ইন্টার্নশিপ হলো একজন দক্ষ মেন্টরের অধীনে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানি/সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন কাজ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার মাধ্যমে নিজের দক্ষতা বৃদ্ধি করা। ইংরেজিতে একটি উক্তি রয়েছে, Experience is the Teacher of all Thing. আর সদ্য পাস করা গ্রাজুয়েটদের জন্য চাকরি পাওয়ার জন্য প্রথম বাধা হিসেবে সামনে আসে এই অভিজ্ঞতা। ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে কাজের অভিজ্ঞতা ক্যারিয়ার নির্মাণের পথ সহজ করে দেয়। পাশাপাশি ক্যারিয়ার সম্পর্কে সুস্পষ্ট পরিকল্পনার অভাবে অনেক মেধাবী তরুণের মেধা নষ্ট হচ্ছে যার ফলশ্রুতিতে হতাশার সৃষ্টি হচ্ছে। ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে নিজের ক্যারিয়ার প্ল্যান নিয়ে আরেকবার ভাবার সুযোগ থাকে।
বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আন্ডারগ্র্যাজুয়েট লেভেলে খুবই অল্পসময়ের ইন্টার্নশিপের বাধ্যবাধকতা থাকলেও, অনেকাংশেই সেটা অভিজ্ঞতা অর্জনের চেয়েও অতিদ্রুত সময়ে শেষ করার দিকে গুরুত্ব বেশি থাকে। পাশাপাশি অধিকক্ষেত্রেই প্রাইভেট সংস্থা কিংবা দপ্তরগুলোতে বেশ অল্প সময়ের জন্য শিক্ষার্থীরা এই ইন্টার্নশিপের সুযোগ পেয়ে থাকে। অন্যদিকে গ্র্যাজুয়েশন সমাপ্তির পরে বাংলাদেশে একজন তরুণ গ্র্যাজুয়েটের সরকারি চাকরির প্রতি যে ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা কিংবা পরিবার-সমাজ থেকে চাপ থাকে সেটা অবিশ্বাস্য। তাই একবার ভাবুন তো, যদি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাসের পর পরই একজন তরুণ ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটকে একটি নির্দিষ্ট ভাতা প্রদানের মাধ্যমে ৬ মাস অথবা তার চেয়ে বেশি সময় ধরে ইন্টার্নশিপের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে তার একটি সরকারি চাকরির প্রতি অভিজ্ঞতা, জ্ঞান অর্জন ও নিজের দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সেই প্রতিষ্ঠানের সকল লেভেলের কর্মকতাদের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ থাকবে। পাশাপাশি পাশের পরপরই চাকরি না পেয়ে বেকারত্ব কিংবা ডিপ্রেশনের মতো অবস্থা থেকে একজন তরুণ ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েট মুক্তি পাবে।
উপরি-উক্ত সমস্যা সমাধানে তরুণ ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েট ও চাকরিপ্রার্থীদের জন্য এক বিশেষ ধরনের শুভবার্তা নিয়ে আসছে সরকার। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এরই মধ্যে এ বিষয়ক নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এটির নাম দেওয়া হয়েছে 'সরকারি প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ (ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ) নীতিমালা ২০২৩'।
দেশের সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং রাষ্ট্রায়ত্ত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ নীতিমালা প্রযোজ্য হবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে চালু থাকা ইন্টার্নশিপ কার্যক্রম এ নীতিমালার বাইরে থাকবে। একই সঙ্গে সামরিক, আধাসামরিকসহ রাষ্ট্রের নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে ইন্টার্নশিপের এ সুযোগ থাকবে না। পাশাপাশি উক্ত নীতিমালা অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট সময়কালের জন্য ভাতা থাকবে ইন্টার্নদের জন্য।
এমন উদ্যোগ বেশ প্রশংসনীয় হলেও, আমাদের বেশ দেরি হয়ে গেছে। কারণ বেকারত্ব আর ডিপ্রেশন আমাদের ফ্রেশ ও তরুণ গ্র্যাজুয়েটদের এমনভাবে পেয়ে বসেছে যেন সেখান থেকে নানাভাবে নৈতিক অবক্ষয় রূপ ধারণ করেছে। অন্যদিকে উক্ত নীতিমালায় ইন্টার্নশিপের ভাতা সম্পর্কে এখনও পরিষ্কার কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। কিন্তু এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একজন ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটকে অবশ্যই এমন ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামে আগ্রহী করতে হবে।
