বাংলাদেশের পথিকৃৎ ফটোসাংবাদিক

পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দীন রোডে ‘পাকিস্তান ফটোগ্রাফিক ইম্পোরিয়াম’ নামে একটা স্টুডিও ছিল। সেই স্টুডিওতে কাজ করতেন, মোজাম্মিল ও তার বড় ভাই মোশারফ হোসেন লাল। স্টুডিওর মালিক ছিলেন মতি সাহেব। সেই আমলে ফটোগ্রাফি শেখার জন্য কোনো বইপত্র ছিল না। ফলে ওস্তাদের হাত ধরে ফিল্ম ডেভেলপ ও ছবি প্রিন্ট করা শিখতে হতো। প্রথাগত নিয়ম মেনে, মোজাম্মিল ও মোশারফ ডার্করুমের কলাকৌশল রপ্ত করেন মতি সাহেবের কাছ থেকে। ওস্তাদের কথাগুলোই ছিল তাদের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস।

পাকিস্তান অবজারভারের [পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ অবজারভার] ফটোসাংবাদিক ওবায়েদুর রহমান ফিরোজ প্রতিদিন পাকিস্তান ফটোগ্রাফিক ইম্পোরিয়ামে যেতেন। মোজাম্মিল তার ছবি বানিয়ে দিতেন। ১৯৫৮ সালের নভেম্বর মাসে অবজারভার অফিসে ডার্করুম স্থাপিত হয়। ডার্করুমের জন্য একজন টেকনিশিয়ান দরকার। মোজাম্মিলকে অবজারভার অফিসে নিয়ে যান ফিরোজ। পত্রিকাটির বার্তা সম্পাদক এবিএম মূসা। মোজাম্মিলের ডার্করুমের কাজ তার খুব পছন্দ হলো। তিনি মোজাম্মিলকে নিয়ে সম্পাদক আবদুস সালামের রুমে যান। সালাম সাহেব বললেন, ‘আজই কাজে লেগে যাও, বেতন ৭০ টাকা।’ মোজাম্মিল বললেন, ‘স্টুডিওতে পাই ৭৫ টাকা। সবার হয় উন্নতি, আর আমার হচ্ছে অবনতি।’ তখন এবিএম মূসা বললেন, ‘এখানে লেগে থাকো, ভবিষ্যৎ আছে।’ মোজাম্মিলের নৈপুণ্যে দুই মাসের মধ্যেই বেতন বেড়ে হলো ১১০ টাকা। আর ছয় মাসের মধ্যেই তিনি স্টাফ ফটোগ্রাফার পদে উন্নীত হন।

যে দুইজন সংবাদচিত্রীর হাত ধরে বাংলাদেশের ফটোসাংবাদিকতার প্রাতিষ্ঠানিক গোড়াপত্তন শুরু হয়, মোজাম্মিল ছিলেন তাদের একজন। ফটোসাংবাদিকরা তাকে ‘গুরু’ বলে মানতেন। আধুনিক প্রকাশনার পাশাপাশি পত্রিকায় নিজস্ব আলোকচিত্রী নিয়োগদানের কৃতিত্ব পাকিস্তান অবজারভারের। অবজারভার কর্তৃপক্ষ ১৯৫৮ সালে ওবায়েদুর রহমান ফিরোজকে প্রথম স্টাফ ফটোগ্রাফার হিসেবে নিয়োগ দেন। এরপর স্টাফ ফটোগ্রাফার পদে নিয়োগ পান মোজাম্মিল। মোজাম্মিলের অনুপ্রেরণায় চিত্রালীতে যোগ দেন তার বড় ভাই মোশারফ হোসেন লাল। এই হচ্ছে, বাংলাদেশের ফটোসাংবাদিকতার ক্রমবিকাশের ধারা।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ষাট ও সত্তরের দশক খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়। অগ্নিঝরা ওই দিনগুলোতে, আইয়ুব-ইয়াহিয়ার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের ছবি তুলে চারদিকে হৈচৈ ফেলে দেন মোজাম্মিল। অবজারভার অফিস তখন ছিল পুরান ঢাকার বাংলাবাজার গার্লস স্কুলের পাশে। চাকরিতে যোগ দেওয়ার মাস দুয়েক পর এক দুপুরে ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশন দিয়ে ফিরছিলেন মোজাম্মিল। টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছে। রাস্তায় পড়ে থাকা গম, লাইন ধরে খাচ্ছে একঝাঁক কাক। দৃশ্যটি তার খুব চোখে ধরল। অবজারভারের প্রথম পাতায় ছাপা হলো ছবিটা। এই ছবিটাই তাকে প্রথম পরিচিতি এনে দেয়। এই ছবির মাধ্যমে তিনি একটি শৃঙ্খলা দেখাতে চেয়েছিলেন।

আরেকটি ছবি খুব সাড়া ফেলেছিল। সদরঘাটে রাস্তায় দুই ষাঁড় তুমুল গুঁতাগুঁতি করছে। একটি সাদা অন্যটি কালো। আমেরিকায় তখন কৃষ্ণাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গদের দাঙ্গা চলছিল। ওই ঘটনার প্রতীকীচিত্র হিসেবে ষাঁড়ের লড়াইয়ের ছবিটি ১৯৬০ সালের ২১ জুন অবজারভারের প্রথম পাতায় ছাপা হয়। ছবিটি এতই সাড়া ফেলেছিল যে, কয়েক দিন পর পাকিস্তানের ডন পত্রিকায়ও ছবিটি ছাপা হয়েছিল। শিল্পী মুস্তাফা আজিজও ছবিটি অবলম্বনে কার্টুন এঁকেছিলেন।

১৯৬৪ সালের ২২ মার্চ কার্জন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি তৎকালীন গর্ভনর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর মোনায়েম খান। অনুষ্ঠানে যেতে দেরি হয়ে গেল মোজাম্মিলের। গিয়ে শুনলেন, একটু আগে ছাত্ররা মঞ্চ ভেঙে দিয়েছে। ভাবলেন, চাকরিটা বোধ হয় গেল। প্যান্ডেলের ভেতর ভাঙাচোরা চেয়ার এলোমেলো পড়ে আছে। ধ্বংসস্তূপের মাঝখান দিয়ে হেঁটে আসছেন, মোনায়েম খান। তাকে ঘিরে অসংখ্য পুলিশ। পরদিন অবজারভারের ছবিটা লিড হিসেবে ছাপা হয়ে গেল। চাকরি যাওয়ার পরিবর্তে অভিনন্দন আসতে শুরু করল, নানা জায়গা থেকে।

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ছবিটিও হয়েছিল দারুণ। বেশির ভাগ সময় মাতাল থাকতেন জেনারেল ইয়াহিয়া। আর কথা বলার সময়, নিজের কানে হাত দেওয়া ছিল তার বদঅভ্যাস। তেজগাঁও বিমানবন্দরে এসে মাতাল অবস্থায় কথা বলছেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে। মাঝে মাঝেই অভ্যাসবশে কান চুলকে নিচ্ছেন। ওই মুহূর্তটা ধরলেন মোজাম্মিল। ১৯৭০ সালের ৫ এপ্রিল অবজারভারের প্রথম পাতায় ছাপা হলো, জেনারেলের কান ধরা ছবি।

১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আইয়ুব খানের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। সেই ধর্মঘটে পুলিশ গুলি চালিয়ে কয়েকজন ছাত্রকে হত্যা করে। এর প্রতিবাদে পরের দিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে ‘রক্তের ডাকে সাড়া দাও’ ব্যানার নিয়ে ‘নগ্নপদ পথযাত্রা’ করে বিক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজ। ভেজা রাস্তায় ছাত্রীদের খালি পাগুলোকে ফোকাস করে ছবি তোলেন মোজাম্মিল। প্রথম পাতায় প্যানারমিক ফরমেটে ছাপা হয় ছবিটা। ওই বছর তিনি ছবিটা পাঠান নেদারল্যান্ডসে, ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো প্রতিযোগিতায়। ছবিটি ১৯৬৩ সালের ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো প্রতিযোগিতায় সার্টিফিকেট অব অনার লাভ করে। পরের বছর তিনি আবারও এই পুরস্কার পান। ১৯৬৯ সালে ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো প্রতিযোগিতার প্রদর্শনীতে তার তোলা একটি ছবি স্থান পায়। ১৯৬২ সালে ঢাকায় ইউনাইটেড স্টেটস ইনফরমেশন সার্ভিস [ইউএসআইএস] আয়োজিত ওকামাটো আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় ও সম্মাননা পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬৬ সালে দ্য পাকিস্তান কাউন্সিল আয়োজিত ফটোজার্নালিজম প্রতিযোগিতায় তিনি সম্মানসূচক পুরস্কার পান।

পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি বেশ কয়েকবার পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন। প্রথম হামলার শিকার হন ৬০ সালে কার্জন হলে ছাত্রদের সমাবেশে লাঠিচার্জের সময়। দ্বিতীয় বার আক্রান্ত হন ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময়। ছাত্রনেতা আসাদ যে দিন শহীদ হন সেদিন পুলিশ তার মাথা ফাটিয়ে দেয়। গুরুতর আহত হয়ে তাকে বেশ কয়েক মাস হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। মাথার যন্ত্রণাটাও দেখা দিয়েছিল সেই ঘটনার পর থেকে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও তিনি আরেক দফা পুলিশের পিটুনির শিকার হন। সে সময় তার কাঁধের একটি হাড় ভেঙে গিয়েছিল।

ঊনসত্তরের ২০ জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেলের আমতলায় ছাত্র-জনতার জমায়েতে সকাল থেকেই উপস্থিত ছিলেন মোজাম্মিল। আমতলা থেকে মিছিল শুরু হলো। মিছিলটি রেললাইন অতিক্রম করে নাজিমুদ্দীন রোডে চলে গেল। মিছিলের শেষ অংশ তখনো আমতলায়। পুলিশের গতিবিধি দেখার জন্য চাঁনখারপুল পেট্রোল পাম্পের কাছে রয়ে গেলেন ফটোসাংবাদিকরা। হঠাৎ মিছিলে হামলা করে পুলিশ। জনতাও ছত্রভঙ্গ হয়ে পুলিশের দিকে পাথর মারতে শুরু করে। পুলিশ ক্ষিপ্ত হয়ে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ ও গুলি শুরু করে। দুপক্ষের মাঝখানে পড়ে যান মোজাম্মিল। পুলিশ মোজাম্মিলকে পেটাতে শুরু করে। মাথায় আঘাত পেয়ে তিনি সংজ্ঞা হারান। জ্ঞান ফিরে পেয়ে দেখেন, হাসপাতালে তিনি। পুলিশ মোজাম্মিলকে পেটাচ্ছে আর কয়েকজন ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন, ফটোসাংবাদিক জহিরুল হক আর রশীদ তালুকদারের তোলা ছবি দুটি ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের স্মারক ছবি হয়ে আছে।

৩৭ বছর অবজারভারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মোজাম্মিল হোসেন। পুলিশি নির্যাতন তার শেষ জীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলে। ব্রেন হেমারেজে শরীরের ডান দিকটা অসাড় হয়ে যায়। স্মৃতি দুর্বল হয়ে পড়ে। ডায়েবেটিক ও হার্ট এনলার্জসহ নানা রোগে বিছানায় পড়েন। বাধ্য হয়ে, ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাকে চাকরি থেকে অবসর নিতে হয়। সেই জীবনটা ছিল দুর্বিষহ। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতেন, মৃত্যুর আগে রাষ্ট্র তার কাজের স্বীকৃতি দেবে। তার সে স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে গেছে। ২০০৩ সালের ১১ এপ্রিল মারা যান বাংলাদেশের এই পথিকৃৎ ফটোসাংবাদিক।

লেখক : আলোকচিত্র সম্পাদক, দেশ রূপান্তর

shahadatparvezpix@gnail.com