ইসলাম মানবতা ও ভ্রতৃত্বের ধর্ম। যুগে যুগে মুসলিম কবি-সাহিত্যিকরা ইসলামের মানবতা ও ভ্রতৃত্ব নিয়ে কাব্য রচনা করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম পারস্যের কবি শেখ সাদি (রহ.)। তিনি রচনা করেছেন বনি আদম (আদম সন্তান) নামক বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের এক কালজয়ী কবিতা। এই কবিতাটি জাতিসংঘেও স্থান পেয়েছে।
কবিতাটি তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ গুলিস্তাঁর অন্তর্ভুক্ত। এই কবিতায় তিনি লিখেছেন, ‘আদম সন্তানরা একে অপরের অঙ্গস্বরূপ। স্রষ্টা তাদের একই উৎস থেকে সৃষ্টি করেছেন। জীবনের কোনো এক মোড়ে যদি দেহের একটি অঙ্গে ব্যথা লাগে, তবে অন্য সব অঙ্গ শান্ত থাকতে পারে না। আপনি যদি অপরের দুঃখে ব্যথিত না হন, তবে আপনি প্রকৃত মানুষ নন।’
এই কবিতার মূল দর্শনের সঙ্গে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি হাদিসের গভীর মিল পাওয়া যায়। হাদিসে বলা হয়েছে, মুমিনদের পরস্পরের প্রতি মমতা ও সমবেদনার উদাহরণ একটি দেহের মতো। দেহের একটি অঙ্গ অসুস্থ হলে যেমন পুরো শরীর নিদ্রাহীনতা ও জ্বরে ভোগে, তেমনি এক মুমিনের কষ্টে অন্য মুমিন ব্যথিত হয়। (সহিহ মুসলিম)
মানুষের এই পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টি পবিত্র কোরআনেও স্পষ্টভাবে নির্দেশিত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করেছি। যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই লোকই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক মুত্তাকি। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সব খবর রাখেন।’ (সুরা হুজুরাত ১৩)
শেখ সাদি (রহ.) কোরআন-হাদিস থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে যে কবিতা লিখেছেন, সেটার বার্তা সীমানা পেরিয়ে পৌঁছে গেছে বিশ্বমঞ্চে। ২০০৫ সালে নিউ ইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ইরান একটি গালিচা উপহার দিয়েছিল। গালিচায় স্বর্ণখচিত সুতায় বনি আদম কবিতাটি খোদাই করা হয়েছে। বর্তমানে এটি জাতিসংঘের সভাকক্ষের ভেতরে বিশ্ব শান্তি ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে শোভা পাচ্ছে।
আজকের অস্থির বিশ্বে যখন সংঘাত ও বিভেদ বাড়ছে, তখন শেখ সাদির এই মানবিক দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা অপরিসীম।
২০০৯ সালে ইরানিদের নববর্ষের শুভেচ্ছা বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামা বনি আদম কবিতার উদ্ধৃতি ব্যবহার করেন।
২০২৫ সালের এপ্রিলে কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে প্রাণঘাতী হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা বাড়ে। সেই পরিস্থিতিতে বিখ্যাত এই কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের এক পোস্টে জানান, এ অঞ্চলে উত্তেজনা কমাতে তারা প্রস্তুত।
আমরা যদি একে অপরের ব্যথায় সমব্যথী হতে শিখি, তবেই পৃথিবীটা বসবাসের যোগ্য হয়ে উঠবে। বনি আদম কবিতাটি একটি জীবনদর্শন। এটি আমাদের শেখায়, মানুষ হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব পালনের কথা। প্রতিটি মানুষের উচিত, এই দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়ে শান্তিময় পৃথিবী গড়তে ভূমিকা রাখা। শেখ সাদি (রহ.)-এর এই অমর বাণী যেন প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে গেঁথে থাকে। তবেই স্বার্থক হবে কবির এই কালজয়ী সৃষ্টি।
রুমির কবিতায় আত্মার মুক্তি ও শাশ্বত প্রেম