সরকারি কাজ সম্পর্কে তরুণ গ্র্যাজুয়েটদের প্রাথমিক ধারণা দিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ পেয়ে চাকরিপ্রার্থীরা সেই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানতে পারবেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন সুযোগ পশ্চিমা দেশগুলোতেও আছে। বাংলাদেশ সরকারও এখন তরুণদের এ সুযোগ দিতে বেশ আগ্রহী। প্রথমদিকে হয়তো বড় আকারে কোনো উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব না হলেও যেন কাজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে এর পরিধি অবশ্যই বাড়াতে হবে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মাধ্যমে এ নীতিমালা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করার বেশ গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী সুযোগ রয়েছে। কারণ, বিভিন্ন নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক জনবল অন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ইসিকে নিতে হয়। তাই একটি নির্দিষ্ট অংশ ফ্রেশ ও তরুণ গ্র্যাজুয়েটরা এ ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে এবং পাশাপাশি তাদের ক্যারিয়ারের একটি সুন্দর সূচনা হতে পারে।
পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট যে সরকারি প্রতিষ্ঠানে একজন ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েট ইন্টার্নশিপ করবেন, সেখান থেকে তাকে প্রত্যয়নের পাশাপাশি পরবর্তীতে আসন ফাঁকা হলে তাকে চাকরিতে অন্তর্ভুক্ত এর ব্যাপারে কিছুটা প্রায়োরিটি দেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে সরকারি কাজ সম্পর্কে তরুণ গ্র্যাজুয়েটদের প্রাথমিক ধারণা দিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তাই অতিদ্রুত উক্ত নীতিমালা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। যেন তরুণ শিক্ষার্থীদের কর্ম-উপযোগী প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে এর ব্যবহার সীমাবদ্ধ থাকে। অর্থাৎ, চাকরির প্রার্থীদের জন্য এমন শুভবার্তা যেন, তাদের ভবিষ্যতের জন্য পথের কাঁটায় পরিণত না হয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এমন একটি নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কাছে প্রথমে ধারণাপত্র পেশ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)। বাংলাদেশের তরুণদের বেকারত্ব ঘোচাতে ও ক্যারিয়ারের একটি সুন্দর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সূচনা সরকারি প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট ভাতার বিনিময়ে ব্যবস্থা করার মতো এতো চমৎকার পরামর্শ প্রদান করায় সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই) কে জানাই অভিনন্দন। কারণ এই পদ্ধতিতে উন্নত বিশ্বের দেশ গুলো তাদের গ্র্যাজুয়েটদের অভিজ্ঞ চাকরিজীবিতে অনেক আগ থেকেই তৈরি করছে। সেখান থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে গেছি। আশা করি, উক্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ আইন হবে শিক্ষার্থী ও তরুণ ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েট-বান্ধব। যাতে তারা গ্র্যাজুয়েশন শেষে হতাশা কিংবা বেকারত্বের অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে নিজেদের বিপদে নিয়ে না যায়। তাই সরকারি প্রতিষ্ঠানে তরুণ গ্র্যাজুয়েটদের ইন্টারশিপ আইন প্রণয়নের পূর্বে গ্র্যাজুয়েটবৃন্দদের সাথে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সম্মানিত শিক্ষকদের মতামত নিয়ে প্রনয়ণ করলে অনেকাংশেই সফলভাবে প্রনয়ণ ও বাস্তবায়ন হবে বলে আমার মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
(প্রকাশিত লেখার আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায় সম্পূর্ণরূপে লেখকের, এর কোনো প্রকার দায়ভার দেশ রূপান্তর নেবে না)