ডিএনএ ম্যাচ করেনি গ্রেপ্তার সেনাসদস্য হাফিজুরের

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩২ এএম

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান (তনু) হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানের ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (ডিএনএ) নমুনা মেলেনি। তনুর শরীর ও পোশাকে পাওয়া পুরুষের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে তার নমুনার কোনো মিল নেই। অর্থাৎ তনুর শরীরে যে স্বতন্ত্র চার পুরুষের ডিএনএ নমুনা পাওয়া গেছে, তার সঙ্গে হাফিজুরের ডিএনএ নমুনা ম্যাচ করেনি। তবে হাফিজুরকে গত শনিবার পুনরায় গ্রেপ্তারের পর কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত।

এদিকে এ ঘটনায় পলাতক সাবেক দুই সেনাসদস্যকে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলে আবেদন করতে সহযোগিতা চেয়েছে তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তারা হলেন সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান জাহিদ ও সিপাহি শাহিন আলম। পিবিআই পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবি (ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো বা ইন্টারপোল) শাখায় এ আবেদন করে। তবে ইন্টারপোলের রেড নোটিসের তালিকায় জাহিদ ও শাহিনের নাম নেই। দুজনকে গ্রেপ্তারে আদৌ ইন্টারপোলে আবেদন করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ও নিশ্চিত করতে পারেনি এনসিবি শাখা। 

২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসের পাওয়ার হাউজের অদূরে একটি জঙ্গলের মধ্যে তনুর মরদেহ পাওয়া যায়। পর দিন তনুর বাবা ইয়ার হোসেন অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। ২০১৭ সালে তৎকালীন তদন্ত সংস্থা সিআইডি তনুর পোশাক থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে প্রোফাইল তৈরি হলেও সন্দেহভাজনদের সঙ্গে নমুনা মেলানো হয়নি।

মামলাটির বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলামের গত ৬ এপ্রিল আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ পর্যন্ত চারজন সাবেক সেনাসদস্যসহ একজন বেসামরিক ব্যক্তির ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ দেয় আদালত। তারা হলেন সেনাবাহিনীর সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান, সাবেক সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান জাহিদ, সাবেক সেনাসদস্য শাহিন আলম, অপর একজন সেনাসদস্যের নাম তদন্তের স্বার্থে জানায়নি পিবিআই। এ ছাড়া কুমিল্লার রাজাপাড়া এলাকায় তনুর পরিচিত ফয়সাল আহমেদ রাব্বি। তবে হাফিজুর রহমান ছাড়া বাকিদের এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। আদালতের আদেশ পেয়ে গত ২১ এপ্রিল কেরানীগঞ্জের নিজ বাসা থেকে হাফিজুরকে আটক করা হয়। এরপর তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে পর দিন ঢাকায় সিআইডিতে ডিএনএ নমুনা জমা দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করা হয়।  

জানা যায়, ১৭ জুন সিআইডি ফরেনসিক বিভাগ হাফিজুর রহমানের ডিএনএ নমুনার প্রোফাইল পরীক্ষার প্রতিবেদন তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়। এতে বলা হয়, তনুর আলামত থেকে পাওয়া ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে হাফিজুরের ডিএনএর কোনো মিল নেই। প্রতিবেদনটি ১৮ জুন আদালতে জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম। তবে তনুর পোশাক ও শরীরে তিনজন স্বতন্ত্র পুরুষের পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ নমুনা পায়। ধারণা করা হচ্ছে, এই স্বতন্ত্র ব্যক্তিরাই তনুর হত্যার সঙ্গে জড়িত। তথ্যানুযায়ী, তনুর পোশাক থেকে পাওয়া আলামত পরীক্ষায় চারজন পুরুষের আলাদা ডিএনএ প্রোফাইল শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালে তিনজনের ডিএনএ পাওয়া যায় তনুর পোশাকের বিভিন্ন অংশে থাকা শুক্রাণু থেকে। আর গত জুন মাসে চতুর্থ ব্যক্তির ডিএনএ পাওয়া যায় একটি কাপড়ের টুকরায় থাকা রক্তের নমুনা থেকে। অর্থাৎ এই চারজনের নমুনা প্রথমে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের কাছ থেকে নেওয়া হয়নি। বরং তনুর পোশাক ও অন্যান্য আলামত থেকেই ওই চারজন অজ্ঞাত ব্যক্তির ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি হয়েছিল।

