বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭-এর আলোকে তরুণ জনগোষ্ঠী, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তর নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনার এই প্রয়াস হলো। বাংলাদেশ বর্তমানে তার অর্থনৈতিক ও জনমিতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ কর্মক্ষম (১৫-৬৪ বছর) বয়সের হওয়ায় বাংলাদেশ এখনো একটি মূল্যবান জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সুযোগ ধারণ করে। তবে এই সম্ভাবনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে রূপান্তরিত হবে না। এটি নির্ভর করবে সরকারের নীতি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা বিকাশ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং কার্যকর সুশাসনের ওপর। অন্যদিকে, যদি এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে এই জনমিতিক সুবিধাই ভবিষ্যতে জনমিতিক বোঝায় পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ এই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে একটি বিনিয়োগনির্ভর এবং বেসরকারি খাতনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কৌশল গ্রহণ করেছে। বাজেটে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, ব্যাংকিং সংস্কার এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। জনমিতিক লভ্যাংশ বলতে এমন একটি পরিস্থিতিকে বোঝায় যখন কোনো দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং সেই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় আয় বৃদ্ধি করে। পূর্ব এশিয়ার দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান এবং চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল এই জনমিতিক লভ্যাংশের কার্যকর ব্যবহার। তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে তাদের তরুণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সম্ভাবনা বিদ্যমান। বর্তমানে দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জনগণ কর্মক্ষম বয়সে রয়েছে। জন্মহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে এবং উচ্চশিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় অংশগ্রহণ ক্রমাগত বাড়ছে। এই অনুকূল জনমিতিক কাঠামো আগামী প্রায় ১৫-২০ বছর পর্যন্ত বহাল থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন ইউএন পপুলেশন ডিভিশন, ইউএনএফপিএ এবং বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশের সুযোগ আনুমানিক ২০৪০-২০৪৫ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এরপর বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে এবং নির্ভরশীলতার হার আবার বাড়তে শুরু করবে। ফলে বর্তমান সময়টিই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সুযোগের জানালা। এই প্রেক্ষাপটে বাজেট ২০২৬-২৭ মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং ধাপে ধাপে শিক্ষায় মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্প্রসারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিক্ষা, ডিজিটাল ক্লাসরুম, ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি, বিনামূল্যে ওয়াইফাই, গবেষণা ও উদ্ভাবন, শিল্প-বিশ্ববিদ্যালয় সংযোগ এবং ইন্টার্নশিপ কার্যক্রম চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বাজেটে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ধাপে ধাপে কারিগরি শিক্ষা চালুর প্রস্তাব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পাশাপাশি জাপানি, কোরিয়ান, ম্যান্ডারিন, আরবি, ফরাসি ও জার্মান ভাষা শিক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের ঋণ সুবিধা প্রদানের ঘোষণা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের তরুণদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে বাজেটে সরকারি চাকরির পরিবর্তে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নকে কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সরকার উৎপাদনশীল শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, আধুনিক কৃষি, কৃষিভিত্তিক শিল্প, নারী উদ্যোক্তা এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
কেবল সরকারি চাকরি দিয়ে বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত তরুণের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বাজেটে স্টার্টআপ, গবেষণা, উদ্ভাবন, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ, শিল্প-বিশ্ববিদ্যালয় সহযোগিতা এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সংস্কারও এই বাজেটের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক। সরকার ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সুশাসন, মূলধন পর্যাপ্ততা এবং করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করার পাশাপাশি নারী, তরুণ উদ্যোক্তা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে করপোরেট বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, গ্রিন বন্ড, সুকুক এবং বিকল্প দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে বিনিয়োগের জন্য কেবল ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমে। জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে পরিণত করার অন্যতম মাধ্যম সুষ্ঠুভাবে শিক্ষাদান ও প্রশিক্ষণ। কর্মক্ষম জনবলকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। বিশেষত কারিগরি শিক্ষায় জনগোষ্ঠীকে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগ ও প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ নির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই নীতির সফল বাস্তবায়ন হলে শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং উচ্চদক্ষতাসম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। বর্তমান বিশ্বে সবুজ অর্থনীতি, বৃত্তাকার অর্থনীতি, সৃজনশীল অর্থনীতি এবং নীল অর্থনীতি নতুন কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাজেটে পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ, গ্রিন বন্ড এবং টেকসই অর্থায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের তরুণরা সৌরশক্তি, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, টেকসই কৃষি, পরিবেশবান্ধব নির্মাণ, পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি, সামুদ্রিক সম্পদ, তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল কনটেন্ট, অ্যানিমেশন, গেমিং এবং সৃজনশীল শিল্পে নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। বিশেষ করে বৃত্তাকার অর্থনীতি ও সবুজ ব্যবসা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার পাশাপাশি নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে সক্ষম।
তবে বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। প্রথমত, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থা ও শিল্প খাতের চাহিদার মধ্যে এখনো উল্লেখযোগ্য দক্ষতার অসামঞ্জস্য বিদ্যমান। তৃতীয়ত, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ এখনো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। চতুর্থত, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, প্রশাসনিক জটিলতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতাও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য কয়েকটি নীতিগত পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা, উদ্ভাবন ও স্টার্টআপ ইনকিউবেশন কেন্দ্র সম্প্রসারণ করতে হবে। তৃতীয়ত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সুবিধা বাড়াতে হবে। চতুর্থত, শিল্প-বিশ্ববিদ্যালয় সহযোগিতা জোরদার করে শিক্ষার্থীদের বাস্তব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পঞ্চমত, সবুজ ব্যবসা, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
একটি দেশের বিশাল জনসংখ্যা ‘জনমিতিক লভ্যাংশ’ নাকি ‘জনমিতিক বোঝা’ তা নির্ভর করে সেই জনগোষ্ঠীর দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগের ওপর। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি থাকলে এবং তাদের উপযুক্ত ব্যবহার করা গেলে তা অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়। অন্যথায়, বিশাল কর্মক্ষম অথচ কর্মহীন জনগোষ্ঠী দেশের জন্য বোঝা বা বিপর্যয় ডেকে আনে। নিকট অতীতে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে জনবহুল দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। সম্পদের তুলনায় জনগণ বেশি হওয়ার ফলে সীমিত হয়ে এসেছে নাগরিক সুবিধার পরিসর।
বাংলাদেশ এখনো জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগের মধ্যে রয়েছে, কিন্তু এই সুযোগ চিরস্থায়ী নয়। আগামী দুই দশকের মধ্যেই দেশের জনসংখ্যা কাঠামো দ্রুত পরিবর্তিত হবে এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর অনুপাত বৃদ্ধি পাবে। তাই বর্তমান সময়ে শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং কার্যকর সুশাসনে সমন্বিত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ জনমিতিক লভ্যাংশকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, উদ্ভাবন এবং টেকসই উন্নয়নের শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত করতে পারবে। অন্যথায়, বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী কর্মসংস্থানের অভাব, দক্ষতার ঘাটতি এবং সীমিত বিনিয়োগের কারণে অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে এবং জনমিতিক লভ্যাংশ ধীরে ধীরে জনমিতিক বোঝায় রূপান্তরিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। অতএব, ২০২৬-২৭ সালের বাজেটকে কেবল একটি আর্থিক দলিল হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জনমিতিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি কৌশলগত রোডম্যাপ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, যার সফল বাস্তবায়নই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ তার তরুণ জনগোষ্ঠীকে সম্পদে রূপান্তর করতে পারবে, নাকি সেই সম্ভাবনাকে হারিয়ে ফেলবে।
লেখক : কমনওয়েলথ স্কলার। অর্থনীতির বিশ্লেষক ও অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়