সবকিছুকে অ্যান্টি ক্লাইমেট করে ফেলছি

অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলাম। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের চেয়ারম্যান এবং ঢাবির ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট রিসার্চ সেলের প্রধান। দেশে সম্প্রতি বয়ে যাওয়া তাপপ্রবাহসহ আবহাওয়ার চরম ভাবাপন্নতা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি দেশে বয়ে যাচ্ছে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ। বলা হচ্ছে, ৫১ বছরের রেকর্ড ভেঙে দেবে তীব্র তাপপ্রবাহ। এর কারণ কী?

ড. মো. শহীদুল ইসলাম : এমনিতেই মার্চ-এপ্রিলে বাই নেচার আমাদের এখানে গরম পড়ে। এ সময়টা ড্রাই সিজন থাকে আমাদের। এটা আমাদের এখানকার সব থেকে শুষ্কতম কাল, তাপপ্রবাহের সময় বাই ডেফিনেশন। কিন্তু এই বছর কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে এটা খুব এক্সট্রিম দেখা যাচ্ছে। গত ৫১ বছরের কথা যেটা বলা হচ্ছে। কখনো কখনো গরম খুব বেশি হচ্ছে, ফ্লাড হচ্ছে। সবগুলোই মাঝেমধ্যে রেকর্ড ভঙ্গ করছে। কিছুদিন আগেই সুনামগঞ্জ বা সিলেটের বন্যা এগুলো রেকর্ড ভেঙেছে।

তো এসব ক্ষেত্রে আমরা প্রথমেই চিহ্নিত করি ক্লাইমেট চেঞ্জ বা জলবায়ু পরিবর্তনকে। এটা কমন ব্লেইমিং। বিশ^ব্যাপী জলবায়ুর যে পরিবর্তনগুলো হচ্ছে, আবহাওয়ার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জলবায়ুকেই মূল দায়ীটা আমরা করি। পৃথিবীর ইতিহাসে লাখ লাখ বছর ধরে বহুবার জলবায়ু পরিবর্তন হয়েছে, এটা একটা ন্যাচারাল প্রসেস। কোল্ড ফেইজ, ওয়ার্ম ফেইজ এসেছে। নাথিং আনইউজাল। তো এখন একটা বৈশি^ক উষ্ণায়নের মধ্যে আমরা আছি। যেটাকে উষ্ণায়ন বলব না, বৈশি^ক পরিবর্তনের মধ্যে আছি আর কি। এবং এর ফলে শীতকালটা খুব প্রকট হচ্ছে, আবার গ্রীষ্মকালটাও প্রকট হচ্ছে। দুটোই এক্সট্রিম হচ্ছে। এটাকে শুধু গ্লোবাল পোলিং বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং বলাটা একটু কঠিন। পরিবর্তনটা খুব লক্ষণীয়।

ক্লাইমেট চেঞ্জের পাশাপাশি ব্যক্তিক, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় জীবনযাত্রার যে কালচারে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, এতে যে যে পরিবর্তন, মানে ম্যান মেইড ক্লাইমেট যেটা অনেকাংশে দায়ী। আমরা মানুষরাই বেশ কিছু ইনগ্রেডিয়েন্ট পরিবেশের মধ্যে দিচ্ছি, যা দিয়ে আমরাই এনভায়রনমেন্টকে ডমিনেন্ট করছি। আস্তে আস্তে আমরা নিজেরাই গ্রিন কালচার থেকে ইনভাইট করছি রেড অ্যান্ড ব্রাউন কালচারকে। এখন দেশে যে পরিমাণ বন থাকার কথা, তা নেই। যতখানি ওপেন স্পেস থাকার কথা, তা আমরা রাখিনি। হিট যে এবজর্ব করবে সেই গ্রিন আইল্যান্ডগুলো নেই। শহরগুলো তামাটে হয়ে গেছে। ফলে আর্টিফিশিয়ালি আমরা হিটটা বাড়িয়ে দিচ্ছি। আমরা আমাদের কালচারটাকে নগরায়ণের কালচার বলেন আর লাইফস্টাইল বা ভূমির ব্যবহার বলেন, ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন বলেন সবকিছুকে আমরা অ্যান্টি ক্লাইমেট, অ্যান্টি হিউম্যান করে ফেলছি। ফলে শীতকালে খুব বেশি ঠান্ডা এবং গ্রীষ্মে খুব বেশি গরম পড়ছে।

দেশ রূপান্তর : তাপমাত্রার চেয়ে গরম বেশি অনুভূত হওয়ার কারণ?