হাফিজুর রহমানের আইনজীবী মুসলিম উদ্দিন ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা যেই রিপোর্ট পেয়েছি, তাতে হাফিজুরের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে তনুর শরীরে থাকা পুরুষের ডিএনএ নমুনার মিল পাওয়া যায়নি। আদালতে পুলিশ সেটি জমাও দিয়েছি। এ ঘটনায় হাফিজুরের উল্লেখযোগ্য কিছু নেই।

এদিকে হাফিজুর রহমানকে সন্দেহের বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ তনুর লাশ পাওয়ার দুদিন আগে  হাফিজুর রহমানের সঙ্গে তনুর মোবাইলে কথা হয়েছিল। ওই ফোনের কথোপকথন ধরেই পুলিশের সন্দেহ হয়। এ বিষয়ে তদন্তসংশ্লিষ্টরা দফায় দফায় হাফিজুরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। এতে হাফিজুর জানিয়েছেন, তনু সাংস্কৃতিক কর্মী হওয়ায় অফিসিয়াল একটি অনুষ্ঠানে তাকে পারফর্ম করার জন্য নিমন্ত্রণ করতে ফোন দেওয়া হয়েছিল। তবে সে অনুষ্ঠানে না আসায় তনুর কাছে ফোন করে জানতে চেয়েছিলাম। পরে তনু তাকে জানিয়েছিল কিশোরগঞ্জের একটি অনুষ্ঠানে থাকায় তিনি আসতে পারেননি। ওয়ারেন্ট অফিসার হওয়াতে হাফিজুর এসব কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কিছু দায়িত্ব পেতেন, তাই তনুকে ফোন দিয়েছিলেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করা হাফিজুর রহমানের ডিএনএ নমুনার রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। রিপোর্টে কী এসেছে, সেটি গোপনীয় বিষয়। এভাবে বলার সুযোগ নেই। আর পলাতক জাহিদ ও শাহিনকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে ইন্টারপোলে রেড নোটিস জারি করতে পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবি শাখায় আবেদন করা হয়েছে। এনসিবি শাখা এ বিষয়ে কাজ করছে।

রেড নোটিসের তালিকায় নাম নেই দুজনের : সেনাসদস্য জাহিদুজ্জামান জাহিদ ও শাহিন আলম দেশের বাইরে পালিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে জাহিদ ও শাহিনের সর্বশেষ অবস্থান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পেয়েছিল পুলিশ। এরপর থেকে তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো একটি দেশে আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে তদন্ত কর্মকর্তা তাদের সন্ধানে ও গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলে আবেদন করে রেড নোটিস জারি করতে পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবি শাখায় আবেদন করলেও এখনো ইন্টারপোলে আবেদন করেনি এনসিবি। ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে রেড নোটিসের তালিকায় জাহিদুজ্জামান জাহিদ ও শাহিন আলম নামে কারও নাম নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবি শাখার এআইজি আলী হায়দার চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিনি এ বিষয়ে সরাসরি কোনো কথা বলতে রাজি নন। পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া শাখার মাধ্যমে বিষয়টি জানতে হবে।

তবে মিডিয়া অ্যান্ড পিআর শাখার দায়িত্বে থাকা এআইজি এএইচএম সাহাদাৎ হোসাইনকে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে আরেক কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে এনসিবি শাখা থেকে জেনে জানাতে হবে বলে জানান তিনি। তবে ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে রেড নোটিসের তালিকায় এ দুজনের নাম না থাকার বিষয়টি তার নজরে আনলে তিনি বলেন, তাহলে এনসিবি শাখা থেকে এখনো ইন্টারপোলের কাছে আবেদন করা হয়নি বা আবেদন করা হলেও ইন্টারপোল কর্তৃপক্ষ এখনো ওয়েবসাইটে দুজনের তালিকা পাবলিক/প্রকাশ করেনি। এ কর্মকর্তার মতে, কোনো অভিযুক্তের নাম, পরিচয়, ছবি, মামলার কপিসহ যাবতীয় তথ্য ইন্টারপোলের কাছে আবেদন করার সঙ্গে সঙ্গে তা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে না। ইন্টারপোলের সংশ্লিষ্ট বোর্ড যাবতীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে দেখেন। এরপর কারওটা রেড নোটিসের তালিকায় সরাসরি ওয়েবসাইটে পাবলিক/প্রকাশ করে। আবার হাইপ্রোফাইলসহ অন্যান্য বিবেচনায় অনেক অভিযুক্তের নাম-ছবি প্রকাশ না করে গোপনীয় রাখে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোল রেড নোটিস জারি করলেও তা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেনি। কিন্তু বাস্তবে তার বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারি করেছে ইন্টারপোল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত