ব্যয়ের ৭৭ শতাংশ অর্থায়ন হবে বিদেশি ঋণে

গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে আর্থিক সংকটে পড়ে সরকার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পাশাপাশি নিজস্ব তহবিলেও টান পড়ে সরকারের। ওই সময় কৃচ্ছ্রসাধনের নির্দেশনাও এসেছিল উচ্চপর্যায় থেকে। তবে আসন্ন নির্বাচনের কারণে সরকার তাদের অবস্থান থেকে সরে আসছে। নির্বাচন সামনে রেখে উন্নয়ন ব্যয় বাড়াচ্ছে সরকার। তবে এই উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বেশির ভাগ অর্থায়ন হচ্ছে বিদেশি ঋণে। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদিত প্রকল্পগুলোতে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।

গতকাল মঙ্গলবারও ১১টি প্রকল্প অনুমোদন দেয় একনেক। এর মধ্যে চারটি ছাড়া বাকি সবই নতুন প্রকল্প। ১১ প্রকল্পে প্রায় ১৩ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৩ হাজার ১২৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক অর্থায়ন ১০ হাজার ৫২৬ কোটি ১১ লাখ টাকা। এসব প্রকল্পের ৭৭ শতাংশ অর্থায়ন হচ্ছে বিদেশি ঋণে। বাকি ২৩ শতাংশ দেশি অর্থায়ন।

প্রধানমন্ত্রী এবং একনেকের চেয়ারপারসন শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় এ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

অনুমোদিত প্রকল্প : বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস (২য় সংশোধন) প্রকল্প, এই প্রকল্পের মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৯৪১ কোটি, দুইবারের সংশোধনের পর এর ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। প্রকল্পটিতে সরকারি অর্থায়ন মাত্র ১৭২ কোটি টাকা, বাকি ৯৩৩ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দিচ্ছে বিশ্বব্যাংকের আইডিএ।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ‘বাংলাদেশ এনভায়রমেন্টাল সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (বেস্ট)’ প্রকল্প; দেশে দূষণ কমানোর উদ্যোগ হিসেবে নেওয়া প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা। এতে মাত্র ১৯৪ কোটি টাকা সরকারি অর্থায়ন। বাকি ২ হাজার ৮০১ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হচ্ছে বিশ্বব্যাংকের আইডিএ প্রকল্প ও ফ্রান্সের উন্নয়ন সংস্থা এএফডির কাছ থেকে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘বন্যা ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন জরুরি সহায়তা’ প্রকল্পটিরও বেশির ভাগ অর্থায়ন হচ্ছে বিদেশি ঋণে। এ প্রকল্পে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬৯৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা। যেখানে সরকারের অর্থায়ন মাত্র ১৪০ কোটি টাকা, বাকি ৫৫৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে নেওয়া হচ্ছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) কাছ থেকে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের দুটি প্রকল্প যথাক্রমে ‘এডিবির জরুরি সহায়তায় বন্যা ২০২২-এ ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ অবকাঠামো পুনর্বাসন’ প্রকল্প এবং ‘বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার পুননির্মাণে জরুরি সহায়তা’ প্রকল্প। এ দুই প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে যথাক্রমে ১ হাজার ১২৩ কোটি ও ৩৪৪ কোটি টাকা। দুটোতেই বড় অঙ্কের ঋণ দিচ্ছে এডিবি। প্রথম প্রকল্পটিতে সরকারের অর্থায়ন মাত্র ২২২ কোটি ৬১ লাখ, বাকি ৯০০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ঋণ দিচ্ছে এ সংস্থাটি। দ্বিতীয় প্রকল্পটিতে ৩৪৪ কোটির মধ্যে সরকারের অর্থায়ন মাত্র ৫৪ কোটি, বাকি ২৮৯ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে এডিবি।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের ‘সারসংরক্ষণ ও বিতরণ সুবিধার্থে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ৩৪টি বাফার গুদাম নির্মাণ’ (১ম সংশোধন) প্রকল্প; এতে মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা। কিন্তু এটিও ৩৬৫ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে নতুন ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ২ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। এটি অবশ্য সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নের প্রকল্প।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের ‘সিলেট-চারখাই-শেওলা মহাসড়ক উন্নয়ন’ প্রকল্পটিতে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। এতে ২ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকাই ঋণ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। বাকি ১ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা সরকারি অর্থায়ন। সিলেট জেলার সিলেট সদর, দক্ষিণ সুরমা, গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলায় এটি বাস্তবায়িত হবে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ‘২০২২ সালের বন্যায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের সিলেট-ছাতকবাজার সেকশন (মিটারগেজ পুনর্বাসন)’ প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪১ কোটি, এর মধ্যে এডিবি দেবে ১৮৫ কোটি টাকা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘পাকিস্তানের ইসলামাবাদে বাংলাদেশ চ্যান্সারি কমপ্লেক্স নির্মাণ’ (৪র্থ সংশোধন) প্রকল্পটির মূল ব্যয় ছিল ২৯ কোটি টাকা। কিন্তু চারবারের ব্যয় বাড়ার পর এটির ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৯৭ কোটি টাকা।

কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের ‘বাংলাদেশ ভূমি জরিপ শিক্ষার উন্নয়ন” (১ম সংশোধন) প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ২৭৮ কোটি টাকা, ৬১ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর পর এর ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪০ কোটি টাকা। এটির সম্পূর্ণ অর্থায়ন সরকারের।

নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের ‘একসেলেরেটিং ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড ট্রেড কানেক্টিভিটি ইন ইস্টার্ন সাউথ এশিয়া (একসেস)-বাংলাদেশ ফেজ ১ (বিএলপিএ কম্পোনেন্ট)’ প্রকল্পটিতে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা। এতে বিশ্বব্যাংকের ঋণ থাকছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। এতে ৬৪৬ কোটি টাকা সরকারের অর্থায়ন।

পরিকল্পনা কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান; কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাকসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা সভার কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন।