জ্ঞান ও আদর্শে অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব

মুফতি হাফেজ আহমদুল্লাহ। চট্টগ্রামের পটিয়া মাদ্রাসার শায়খুল হাদিস ও প্রধান মুফতি। আদর্শের প্রশ্নে আপসহীন এই আলেম পুরো জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন কোরআন, হাদিস, ফিকহ ও তাসাউফের মাধ্যমে আদর্শ মানুষ গড়ার কাজে। চলায়-বলায় পূর্বসূরি আলেমদের উজ্জ্বল নমুনা। তার জীবনের নানা দিক তুলে ধরেছেন ইজাজুল হক

‘চট্টগ্রাম ন্যাশনাল হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ারের একটি বেডে ঘুমিয়ে আছেন তিনি। হাতে চিকিৎসার সরঞ্জামাদি লাগানো। ঘড়ির কাঁটা রাত দুটোর ঘর স্পর্শ করতেই তিনি জেগে উঠলেন। অ্যালার্মের আওয়াজ ছাড়াই, কারও জাগিয়ে দেওয়া ছাড়াই। কয়েক দিন আগেই স্ট্রোক করেছেন। ডাক্তার বলেছেন বিশ্রাম নিতে হবে। তবে রাতের শেষ প্রহরে মহান আল্লাহর দরবারে হাজিরা দেওয়ার যে অভ্যাস তিনি গড়েছেন আশৈশব, তা কি আর ডাক্তারের একদিনের পরামর্শে বদলানো যায়? তিনি জেগে ওঠেন। নিয়মমতো শুরু করেন আল্লাহর কাছে সিজদাবনত হওয়ার আয়োজন। অজু নেই বুঝতে পারেন। বিছানা ছেড়ে অজু করতে যেতে চাইলেন। অথচ এই মুহূর্তে অজু করতে যাওয়ার মতো শক্তি তার নেই। চিকিৎসকও নিষেধ করেছেন, তিনি যেন শুয়ে থাকেন সারাক্ষণ। তার নড়াচড়া দেখে আমি জেগে উঠলাম, তাকে বিরত করলাম। দীর্ঘদিনের অভ্যাস তাজাজ্জুদের জায়নামাজে দাঁড়াতে না পেরে তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।’

কয়েক দিন ধরে হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা মুফতি হাফেজ আহমদুল্লাহর কথা এভাবেই বয়ান দিচ্ছিলেন তার খাদেম মাওলানা আহমদ হাফিজ। তিনি আরও বলেন, ‘ফরজ নামাজের সময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুয়ে-বসে যেভাবে পারেন নামাজ আদায় করে নেন। সঙ্গে থাকা সবাইকে নামাজের আদেশ দেন। এ ছাড়া পুরো সময় জিকির ও দোয়ায় মশগুল থাকেন। এখনো তিনি শঙ্কামুক্ত নন।’

শেষ রাতের ইবাদত ও ফরজ নামাজের ব্যাপারে আজন্ম এমনই সচেতন মুফতি হাফেজ আহমদুল্লাহ। আজান হওয়ার আগেই প্রস্তুত হয়ে যান মসজিদে যাওয়ার জন্য। পটিয়া মাদ্রাসার কেন্দ্রীয় মসজিদে ইমামের ঠিক পেছনের জায়গায় তাকে দেখা যায়নি গত প্রায় তিন দশকে এমন দিন খুব কমই এসেছে। আশি পেরোনোর পরও তিনি প্রয়োজনে নামাজের ইমামতি করেন, ইমামের তেলাওয়াত শুধরে দেন। নামাজের পর মসজিদ থেকে বের হন সবার পরে। তার খাদেমদের ভাষ্য, শেষ রাতে দীর্ঘসময় নামাজ পড়েন, কোরআন তেলাওয়াত করেন। প্রত্যেক নামাজের আগে-পরে দীর্ঘ মোনাজাত, রোনাজারি ও মাসনুন দোয়া পাঠ তার সারাজীবনের অভ্যাস। সুন্নতের প্রতি তার প্রচণ্ড অনুরাগ-ভালোবাসা। ইতিহাসের পাতা থেকে যেসব নিভৃতচারী আল্লাহওয়ালা বুজুর্গের কিংবদন্তি জানা যায়, মুফতি হাফেজ আহমদুল্লাহ যেন তাদেরই জীবন্ত উদাহরণ।

চট্টগ্রামের পটিয়া থানার নাইখাইন গ্রামের মোজাহেরুল্লাহ মুনশি বাড়িতে ১৯৪১ সালে তার জন্ম। বাবা মাওলানা ঈসা আলেম ছিলেন। মা ছিলেন বাংলাদেশের প্রাচীনতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জিরি মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম মাওলানা আহমদ হাসান (রহ.)-এর মেয়ে। পরিবারেই পেয়েছেন নিবিড় ইসলামচর্চার পরিবেশ। রীতি অনুযায়ী কোরআন পাঠের মাধ্যমে বাবার কাছেই লেখাপড়ার হাতেখড়ি। এরপর ভর্তি হন নানার প্রতিষ্ঠিত জিরি মাদ্রাসায়। ১৯৫১ সালে মাত্র দশ বছর বয়সে হেফজ শেষ করেন। তার স্মরণশক্তি এতই প্রখর যে, গত বাহাত্তর বছরে তার হেফজে কোনো দুর্বলতা দেখা যায়নি। এই বয়সেও কোরআনের যেকোনো জায়গার যেকোনো ভুল পাঠ তাৎক্ষণিক ধরিয়ে দিতে পারেন; নামাজ-তারাবিতে টনটনে কণ্ঠে ধরিয়ে দেন। বিস্ময়কর এই গুণের কারণে সবার কাছে তিনি ‘হাফেজ সাহেব হুজুর’ নামে পরিচিত।

হেফজ শেষ করে একই প্রতিষ্ঠানে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে পড়াশোনা করেন। প্রতিটি ক্লাসেই রেকর্ড নম্বর পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯৬৪ সালে শিক্ষকদের পরামর্শে উচ্চশিক্ষার জন্য তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে পাড়ি জমান। জামিয়া আশরাফিয়া লাহোরে বিখ্যাত সব মুহাদ্দিসদের কাছে ফের দাওরায়ে হাদিসের পাঠগ্রহণ করেন। বিশ্বখ্যাত মুফাসসির ও সিরাতগবেষক মাওলানা ইদ্রিস কান্ধলভি (রহ.), শায়খুল হাদিস মাওলানা রসুল খান (রহ.)সহ বড় বড় আলেমদের সান্নিধ্যে নিজেকে গড়ে তোলেন। পরের বছর মুলতানের খাইরুল মাদারিসে মাওলানা মুহাম্মদ শরিফ কাশ্মিরীর কাছে যুক্তিবিদ্যা-দর্শন-কালাম পড়েন। সেখানেও যথারীতি বিস্ময়কর ফল করেন এবং শিক্ষকদের কাছ থেকে ‘বাঙাল কা খরকে আদত’ বা ‘বাংলার বিরল মেধাবী’ খেতাব পান। মুলতান থেকে তিনি  ছোটেন করাচি। ১৯৬৭ সালে দারুল উলুম করাচির ফতোয়া বিভাগে ভর্তি হন। তাফসিরে মাআরিফুল কোরআনের লেখক মুফতি মুহাম্মদ শফি উসমানি (রহ.)-এর কাছে ফিকহের পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।

১৯৬৮ সালে বিপুল জ্ঞান-অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়ে বাড়ি ফেরেন। শিক্ষকতাকে জীবনের ব্রত হিসেবে বেছে নেন। জিরি মাদ্রাসায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘ ২৩ বছর এই প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেন। ইসলামি জ্ঞানের এমন কোনো শাখা নেই, যা তিনি এই প্রতিষ্ঠানে পড়াননি। এক সময় জিরি মাদ্রাসার শায়খুল হাদিস হিসেবে নিযুক্ত হন। শত শত শিক্ষার্থীরা তার কাছে বোখারির সবক নিয়েছেন। ১৯৯১ সালে মাওলানা হাজি মুহাম্মদ ইউনুস (রহ.)-এর অনুরোধে পটিয়ায় চলে আসেন। সিনিয়র মুহাদ্দিস ও মুফতি হিসেবে যোগ দেওয়ার পর দীর্ঘ তিন দশকের পরিক্রমায় আজ তিনি দেশের অন্যতম বৃহত্তম এই মাদ্রাসার শায়খুল হাদিস ও প্রধান মুফতি।

শিক্ষক হিসেবে তিনি দারুণ সফল। শিক্ষার্থীদের আস্থার ঠিকানায় পরিণত হয়েছেন। শুদ্ধ ও স্পষ্ট ভাষায় কথা বলেন। ইসলামি জ্ঞানের গভীর গবেষণা-অধ্যয়ন তার পাঠদানকে করেছে গোছালো ও পরিকল্পিত। কিতাবের শুদ্ধ পাঠোদ্ধার ও মর্মোদ্ধারে তার জুড়ি নেই। ছাত্রদের জন্য সবসময় তার দরজা খোলা। যেকোনো সময় যেকোনো জিজ্ঞাসা নিয়ে তার কাছে হাজির হওয়ার সুযোগ আছে। শিক্ষার্থীদের আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান। খোলামনে কথা বলেন। প্রয়োজনে শিক্ষকসুলভ বিতর্ক ও আদুরে তিরস্কারও করেন। হাদিসের ব্যাখ্যাকার হিসেবে তিনি অদ্বিতীয়, অনন্য ও বিরলপ্রজ।