ড. মো. শহীদুল ইসলাম : ধরেন আজকে আমি নিউ মার্কেট এলাকার আশপাশে ছিলাম। আপনি জানেন নিশ্চয়ই যে, সেখানে আজ আগুন লেগেছে। তো আমি যদি নীলক্ষেত বা পাশের যে এলাকায় ছিলাম, পুরো এলাকাটিতেই গরম অনুভূত হয়েছে। তো আপনি একটা চুলার পাশে থাকলে তো গরমবোধ করবেনই। শহরটা তো একটা চুলা হয়ে গেছে। এই যে ঢাকার বিল্ডিংগুলো তো সব ব্রাউন বিল্ডিং, সবুজ নেই। আবার এই ঢাকা শহরেই আপনি কোনো পার্কে যান, অপেক্ষাকৃত কম গরম লাগবে। এই গরমের মধ্যেই আপনি একটু রমনা পার্কে যান, গরম কম অনুভূত হবে। ক্লাইমেট চেঞ্জ তো আছেই, তবে আমি ব্লেইম করব আমাদের অপরিকল্পিত যে জীবনযাপন, ভূমি ব্যবহার, নগরায়ণ, অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট, ব্যবস্থাপনা এগুলোকে। যে ঘরটা স্বাভাবিক থাকার কথা, সেখানে সৌন্দর্যের নামে আমরা গ্লাস লাগিয়েছি। গ্লাস লাগিয়ে ভেতরটা গরম করে ফেলছি। আবার এসি লাগিয়ে সেটাকে ঠান্ডা করছি। এসির গরমটাকে আবার আমরা বাইরে দিচ্ছি। কাচ দিয়ে এত বিশাল মার্কেট করছি, সেটাকে ঠান্ডা করছি এসি দিয়ে। এখন এসির গরমটাকে আপনি কী করছেন? এসির এই গরমটা কোথায় যাচ্ছে? আপনার-আমার গায়েই তো লাগছে।

দেশ রূপান্তর : এবার দীর্ঘদিন ধরে তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকার কারণ কী?

ড. মো. শহীদুল ইসলাম : এর কারণটা হচ্ছে রেইনফল হচ্ছে না। এ সময়টায় কিন্তু একটা বৃষ্টি হওয়ার কথা। নরমালি হওয়ার কথা। কালবৈশাখী হওয়ার কথা, তো বৃষ্টিটা না হওয়া পর্যন্ত এই তাপপ্রবাহটা থাকবে। যদিও প্রেডিক্ট করা যায় যে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বৃষ্টি হবে। এটা আশা করছি। তবে, বৃষ্টিটা না আসা পর্যন্ত তাপপ্রবাহ থাকবে।

দেশ রূপান্তর : আপনি কি বলতে চাইছেন এ অবস্থার জন্য ন্যাচারাল ক্লাইমেট চেঞ্জের চেয়ে ম্যান মেইড সিচুয়েশন বেশি দায়ী?

ড. মো. শহীদুল ইসলাম : জলবায়ু পরিবর্তনের কথাটা সবাই ধরাবাঁধা একটা ধারণা থেকে বলেন। আমি বলব যে, অপরিকল্পিত সিচুয়েশন যেটা আমরা তৈরি করে ফেলেছি অলরেডি..., এই যে রাস্তা-ঘাট তৈরি বলেন, বিল্ডিং তৈরি বলেন আর গাছপালা কর্তনই বলেন এগুলোই দায়ী। আজকে দেশে বন নেই, ঢাকা শহরে সবুজ নেই, জলাশয় নেই। আমরা যারা পরিবেশ আন্দোলন করি, আমি ব্যক্তিগতভাবে বাপার সঙ্গে জড়িত। আমরা পুকুরগুলোকে সংরক্ষণের কথা বলি। ঢাবির শহীদুল্লাহ হলের পুকুরটার কথা ধরেন। এর পরও কি চোখে আঙুল দিয়ে বোঝাতে হবে যে পুকুর কতটা জরুরি!

দেশ রূপান্তর : আবহাওয়ার এই চরম ভাবাপন্নতা বৈশি^ক। এ ক্ষেত্রে সরকারের নীতিনির্ধারকদের করণীয় কতটুকু আর তারা করছেন কতটুকু?

ড. মো. শহীদুল ইসলাম : সরকার এক রকম চেষ্টা করে যাচ্ছে। একটা কাঠামোর মধ্যে সরকার কিন্তু একা সরকার নয়। এর মধ্যে আমি এবং আপনিও আছেন। এখন আমি আমার বাড়ির মধ্যে পাঁচটি এসি চালাচ্ছি নিজের ঘরটা ঠা-া রাখতে। কিন্তু বাইরের পরিবেশটা তো গরম করে দিচ্ছি। এখন এখানে তো কোনো কন্ট্রোল নেই। সার্বিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে রাতারাতি তো সরকার কিছু করছে না বা করতে পারছে না। কারণ আমাদেরও তো সাড়া দিতে হবে, তাই না? সরকারেরও কিছু দায় তো আছেই।

ইতিমধ্যেই একটা আর্টিফিশিয়াল টেম্পারেচার আমরা বাড়িয়ে ফেলেছি। তার মধ্যে আছে ডাস্ট বা ধুলা। এটা একটা পল্যুশন, রয়েছে এয়ার পল্যুশন। এর সবকিছুই একটার সঙ্গে আরেকটা কানেক্টেড। বাতাসের মধ্যে যে জলীয় বাষ্প আছে, যে ধূলিকণা আছে, আরও যেসব উপাদান আছে, সেগুলোও তো টেম্পারেচারের সঙ্গে রিয়্যাক্ট করে। আর যে বাতাস আপনার শরীরে লাগছে সেটা আপনার গায়ের সঙ্গে রিয়্যাক্ট করে। পুরো পরিস্থিতিটা এখন আনকমফোর্টেবল হয়ে গেছে। আর এই যখন অবস্থা তখন সরকার সবাইকে সতর্ক করছে যে বাইরে কম যান। বাচ্চাদের বাইরে কম নেন। যেন সরাসরি আপনার গায়ে হিটটা না লাগে। কিন্তু সরকারের সার্বিক পরিকল্পনা, সার্বিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি জনগণেরও একটা প্রচেষ্টার অবকাশ রয়েছে। তুলনামূলকভাবে গ্রামগুলো এখনো ভালো আছে।

দেশ রূপান্তর : বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার গতি-প্রকৃতি বুঝতে আমাদের আবহাওয়া অধিদপ্তরের কার্যক্রম কতটা যুগোপযোগী?

ড. মো. শহীদুল ইসলাম : শুধু আবহাওয়া অধিদপ্তর বা সরকারের কার্যক্রম কেন সার্বিকভাবে আমাদের সিস্টেমটাই তো গবেষণার অনুকূলে না। আমাদের পর্যাপ্ত তথ্যভা-ার নেই। ধরেন আজকের আগুন লাগার ঘটনাটা। এটা কতটা ক্লাইমেট চেঞ্জের কারণে আর কতটা মানবীয় কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভরশীল, আমাদের ভূমির ব্যবহার ইত্যাদিই বা কতটা দায়ী। আমাদের খুব শক্ত গবেষণা নেই। যতটুকু আছে, ততটুকুকেই আমরা অবলম্বন করে বলছি যে দুই দিক থেকেই আমরা একটা বিপর্যয়ের মধ্যে আছি। ক্লাইমেট চেঞ্জ যেমন দায়ী, তেমনি আমাদের নিজস্ব কর্মকাণ্ডও দায়ী।

দেশ রূপান্তর : না, ধরেন আমি বলতে চাচ্ছিলাম যে তাপপ্রবাহ বলেন বা অতিবৃষ্টি বলেন বা শৈত্যপ্রবাহ এর সঙ্গে তো আমাদের কৃষি জড়িত। সে ক্ষেত্রে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ব্যাপারটা...?

