সড়ক যেন মৃত্যুফাঁদ

আইনের যথাযথ প্রয়োগের বিকল্প নেই

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০১:৩১ এএম

সড়ক-মহাসড়কে যাত্রী-পথচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে এ পর্যন্ত কম কথা হয়নি। আলাপ-আলোচনায় সড়ক নিরাপদ করার সমাধানসূত্রও মিলেছে। কিন্তু দিনকে দিন সড়কের মৃত্যুফাঁদ হয়ে ওঠা ঠেকানো যাচ্ছে না। প্রতিদিনই বাড়ছে সড়কে দুর্ঘটনা এবং মৃত্যুহার। ৬ জুলাই দেশ রূপান্তরে ‘জুনে সড়কে ৪৩৮ মৃত্যু ৩০% বাইক দুর্ঘটনায়’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশন-এর বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ওই মাসে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪৩৮ জন। ১৪৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ৩০.৫৯ শতাংশ।

‘গতি মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়, তবে সতর্কতা তাকে জীবিত ফিরিয়ে আনে’ এই জাপানি প্রবাদটির সমান্তরালে আমাদের সমাজে অনেক যানবাহনে সাঁটানো ‘দ্রুতগতির চেয়ে নিরাপদ ভ্রমণ সবসময়ই উত্তম’ এই বাক্যবন্ধটির যেন ‘কাজির গরু কিতাবে আছে গোয়ালে নেই’-এর মতো অবস্থা। সড়ক-মহাসড়কে বাইক এখন যাত্রী পরিবহনের একটি অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এমনকি দূরপাল্লায়ও অনেকেই যান বাইক ভাড়া করে। বাইক চালকদের অধিকাংশই বেপরোয়া গতিতে বাইক চালান এবং তারা ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা করেন না, এই চিত্র সংবাদমাধ্যমে ইতিমধ্যে বহুবার উঠে এলেও যাদের এসব দেখভালের দায়দায়িত্ব তাদের অনেকের গাফিলতির কারণে বাইক চালকদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তাছাড়া  ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও রাস্তা, বেপরোয়া গতি, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা, বেতন-কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল দুর্ঘটনার জন্য বহুলাংশে দায়ী। এর পাশাপাশি অনেকেরই ট্রাফিক আইন না জানা ও অগ্রাহ্য করার  অপপ্রবণতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি এই কারণগুলোও  সড়ক-মহাসড়কে মর্মস্পর্শিতার পরিসর বাড়িয়েই চলেছে।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা চরম সংকটে রূপ নিয়েছে। প্রায় নিত্য সংবাদমাধ্যমে যে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর আমরা পাই, তা যে পুরো চিত্র নয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সংবাদমাধ্যমেরই ভাষ্য, প্রকৃত অবস্থা আরও অনেক বেশি মর্মান্তিক। প্রাণহানি, আহতদের দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ক্ষতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মানসিক ও আর্থিক বিপর্যয় সমাজের জন্য খুব দুঃসহ বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতি নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তির অভাবও এ ক্ষেত্রে বৈরী ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে দেশের উল্লেখযোগ্য সড়ক অবকাঠামোর মানও প্রশ্নমুক্ত নয়। প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রশস্ত ও প্রশ্নবিদ্ধ  অবকাঠামোর জন্যও দুর্ঘটনা যেন সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সমস্যাগুলোর পেছনে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং যথাযথ তদারকির অভাব। ট্রাফিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে জবাবদিহির ঘাটতি এবং অনেক ক্ষেত্রে অনিয়ম নিয়মে পরিণত হওয়ায় কিংবা নিয়ম ভঙ্গকারীদের ছাড় দেওয়া এসব বিষয়ের বিরূপ প্রভাবও সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহুমাত্রিক কারণে সড়ক-মহাসড়ক মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।

ব্রিটিশ আইনজীবী এডওয়ার্ড কাউন্সেল যথার্থই বলেছেন, সব দুর্ঘটনাই ঘটে মনুষ্যসৃষ্ট কোনো না কোনো কারণে। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে যে বহুমুখী ক্ষতি হচ্ছে, তা প্রতিরোধযোগ্য। যথাযথ পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা মোটেও দুরূহ নয় বলে আমরা মনে করি। মনে রাখা দরকার, নিরাপদ সড়ক কেবল উন্নয়নের প্রতীকই  নয়, তা  সভ্য ও মানবিক সমাজের পরিচায়কও বটে। উন্নত দেশেও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে কিন্তু এর আমাদের দেশের মতো এত ঊর্ধ্বমুখী তো নয়ই, একই সঙ্গে নয় প্রতিকারহীনও। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হবে, সড়কে মৃত্যু বন্ধ করতে হবে এ দাবির পক্ষে সোচ্চার সচেতন মানুষ মাত্রই। এর পরও কেন সড়কে মৃত্যুর মিছিল প্রতিনিয়ত দীর্ঘ হচ্ছে, সেদিকটি ভেবে দেখতে হবে। এই বাস্তবতা সংশ্লিট দায়িত্বশীল সব পক্ষকে আমলে নিতেই হবে যে,  আইনের যথাযথ প্রয়োগের বিকল্প নেই। দুর্ঘটনার বিচারে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাজা পান চালক ও হেলপার। কিন্তু দায়ী পরিবহনের মালিক ও কোম্পানি অন্তরালেই থেকে যায়। পরিবহন মালিকদের পার পেয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগেরও  যথাযথ প্রতিকার যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কাজের কাজ করা।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত