এই সংকটেও কমল দারিদ্র্য!

করোনার পর রাশিয়া যুদ্ধের কারণে তিন বছর ধরে দেশের মানুষের বেঁচে থাকাটাই বড় প্রাপ্তি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশই অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে গত এক বছরে রেকর্ড মূল্যস্ফীতির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মানুষ। এমন পরিস্থিতি সত্ত্বেও দেশে অস্বাভাবিকভাবে দারিদ্র্যের হার কমেছে বলে দাবি করছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। প্রতিষ্ঠানটির হিসেবে গত সাত বছরে দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হার কমে দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এ ছাড়া অতিদরিদ্রের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে। যা ২০১৬ সালে ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। ওই বছর অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠী ছিল ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। ফলে সাত বছরের ব্যবধানে দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠী কমেছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সময়ে অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠী কমেছে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ।

সর্বশেষ জনশুমারি অনুসারে দেশে জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার। এ হিসাবে দরিদ্রের সংখ্যা ৩ কোটি ১৭ লাখ ৫৭ হাজার। এর আগে সর্বশেষ এমন জরিপ হয়েছিল ২০১৬ সালে। এরপর এ সম্পর্কিত কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। গতকাল বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে এইচআইইএস-২০২২-এর ফলাফল প্রকাশ করে বিবিএস।

২০১৬-১৭ সালের পর দারিদ্র্যের কোনো জরিপভিত্তিক তথ্য না থাকায় অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের সময়ে দারিদ্র্য বৃদ্ধির স্থিতিস্থাপকতার ওপর ভিত্তি করে কিছু দারিদ্র্যের প্রাক্কলন করা হয়েছে।

জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সাত বছরে মানুষের আয় বেড়েছে দ্বিগুণ। সাত বছরের ব্যবধানে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়েছে। দেশে বর্তমানে একটি পরিবারের মাসিক আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৪২২ টাকা। ২০১৬ সালে যা ছিল ১৫ হাজার ৯৮৮ টাকা। ২০১০ সালে একটি পরিবারের গড় আয় ছিল ১১ হাজার ৪৭৯ টাকা। জরিপে আয়ের পাশাপাশি খরচও দ্বিগুণ বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ মুহূর্তে একটি পরিবারের মাসে গড় খরচ ৩১ হাজার ৫০০ টাকা। ২০১৬ সালে যা ছিল ১৫ হাজার ৭১৫ টাকা। ২০১০ সালে একটি পরিবারের গড় খরচ ছিল ১১ হাজার ২০০ টাকা।

বিবিএস দাবি করছে, এ সময়ের মধ্যে মানুষের খাবারের অভ্যাস পরিবর্তন হয়েছে। ফলে এ সময় মানুষ তার আয়ের ৪৫ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যয় করে শুধু পরিবারের খাবারের পেছনে। বাকি ৫৪ দশমিক ২ শতাংশই ব্যয় হয় খাদ্যবহির্ভূত পণ্য কেনার জন্য।

এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেহেতু বিবিএসই খানা আয়-ব্যয় জরিপের একমাত্র প্রতিষ্ঠান, তাদের এ তথ্য মেনে নিয়েই আমাদের কাজ করতে হয়। তবে দারিদ্র্য হ্রাসের যে হার ছিল তা বিবিএসের জরিপে গতি অবশ্য শ্লথ হয়েছে। ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বর্তমান মূল্যস্ফীতি, তারও আগে করোনার প্রভাবে অর্থনীতির ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সেগুলোর ফলে গত ১০ বছরে যেভাবে দারিদ্র্যের হার কমছিল সে হার যে শ্লথ হয়েছে সেটি বিবিএসের জরিপে উঠে এসেছে।

এ অর্থনীতিবিদ বলেন, বিবিএসের হিসেবে আয়ের যে বৈষম্য সেটিও উঠে এসেছে। সেটি ২০১০-এ ছিল দশমিক ৪৬, ২০১৬-তে ছিল দশমিক ৪৮ সেটিও বেড়েছে, এখন তা দশমিক ৪৯-এর ওপরে। এর ফলে দেশে যে উন্নয়ন হচ্ছে তার ইতিবাচক ফলাফল সেটা ঠিকভাবে সবাই পাচ্ছে না। সম্পদ বৈষম্য যদি বের করা যেত তখন দেখা যেত আয় বৈষম্য থেকেও সম্পদ বৈষম্য অনেক বেশি হবে। এটা তো সুষম বণ্টন বা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সে ধারণা বিপরীত এটি। উন্নয়ন হচ্ছে, দারিদ্র্য নিরসন হচ্ছে কিন্তু তা শ্লথ হয়ে গেছে। এটাকে আরও দ্রুততর করতে হবে।

ড. মোস্তাফিজ আরও বলেন, আমাদের সামাজিক সুরক্ষাকে শক্তিশালী করে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে এবং আয়ের ন্যায্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এটাকে অ্যাড্রেস করতে হবে।

জরিপের প্রশ্নপত্রে নতুন করে ভোগকৃত খাদ্যদ্রব্য এবং খাদ্যবহির্ভূত দ্রব্য ও সেবার তালিকা আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অবলম্বন করে প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। ২০১৬ সালে খাদ্যদ্রব্যের সংখ্যা ছিল ১৪৯টি, ২০২২ সালে বাড়িয়ে ২৬৩টি করা হয়েছে। খাদ্যবহির্ভূত দ্রব্য ও সেবার সংখ্যা ছিল ২১৬টি, যা ২০২২ সালে বাড়িয়ে ৪৪১টি করা হয়েছে। এসডিজির আলোকে প্রশ্নপত্রে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা হয়েছ। যেমন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রশ্ন, মাতৃত্ব ও শিশুমৃত্যুসংক্রান্ত প্রশ্ন, ব্যাংক হিসাবের গ্রাহক, মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর তথ্যসংবলিত প্রশ্ন ও পিতা-মাতার শিক্ষাগ্রহণের সংযোগ নির্ণয়ের জন্য নতুন প্রশ্ন যোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি কভিড-১৯ ও এর টিকাসংক্রান্ত প্রশ্ন সংযোজন করা হয়েছে। পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তাসংক্রান্ত অভিজ্ঞতার প্রশ্ন সংবলিত নতুন সেকশন যোগ করা হয়েছে।

বিবিএসের আয়-ব্যয়ের এ জরিপ বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে শহরের দরিদ্রের হার ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ আর গ্রামে দরিদ্রের হার ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২২ সালে দেশের অতিদরিদ্রের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ নেমেছে। ২০১৬ সালে এ হার ছিল ১২ দশমিক ৯ শতাংশ।

২০২২ সালে খানা বা পরিবারপ্রতি মাসিক আয় ছিল ৩২ হাজার ৪২২ টাকা। মাসিক খরচ ৩১ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ খানাপ্রতি মাসে এক হাজার টাকা সঞ্চয় হচ্ছে। ২০১৬ সালের জরিপে খানাপ্রতি মাসিক আয় ছিল ১৫ হাজার ৯৮৮ টাকা। সেই হিসেবে ছয় বছরের ব্যবধানে আয় দ্বিগুণ হয়েছে।

জরিপে খানার আয়ে দেখা যায়, গ্রামে একটি থানার গড় আয় ২৬ হাজার ১৬৩ টাকা। আর শহরে গড় আয় ৪৫ হাজার ৭৫৭ টাকা। যেখানে ২০১৬ সালে গ্রামের একটি পরিবারের গড় আয় ছিল ১৩ হাজার ৯৯৮ এবং শহরের একটি পরিবারের গড় আয় ছিল ২২ হাজার ৬০০ টাকা।

খানার ব্যয়ের হিসাবে দেখা যায়, ২০২২ সালে গ্রামে একটি খানার মাসিক গড় ব্যয় ২৬ হাজার ৮৪২ এবং শহরের একটি খানার মাসিক গড় ব্যয় ৪১ হাজার ৪২৪ টাকা। যেখানে ২০১৬ সালে গ্রামে একটি পরিবারের মাসিক গড় ব্যয় ছিল ১৪ হাজার ১৫৫ এবং শহরের একটি পরিবারের মাসিক গড় ব্যয় ছিল ১৯ হাজার ৬৯৭ টাকা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, আমরা আমাদের পরিকল্পনা হালাল করি এ স্ট্যাডি দিয়ে। এটার সঙ্গে আমরা আমাদের অভিজ্ঞতার তুলনা করি। এ জরিপ প্রমাণ করে সরকার অগ্রহণযোগ্য অবস্থানে নেই। তবে কভিড ও রাশিয়া যুদ্ধ এ দুটি ঘটনার পর ভারতসহ এ অঞ্চলের অনেক রাষ্ট্রই বিপদে পড়েছে।

মন্ত্রী বলেন, দারিদ্র্য কমার একটি কারণ হলো কভিডের সময় আমরা কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। আমরা যোগাযোগব্যবস্থা সচল রেখেছিলাম, কলকারখানা বন্ধ করিনি। ওই সময় প্রণোদনা দিয়েছি ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি। কভিডের সময়ও আমরা প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছি। আমরা উৎপাদন এবং চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করিনি। আর মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকায় মানুষেকে সুলভ মূল্যে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। রমজানেও এক কোটি পরিবার সহায়তা পেয়েছে। নয়তো মূল্যস্ফীতি ১২-১৩ হয়ে যেত।

জরিপে দেখা যায়, ২০২২ সালে খানাভিত্তিক ভোগ্যপণ্য বাবদ একটি খানার গড় ব্যয় ৩০ হাজার ৬০৩ টাকা। যা ২০১৬ সালে ছিল ১৫ হাজার ৪২০ টাকা। ২০২২ সালে গ্রামের একটি থানার মাসিক ভোগ্যপণ্য ব্যয় ২৬ হাজার ২০৭ টাকা এবং শহরের একটি খানার গড় ব্যয় ৩৯ হাজার ৯৭১ টাকা।

জরিপে দেখা যায়, ২০২২ সালে আগের তুলনায় আয়ের বৈষম্য বেড়েছে। বর্তমানে গড় আয় বৈষম্য ছিল দশমিক ৪৯৯। যা ২০১৬ সালের জরিপে ছিল দশমিক ৪৮২ এবং আগের জরিপের তুলনায় ভোগের বৈষম্য বেড়েছে। ২০১৬ সালে ভোগ বৈষম্য ছিল দশমিক ৩২৪। ২০২২ সালে ভোগ বৈষম্য দশমিক ৩৩৪।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘পরিবারের ব্যয় বেড়েছে কারণ মানুষ এখন না খেয়ে কক্সবাজারে ঘুরতে যায়। আর ক্যালরি গ্রহণে অন্য দেশের সঙ্গে আমাদের তুলনা দিয়ে লাভ নেই। তারা প্রতি বেলায় শ্যাম্পেইন খায়, আমরা খাই না।’

জরিপে দেখা যায়, দেশের সাত বছরের বেশি বয়সের মানুষের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৭৪ শতাংশ। এর মধ্যে পল্লী এলাকায় সাক্ষরতার হার ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শহর এলাকায় সাক্ষরতার হার ৮২ শতাংশ। ২০১৬ সালে দেশের সাক্ষরতার হারছিল ৬৫ দশমিক ৬ শতাংশ।

জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, কভিড-১৯-পরবর্তী সময়ে দেশে দারিদ্র্য হ্রাসের এ চিত্র অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ২০৩১ সালের মধ্যে দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করবে। দারিদ্র্যের হার বের করা এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কারিগরি সহায়তা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। দারিদ্র্য পরিমাপ ও বিশ্লেষণে প্রযুক্তিগত সহায়তাও দিয়েছে সংস্থাটি।

সারা দেশের ৭২০টি নমুনা এলাকায় এ জরিপ পরিচালিত হয়। প্রতিটি নমুনা এলাকা থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ২০টি করে মোট ১৪ হাজার ৪০০ খানা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। জরিপের প্রশ্নপত্রে মোট ১০টি সেকশন রয়েছে। এই ১০টি সেকশনের তথ্য সংগ্রহের জন্য একজন তথ্য সংগ্রহকারী প্রতিটি পরিবারে ১০ বার পরিদর্শন করেন।

এটি অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অধীনে দারিদ্র্য হ্রাসের অগ্রগতি পরিবীক্ষণের পাশাপাশি এসডিজি বাস্তবায়ন অগ্রগতি পরিবীক্ষণে জন্য কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

অনেক সমালোচনার পর ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২২ সময়ে অর্থাৎ এক বছর ধরে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে সরকারের হিসাবের সঙ্গে গবেষণা সংস্থাগুলোর দারিদ্র্যের হার কমার তফাত বেশি। সরকার বলছে দারিদ্র্য কমে গেছে। তবে সানেম (বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং) বলছে বেড়েছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি বাড়লে তা দারিদ্র্য ঘনীভূত করে। নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। এতে দারিদ্র্য বেড়ে যায়।

২০৩১ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গঠন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়া বর্তমান সরকারের লক্ষ্য।