ড. মো. শহীদুল ইসলাম : আমাদের আবহাওয়ার পূর্বাভাসটা, তা ফ্লাড বলেন বা তাপপ্রবাহ বলেন, সেটা খুব জেনারেল। মানে এটা কান্ট্রি ওয়াইড মানে সারা দেশ কভার করে ইনজেনারেল। কিন্তু এটা খুব সাইট স্পেসিফিক না। যেমন : বন্যা যখন হয় সারা দেশে তো আর বন্যা হয় না। সার্টেইন একটা এরিয়াতে হয়। আবার একটা এলাকার সব জায়গাতেও হয় না। আমাদের মাইক্রো লেভেলের ফোরকাস্টিংটা এখনো ডেভেলপ করেনি। এটা এনজিওদের মাধ্যমে হতে পারে, কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমে হতে পারে, মোবাইলে মেসেজ দিয়েও হতে পারে। আমাদের এখানে ম্যাক্রো লেভেলে বলা হচ্ছে যে, আরও তিন/চার দিন গরম থাকবে। কিন্তু কোন এলাকায় কী রকম গরম থাকবে তা বলা হয় না। ধরেন বৈশাখ মাস কিন্তু রবিশস্যের সময়, তো এখন বৃষ্টি যদি না আসে সেটা শস্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। বোরো ধান তো আর সব জায়গায় হচ্ছে না। এটা হচ্ছে বিল ও হাওর এলাকায়। এর মধ্যে ভয়াবহ একটা ঝুঁকি আছে। এ সময় যে বৃষ্টিটা হয় এর সঙ্গে কিন্তু শীলাবৃষ্টিও হয়। এখন দুদিন পর একটা বৃষ্টি এলো, এটা যদি স্বাভাবিক বৃষ্টি হয়, সেটা আমাদের জন্য ভালো। আবার যদি এটা শীলাবৃষ্টি হয়, তাহলে কিন্তু খুবই খারাপ হবে। এটা আমাদের স্পেসিফিক জানতে হবে এবং কৃষককে জানাতে হবে।

দেশ রূপান্তর : আমাদের কৃষি আবহাওয়া বলে একটা বিভাগ তো রয়েছে। তাদের কাজ কী তাহলে?

ড. মো. শহীদুল ইসলাম : সিস্টেমটা আছে, কিন্তু একেবারে কার্যকরী লেভেলে কৃষকবান্ধব হয়ে ওঠেনি। এখন কতগুলো এনজিও কাজ করছে অবশ্য। এটাকে ইফেক্টিভ করতে চাইলে একদম মাইক্রো লেভেলে আনতে হবে। আবহাওয়ার তথ্য দিয়ে কৃষককে প্রস্তুত রাখতে হবে, পরামর্শ দিতে হবে। ইরিগেশন একটা ফ্যাক্টর। এখন গ্রামে গিয়ে দেখবেন যে প্রায় সব ভূগর্ভস্থ পানি তুলে সেচ দিচ্ছে। ইলেকট্রিসিটির সাপ্লাই থাকায় সেটা চলছে, তবে মনে রাখতে হবে যে ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে আর কত সেচ চলবে, তারও তো লিমিট আছে। আর কোনো কারণে মাঠপর্যায়ে বিদ্যুৎ বিপর্যয় হলে কিন্তু সেচ থেমে যাবে। এখন দু-এক দিনের মধ্যে বৃষ্টি হলে সে সমস্যার সমাধান হবে আশা করি। কৃষকদের সেটা জানতে হবে যে কবে নাগাদ বৃষ্টি হতে পারে। সে তার ভিত্তিতে সেচের ব্যবস্থা নেবে।

দেশ রূপান্তর : জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়েই আবহাওয়া বিজ্ঞান এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা কী?

ড. মো. শহীদুল ইসলাম : আমাদের গবেষণা যে একেবারে থেমে আছে তা না। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়সহ দেশের সাত/আটটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডিপার্টমেন্ট ওয়াইজ গবেষণা হচ্ছে। ভূগোল বিভাগ আছে, পরিবেশ বিভাগ আছে তারা কাজ করে যাচ্ছে। তবে অবশ্যই আমরা উন্নত দেশ থেকে প্রযুক্তি ও সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে পিছিয়ে আছি। এ দেশের বিজ্ঞানীরা যতটুকু লিমিটেশন আছে সেটা নিয়েই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা বসে আছেন তা নয়। তবে আমাদের আরও বেশি প্রত্যাশা রয়েছে। রিসেন্টলি ঢাবিতে মেট্রোলজি ডিপার্টমেন্ট খোলা হয়েছে। এর ফলে একটা নতুন মাত্রা সংযুক্ত হয়েছে। মেট্রোলজির মডেল বেজড রিসার্চ স্টাডি এখন অনেক হচ্ছে। আমরা এখন ক্লাইমেট মডেল করছি। আমরা এগোচ্ছি, পেছাচ্ছি না।