বঙ্গবাজারে আগুন

চৌকিতে বসে ক্রেতার অপেক্ষায় ব্যবসায়ীরা

রাজধানীর বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ৯ দিন পেরিয়ে গেছে। ঈদ সামনে রেখে চৌকি পেতে দোকান খুলে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন ব্যবসায়ীরা। তবে দোকান খোলার দ্বিতীয় দিনে ক্রেতাসমাগম দেখা যায়নি অস্থায়ী এসব দোকানে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বঙ্গবাজারের ক্রেতাদের বড় অংশ হলো জেলা, উপজেলা পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা। তারা এখান থেকে পাইকারি হিসেবে পোশাক কিনে নিয়ে খুচরা বিক্রি করতেন। এবার আগুনের ঘটনায় ঈদের মার্কেট ধরার জন্য তারা অন্য এলাকার পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কাপড় কিনেছেন। ফলে এই বড় একটি অংশের ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ঈদের আগে খুচরা বিক্রি বাড়বে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বঙ্গবাজারে গিয়ে কথা হয় অন্তত পাঁচজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তারা সবাই একই কথা জানিয়েছেন। জামালাপুর গার্মেন্টসের আনোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলছিলেন, ‘আজ (বৃহস্পতিবার) সকালে এসেছি। একজন পাইকারি ক্রেতার কাছে কিছু প্যান্ট বিক্রি করেছি, এ ছাড়া কোনো ক্রেতাই আসেননি। পাইকারি ক্রেতারা অন্য এলাকা থেকেই মাল নিয়েছেন এবার। ঈদের আগে খুচরা বিক্রি বাড়তে পারে। এ জন্য কিছু পোশাক দোকানে তুলেছি।’

গত বুধবার থেকে চৌকি পেতে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের পুড়ে যাওয়া জায়গায় অস্থায়ী দোকান পেতে বসেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। এই কমপ্লেক্সের চারটি মার্কেটে ২ হাজার ৯৬১টি দোকান ছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ অস্থায়ীভাবে দোকান নিয়ে বসেছেন।

গতকাল বঙ্গবাজারে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ জায়গায় এখনো দোকান শুরু করেননি ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া আবর্জনা অপসারণ ও ইট-বালি ফেলার কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় বড় একটা অংশ বসার উপযোগী হয়নি।

আদর্শ ইউনিটের রোকেয়া গার্মেন্টসের রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জায়গা পেয়েছি কিন্তু সংস্কারকাজ শেষ না হওয়ায় এখনো বসতে পারিনি। আজ (বৃহস্পতিবার) একুশ রোজা চলছে। এ সময় এমনেই ঈদের কেনাকাটা কমতে শুরু করে। আমাদের তো একটা বড় অংশ পাইকারি ক্রেতা। কুষ্টিয়া, রংপুর, বরিশাল আর দিনাজপুরের পাইকারি ক্রেতারা আমার কাছে থেকে মাল নিতেন। তারা তো অন্য জায়গা থেকে মাল নিয়ে নিচ্ছেন। তারপর এত কিছু করে যদি কাল-পরশু আমরা চৌকি নিয়ে বসতেও পারি। ঈদের দিন পর্যন্ত চলবে এই মার্কেট। ঈদের পরে আবার বসতে পারব কি না জানি না! সবকিছুই অনিশ্চিত। কীভাবে কী হবে বুঝতে পারছি না।’

গত ৪ এপ্রিল বঙ্গবাজারে আগুন লাগে। প্রায় সাড়ে ৬ ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসের ৫০টি ইউনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে তার আগেই আগুন কেড়ে নেয় ব্যবসায়ীদের সব। আশপাশের আরও তিনটি মার্কেটেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে।

ডিএসসিসির তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীর সংখ্যা ৩ হাজার ৮৪৫ জন। তবে গতকাল পর্যন্ত অন্তত এক হাজার ব্যবসায়ী চৌকি বসিয়ে বঙ্গবাজারে বসেছেন। যদিও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা অনুযায়ী সবাই অস্থায়ীভাবে চৌকি বসিয়ে এখানে ব্যবসা করতে পারবেন।

২৫ লাখ টাকা সহায়তা ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের : আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য ২৫ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড। গতকাল বঙ্গবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অনুদান কেন্দ্রে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিনের কাছে অনুদানের চেক হস্তান্তর করেন প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজিং ডিরেক্টর দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।

এ সময় দিলীপ কুমার আগরওয়ালা বলেন, ‘বঙ্গবাজারের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সবার মতো আমি মর্মাহত। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ভাই হিসেবে আমি পাশে দাঁড়িয়েছি। আমি সব ব্যবসায়ী ভাইকে অনুরোধ করছি, আপনারাও বঙ্গবাজারের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ভাইদের পাশে দাঁড়ান।

গুলিস্তান পাতাল মার্কেট অতি অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ : বঙ্গবাজারে অগ্নিকাণ্ডের পর নড়েচড়ে বসেছে ফায়ার সার্ভিস। তারা ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বিপণিবিতানগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যাপকভাবে যাচাই করছেন। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল ফায়ার সার্ভিসের একটি টিম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে অগ্নিঝুঁকি অ্যাসেসমেন্টের উদ্দেশ্যে গুলিস্তানের পাতাল মার্কেট পরিদর্শন করে।

পরে ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা জোন-১-এর প্রধান মো. বজলুর রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, এখানে পানির কোনো উৎস নেই। আগুন লাগলে মার্কেটটিতে পানি পৌঁছানোর মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। সেখানে ধোঁয়া বা আগুন শনাক্তের যন্ত্র নেই। এ ছাড়া ফায়ার এক্সটিংগুইশার (অগ্নিনির্বাপক) পাওয়া গেলেও কোনোটি মেয়াদোত্তীর্ণ, কোনোটি অকার্যকর। সেখানে ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা একেবারে অকার্যকর, সিঁড়ি ছোট ও সরু।

ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘দুই বছর আগে একই মার্কেট পরিদর্শন শেষে একই ধরনের প্রতিবেদন দাখিল করেছিল ফায়ার সার্ভিস। কিন্তু সেই প্রতিবেদন দাখিল করলেও এখানে কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি। আমরা প্রতিবেদনের কপি দিয়ে আসছি। আজকের পরিদর্শনের প্রতিবেদন সদর দপ্তরে দাখিল করা হবে।’