মঙ্গল শোভাযাত্রার অভিযাত্রা কে রুখবে?

মঙ্গল শোভাযাত্রার বিরুদ্ধে জনৈক আইনজীবী মামলা করেছেন। যতটা মনে পড়ে, এই আইনজীবীই আগে একবার কোনো একটা স্পর্শকাতর বিষয়ে মামলা করেছিলেন। আমরা চিরকালই আইনজীবীদের নামের আগে ‘বিজ্ঞ’ শব্দটি ব্যবহার করে আসছি। নিশ্চয়ই এই আইনজীবীর নামের পাশে সেই শব্দটি ব্যবহৃত হবে। তবে বিজ্ঞজনরাও মাঝে মধ্যে এমন কিছু করে ফেলেন যে, শব্দটি ব্যবহার করতে দ্বিধা হয়। সম্প্রতি আইনজীবীদের নির্বাচনের সময় যে ছবিগুলো প্রকাশ হয়েছে তাতে পুনরায় শব্দটির ব্যবহার করতে দ্বিধা বেড়েছে।

একবার, সে বহু আগের ঘটনা। বাংলাদেশ টেলিভিশনে ১৯৮৫ সালে ‘সময়-অসময়’ বলে আমার একটি ধারাবাহিক নাটক প্রচারিত হয়েছিল। সেখানে একজন উকিল জমিজমাসংক্রান্ত মামলায় গ্রামের মানুষকে বিপদে ফেলতেন এবং শেষ পর্যন্ত তিনি চিহ্নিত হয়ে, প্রতিবাদী জনতার হাতে লাঞ্ছিত হন, শেষে মৃত্যুবরণ করেন।

বিষয়টি নিয়ে আইনজীবী সম্প্রদায় ক্ষুব্ধ হয়ে আমার, প্রযোজক এবং অভিনেতার নামে মামলা করেন। এই মামলা হয় কয়েকটি জেলা শহর থেকে। যদি সব জায়গায় আমাদের হাজিরা দিতে হয়, তাহলে অনেক দিন লেগে যেত। এ সময় শ্রদ্ধেয় ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহমেদ ও মাহমুদুল ইসলামের শরণাপন্ন হই এবং তারা মোটামুটি মামলা যারা করেছেন তাদের ওপর ক্ষুব্ধই হন।

তারা বলেছিলেন, সব জেলায় মানুষের মধ্যে ভালোমন্দ আছে। এতে ক্ষুব্ধ হওয়ার কী আছে? বিষয়টি তখন দ্রুতই মিটে গিয়েছিল। এরপর ড. আহমদ শরীফের একটি উক্তি নিয়ে মামলা হলো, সেও সারা দেশে। হাইকোর্টে আমরা হাজির হয়ে জামিন প্রার্থনা করলাম। হাইকোর্ট জামিন দিয়ে দিলেন। শেষ পর্যন্ত মামলাটি আর কার্যকর রইল না। এই ভদ্রলোকদের নিয়ে বিচার ব্যবস্থাকে বিচার করা চলবে না।

উপমহাদেশের আইনজীবীদের অনেক যুগান্তকারী ভূমিকা আছে। নেতাজি সুভাষ বসুর আইএনএ বাহিনীর পরাজিত সৈনিকদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল এবং তারা কারাগারে অন্তরীণ ছিলেন। কারও কারও প্রাণদ- হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরুসহ অনেক আইনজীবীই তাদের পক্ষ অবলম্বন করে নিষ্ঠুর ব্রিটিশের হাত থেকে তাদের রক্ষা করেন।

অনেক রাষ্ট্রদ্রোহী মামলায় আইনজীবীরা দাঁড়িয়ে গেছেন বিনা সম্মানীতে। সামরিক শাসনের আমলেও দেখেছি, আইনজীবীরা সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। আবার কুখ্যাত কোনো খুনির পক্ষে কোনো আইনজীবী দাঁড়াননি। বিশাল অর্থের প্রতিশ্রুতি থাকলেও তারা ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এমনি পরিস্থিতিতে, মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বন্ধ করার জন্য একজন আইনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। রমনা বটমূলে যে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান তা বন্ধ করার জন্যও তিনি মামলা জুড়ে দিতে পারেন। যারা বটমূলে বোমা হামলা করেছিল, তাদের মানসিকতার সঙ্গে এই আইনজীবীর তুলনা করলে কি একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে? হতে পারে। তবে তার সমর্থকের অভাব হবে না, কারণ এখন তাদের আছে ফেসবুক। ফেসবুকে অনেক দিন ধরেই এসবের পক্ষে সংগঠিত প্রচারণা চলছে।

আমরা যারা এই ভূখ-ে জন্মেছি, তাদের ভাষা একবার বিপন্ন হয়েছিল রক্ত দিয়ে তাকে রক্ষা করতে হয়েছিল। তখন পাকিস্তানের এক মন্ত্রী (সম্ভবত ফজলুর রহমান) বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও প্রস্তাব করেছিলেন, আরবি হরফে বাংলা লেখার কথা। যাক, সেসব ধোপে টেকেনি। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী একবার ১৯৬৬ সালে রবীন্দ্র শতবর্ষে গণমাধ্যমে এবং বইপুস্তকে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। তাও তারা সফল হয়নি। বাংলার সংস্কৃতির শক্তি তাকে রক্ষা করেছিল। ভাষা সংস্কৃতির আন্দোলন এবং ৬ দফা, ১১ দফার আন্দোলন দেশকে মুক্তিযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও নানা কথা শোনা গেছে, যার মধ্যে একটি  মুসলিম বাংলা। ঘাপটি মারা এই মুসলিম বাংলা নানাভাবে জাগ্রত হয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গেই আছে ধর্মনিরপেক্ষতা, যার আরেক অর্থ হচ্ছে অসাম্প্রদায়িকতা। আর অসাম্প্রদায়িকতা যে আছে, তার প্রমাণ পহেলা বৈশাখ উদযাপন। পহেলা বৈশাখ উদযাপন বাংলার শহর গ্রাম সর্বত্র, আর এ উদযাপন ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে। আর এ উদযাপন সেদিন শুরু হয়নি।

এ দেশের মূলধারার জনগোষ্ঠীর প্রত্যেকের কাছে তার বছরের হিসাব রয়েছে। নতুন হালখাতায় তার অর্থনৈতিক জীবনের সূচনা। সম্রাট আকবরের সময় থেকে এই গণনা শুরু হয়ে আজও তা হয়ে আসছে এবং বাঙালি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তা পরিচিত।

এবার মঙ্গল শোভাযাত্রার কথা। এই শোভাযাত্রাও প্রাচীন, কিন্তু অন্য আঙ্গিকে। অশুভকে বিনাশ করার জন্য চৈত্রসংক্রান্তিতে নানা আয়োজন করা হতো। নানা ধরনের অশুভ প্রতীক সৃজনশীল মানুষেরা কল্পনা করে তার একটি রূপ দিত। এই রূপ একেক সময় একেক ধরনের। খরা, দুর্ভিক্ষ, মহামারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসবকে মোকাবিলা করার জন্য পৃথিবীর অনেক দেশের মতোই বাংলার মানুষরাও তাদের কল্পনার শত্রুকে চিহ্নিত করেছে।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন যখন চলছিল, তখন চারুকলা বিদ্যালয়কেন্দ্রিক এই আয়োজন শুরু হয়। শহীদ মিনার থেকে শুরু করে নানা ধরনের ছোট-বড় মুখোশ তৈরি করে এক বিশাল শোভাযাত্রা নিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করা হয়। প্রথমে হাজার হাজার এবং কালক্রমে তা লাখো জনতার এক মিছিলে পরিণত হয়। শুধু ঢাকায় নয়, বিভিন্ন শহরে এমনকি গ্রামেও এই শোভাযাত্রা ছড়িয়ে পড়ে। বাংলা শতাব্দীর শুরুতে ১৪০০ সালে তা বিপুল আকার গ্রহণ করে।

একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, উদ্যোক্তা শিল্পীরা প্রতি বছরই নতুন একটা কুলক্ষণকে প্রতীক হিসেবে নিয়ে আসে যার মধ্য দিয়ে বাঙালি মানস প্রতিফলিত হয়। আফ্রিকার দেশগুলোতে, চীনে, লাতিন আমেরিকায় এ ধরনের বিভিন্ন উৎসব হয়ে থাকে। যে কারণেই এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পৃথিবীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেও স্থান পেয়েছে।

সমস্যা হচ্ছে, কিছু কিছু লোক বাংলার হাজার বছরের সংস্কৃতিকে স্বীকার করতেই চান না। বাংলা ভাষাও তাদের একসময়ের শত্রু। এই করে করে পাকিস্তান করেছিল। সেই পাকিস্তানের এখন অবস্থা কী? ইসলামও কি নিরাপদে আছে? কাদিয়ানী, আহমদিয়াদের ওপর কি অমানবিক নির্যাতন সেখানে। অর্থনীতি গেছে, আছে শুধু সেনাবাহিনী আর ক্রিকেট। সংগীত নেই, চিত্রকলা নেই, নাটক নেই, নৃত্যকলা নেই।

মানুষও কি যথার্থ শান্তিতে আছে? একটু ইন্টারনেট ঘাঁটলেই দেখতে পাবেন, কি শান্তিতে সেখানকার নাগরিকরা দিন-রাত কাটায়? তবু সেই মুখীই হতে হবে?

বিজ্ঞজনদের প্রতি অনুরোধ, বাঙালি সংস্কৃতির গায়ে আঘাত দেবেন না। বাঙালি প্রত্যাঘাত করতে জানে। অতবড় পাকি জঙ্গি সেনাবাহিনী, তাকেও এই মাটিতে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে।

মঙ্গল শোভাযাত্রা চলবেই,

মাঙ্গলিক সংগীত চলবেই।

বাংলার হাজার বছরে সংস্কৃতি অবিনাশী এবং সৃজনের শক্তিতে বলীয়ান।

লেখক: নাট্যকার, অভিনেতা ও কলামিস্ট

mamunur530@gmail.com