দেশে প্রসূতি অস্ত্রোপচার বেড়েছে ১১ শতাংশ

দেশে গত পাঁচ বছরে প্রসূতি অস্ত্রোপচারের (সিজার) মাধ্যমে সন্তান প্রসবের (সি-সেকশন বা সিজারিয়ান) হার ১১ শতাংশ বেড়েছে। কারণ হিসেবে স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালকেন্দ্রিক প্রসব বৃদ্ধিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০১৭ সালে সিজারের হার ছিল ৩৪ শতাংশ, এখন তা ৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া গত পাঁচ বছরে কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের সংখ্যায় কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে কৃশকায় শিশুর হার বাড়ছে। ২০১৭ সালে কৃশকায় শিশু ছিল ৮ শতাংশ। এখন তা বেড়ে হয়েছে ১১ শতাংশ।

বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০২২-এর প্রাথমিক ফলে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে এই জরিপের তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। জরিপে গত পাঁচ বছরে দেশে মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্যের অন্যান্য সূচকের উল্লেখযোগ্য উন্নতির তথ্য পাওয়া গেছে।

জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (নিপোর্ট) এ জরিপে দেশের শহর ও গ্রামের ৩০ হাজার ১৮টি খানার ওপর তথ্যে নেওয়া হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ করা হয় ২০২২ সালের ২৭ জুন থেকে ১২ ডিসেম্বরের মধ্যে। নিপোর্টের এই জরিপে সহায়তা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের দাতা সংস্থা ইউএসএআইডি ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)। জরিপ প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আজিজুর রহমান, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সাহান আরা বানু, নিপোর্টের মহাপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম প্রমুখ।

সিজার ১১% বেড়েছে : জরিপে বলা হয়, ২০১১ সালে সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানের হার ছিল ১৮ শতাংশ, যা ২০২২ সালে ৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ সিজারের বেশির ভাগই হয়েছে বেসরকারি হাসপাতালে। ২০২২ সালে এসে দেশের মোট সিজারে জন্মদানের ৮৪ শতাংশই হয়েছে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে। এ ছাড়া ১৪ শতাংশ হয়েছে সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে। বাকি ২ শতাংশ হয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিওতে)।

মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশু স্বাস্থ্যের উল্লেখযোগ্য উন্নতি : জরিপে বলা হয়, গত পাঁচ বছরে দেশে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালের তুলনায় ২০২২ সালে শিশুমৃত্যুর হার বেশ কমেছে। ধারাবাহিক তিন বছরের গড় অনুযায়ী, পাঁচ বছরের নিচে জীবিত শিশুজন্মের পর মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৪৩ থেকে ৩১-এ নেমে এসেছে। তবে এখনো এক বছরের কম বয়সের শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২৫ জন এবং এক মাসের কম বয়সের শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২০ জন।

একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ সেবাদানকারীর সহায়তায় প্রসবের হার গত পাঁচ বছরে বেড়েছে। ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী ৭০ শতাংশ প্রসবই একজন দক্ষ সেবাদানকারীর সহায়তা ঘটছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসব ১৪ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৭ সালে এ হার ছিল ৫১ শতাংশ, এখন ৬৫ শতাংশ।

এখনো দেশে পাঁচ বছরের নিচে শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যদিও গত পাঁচ বছরে এ হার ৩১ থেকে কমে ২৪ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু এখনো দেশে চারটি শিশুর মধ্যে একটি শিশুর উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে কম।

বেড়েছে দরিদ্র নারীদের স্বাস্থ্যসেবা : ২০১১ সালের হিসাব অনুযায়ী দরিদ্র নারীদের তুলনায় ধনী নারীদের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে এসে সেবা গ্রহণের মাত্রা ছিল ছয় গুণ বেশি। ২০২২ সালে সেই সংখ্যা দ্বিগুণে নেমে এসেছে। অর্থাৎ এখন বিত্তশালী নারীদের তুলনায় চার গুণ বেশি দরিদ্র নারীরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসে সেবা নিচ্ছে।

২০২২ সালে ৮৮ শতাংশ নারী অন্তত একবার একজন প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর থেকে গর্ভকালীন বা এএনসি সেবা নিয়েছেন, ২০১৭ সালে এই হার ছিল ৮২ শতাংশ। তবে করোনার সময় চারবারের অধিক গর্ভকালীন সেবা বা এএনসি নিয়েছেন এ সংখ্যা ৪৭ থেকে কমে ৪১ শতাংশে নেমে এসেছিল।

জন্মবিরতিকরণ ব্যবহার ২% বেড়েছে : গত পাঁচ বছরে জন্মবিরতিকরণ সামগ্রী ব্যবহারের হার ২ শতাংশ বেড়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহারের হার ৩ শতাংশ বেড়ে ৫২ থেকে ৫৫ শতাংশ হয়েছে।

টিএফআর একই জায়গায় : বর্তমানে প্রজনন হার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট (টিএফআর) ২ দশমিক ৩। অর্থাৎ নারীপ্রতি সন্তান প্রসবের সংখ্যা ২ দশমিক ৩ জন। এই হার ক্রমেই কমছে। ২০০০ সালে এই হার ছিল ৩ দশমিক ৩, ২০০৪ সালে ৩ দশমিক শূন্য ও ২০০৭ সালে তা আরও কমে ২ দশমিক ৭ এ নেমে আসে। কিন্তু এরপর থেকে, অর্থাৎ ২০১১ সাল থেকে সর্বশেষ ২০২২ সালের জরিপের সময় পর্যন্ত গত ২২ বছরে এই হার কমেনি ও বাড়েনি, একই জায়গায় ২ দশমিক ৩ এ স্থির হয়ে আছে।

অল্প বয়সে বিয়ে ও সন্তান জন্ম কমেছে : গত পাঁচ বছরে অবশ্য কিশোরী বয়সেই সন্তান জন্ম দেওয়ার মাত্রা ৫ শতাংশ কমেছে। ২০১৭ সালে এই মাত্রা ছিল ২৮ শতাংশ, ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৩ শতাংশে।

অল্প বয়সে বিয়ের মাত্রাও ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। ২০-২৪ বছরের নারীদের মধ্যে ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হয়ে যাওয়ার হার ছিল ২০১১ সালে ৬৫ শতাংশ, ২০১৭ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৫৯ শতাংশে এবং ২০২২ সালে তা আরও কমে ৫০ শতাংশে নেমে আসে।

৬০% বাড়িতে উন্নত স্যানিটেশন : জরিপ অনুযায়ী, দেশে মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। এখন শহর ও গ্রামের ৯৯ শতাংশ বাড়িতে বিদ্যুৎ আছে। ৯৮ শতাংশ ঘরে কারও না কারও মোবাইল ফোন আছে। নতুন বিবাহিত তিনজন নারীর দুজনের হাতে মুঠোফোন দেখা যায়। ৬০ শতাংশ বাড়িতে উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা আছে।