ফিকহের মৌলিক কিতাবগুলোর মূলপাঠ তার মুখস্থ। হানাফি ফিকহের অন্যতম সেরা বিশ্বকোষ ‘মাআরিফুস সুনান’ তার মুখস্থপ্রায়। ফিকহ-ফতোয়ার সঙ্গে ৬ দশকের সংশ্লিষ্টতার কারণে ছাত্র-ভক্তরা তাকে ‘ফকিহুদ্দীন’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

শরিয়তের প্রতিটি বিষয়ই তিনি অত্যন্ত দৃঢ়চিত্তে হানাফি ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। ইমাম বোখারি (রহ.) সহিহ বোখারিতে হানাফি ফিকহের প্রতি ‘কালা বাযুন্নাস’ বলে যেসব আপত্তি তুলেছেন, প্রতিটির জবাব দিয়ে তিনি লিখেছেন ‘দাফউল ইলতিবাস’ নামের কিতাব।

ফিকহ-ফতোয়া নিয়ে গভীর সাধনা ও জ্ঞানচর্চার ব্যস্ততায় কখনোই তিনি নিজেকে শুদ্ধতর মানুষে পরিণত করার কথা ভোলেননি। জীবনের প্রথম প্রহর থেকে আল্লাহওয়ালা শিক্ষকদের কাছ থেকে আধ্যাত্মিকতার সবক নেন। করাচি থাকাকালে মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)-এর কাছে মননশুদ্ধির প্রথম আনুষ্ঠানিক পাঠ গ্রহণ করেন। তার ইন্তেকালের পর হাফেজ্জি হুজুর (রহ.)-এর কাছে বায়াত হন। ১৯৮১ সালে তিনি হাফেজ্জি হুজুরের কাছ থেকে তাসাউফের ইজাজত ও খেলাফত লাভ করেন। ফতোয়াদান ও পাঠদানের নিরবচ্ছিন্ন ব্যস্ততা সত্ত্বেও আলেমদের বিশেষ মজলিশে আত্মশুদ্ধির সবকদানের পাশাপাশি জনপরিসরে বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে তিনি সীমিতভাবে অংশ নেন।

পুরোদস্তুর লেখক না হলেও লেখালেখিতে তিনি পিছিয়ে নন। ‘দাফউল ইলতিবাস’ ছাড়াও তার রয়েছে বেশ কিছু মূল্যবান রচনা। চট্টগ্রামের বিখ্যাত মনীষীদের নিয়ে তিনি দুই খণ্ডে লিখেছেন ‘মাশায়েখে চাটগাম’। তার জুমার খুতবাসমগ্র বাংলা অনুবাদসহ বেরিয়েছে ‘আন-নাফহাতুল আহমাদিয়্যাহ ফিল খুতুবাতিল মিম্বারিয়্যাহ’ নামে। পটিয়া মাদ্রাসার ফতোয়া বিভাগের প্রকাশিতব্য ফতোয়াসমগ্রের প্রধান সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন তিনি। এ ছাড়া ‘তাজকেরাতুন নুর’, ‘তাসকিনুল খাওয়াতির ফি শরহিল আশবাহি ওয়ান্নাওয়াযির’, ‘ইসলামের দৃষ্টিতে শেয়ারবাজার ও মাল্টিলেবেল মার্কেটিং’, ‘যুগোপযোগী দশ মাসায়েল’ এবং ‘মাজহাব ও মাজহাবের প্রয়োজনীয়তা’ তার উল্লেখযোগ্য রচনা।

ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠা, বিশ্বখ্যাত শিক্ষক ও বুজুর্গদের সান্নিধ্য, হাদিস ও ফিকহের গভীর জ্ঞান, নিজেকে শুদ্ধ করা অবিরত চেষ্টা, কোরআন-সুন্নাহর পথে কঠোর অনুশীলন, নবিজির সিরাতের প্রতি বিশেষ অনুরাগ এবং পূর্বসূরি আলেমদের আদর্শের প্রতি দৃঢ় আস্থা তাকে সোনার মানুষে পরিণত করেছে। তিনি পরিণত হয়েছেন ইসলামি জ্ঞানের বটবৃক্ষে, দেওবন্দি আদর্শের বাতিঘরে এবং হানাফি ফিকহের আপসহীন সিপাহসালারে। তিন ছেলে ও চার মেয়ের জনক আকাশসম এই অসাধারণ মানুষটি খুব সাদাসিধে জীবনযাপন করেন। সারি সারি কিতাবের মধ্যখানে একটি অতি সাধারণ খাটে পাটি ও কাঁথার সঙ্গেই কাটে তার দিন-রাত। পদ-পদবি ও গাড়ি-বাড়ির মোহ তাকে কখনোই স্পর্শ করেনি।

আল্লাহ তাকে সুস্থ করুন, শতায়ু করুন। দেশের ধর্মীয় অঙ্গনের অন্যতম শীর্ষ মুরব্বি হিসেবে তার ছায়া আমাদের ওপর দীর্ঘ করুন।