বিয়ে দিত না। কারণ সে কোনো চাকরি পাবে না, তাহলে সে খাওয়াবে কী? খাওয়াতে হলে পত্রিকা অফিসে চাকরি করতে হবে, নাহলে বটতলার উকিল হতে হবে, না হয় মুদি দোকানদার হতে হবে অথবা এজিবির কেরানিগিরি। কার কাছে মেয়ে দেবে? কিন্তু এখন যদি শোনে পাত্র সরকারি দল করে, তাহলে কয় আলহামদুলিল্লাহ। এর চেয়ে ভালো পাত্র আর হয় না। কারণ সে কিছু করতে পারবে।’
তিনি আরও বলেন, জাতি এখন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। নিরপেক্ষ কোনো মানুষ নেই। শিক্ষক, ডাক্তার, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক সবাই বিভক্ত। পুরো দেশই এখন দুই ভাগে বিভক্ত। এ আমলে বিএনপির ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ব্যবসা পেয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। বলেন, আওয়ামী লীগ ব্যবসা নেয়। আর পিছে থাকে বড় বড় বিএনপি।
আলোচনায় অংশ নিয়ে গণফোরামের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান বলেন, জাতির জনককে হত্যার পর সংসদকে বিভিন্নভাবে কলুষিত করা হয়েছে। জাতির জনকের হত্যার বিচার বন্ধ করার জন্য ইনডেমনিটির মতো কালো আইন এ সংসদে পাস করে সংসদকে কলঙ্কিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এখনো জাতীয় সংসদে দুর্নীতিবাজ, অর্থ পাচারকারী, লুটেরাদের জন্য ইনডেমনিটির মতো কালো আইন পাস হয়। এটা লজ্জার ব্যাপার।’
গণফোরামের সদস্য বলেন, জাতির জনকের হত্যার বিচার বন্ধ করার জন্য ইনডেমনিটির মতো কালো আইন এ সংসদে পাস করে সংসদকে কলঙ্কিত করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের, রাজাকার-আলবদরদের সংসদ সদস্য করে সংসদকে কলুষিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, জনগণের মালিকানা ছিনতাই করে গঠিত হচ্ছে জাতীয় সংসদ। আজকের জাতীয় সংসদে জাতির জনকের দর্শন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা অনেকাংশেই অনুপস্থিত।
মোকাব্বির খান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা ছিল ১৯৭০ সালের নির্বাচন। তখন পশ্চিম পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে ছিল নির্বাচন কমিশন। কিন্তু নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে জয় পেয়েছিল আওয়ামী লীগ। ওই নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। ১৯৭৩ সালের নির্বাচন নিয়েও কেউ প্রশ্ন তোলেনি।
১৯৭৫ সালের পর বৈধ-অবৈধ কোনো সরকারের আমলে নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ হয়নি অভিযোগ করে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘কখনো সংবিধান কাটছাঁট, কখনো হ্যাঁ-না ভোট, কখনো ব্যালট বাক্স চুরি, কখনো ১ কোটি ৩০ লাখ ভুয়া ভোটার, কখনো আগের রাতে ভোট চুরি ইত্যাদি। এ অপবাদ থেকে বাদ পড়েননি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাও।’
মোকাব্বির খান বলেন, কিছু বিষয়কে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা উচিত। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু, সংসদ, সংবিধান, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংবিধান এগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুললে চরম বেইমানি হবে।