রাজধানীর বঙ্গবাজার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। গতকাল দিনের শুরুতে আগুনে পুড়েছে রাজধানীর নিউমার্কেটের পাশে নিউ সুপারমার্কেট। ১১ দিনের ব্যবধানে দুই স্থানের আগুনে নিঃস্ব হয়েছেন অনেক ব্যবসায়ী। ঈদুল ফিতরের আগে ব্যবসায়ীরা নতুন পণ্যে দোকান সাজিয়েছিলেন। কিন্তু আগুনের করালগ্রাসে তাদের সাজানো স্বপ্ন পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেল।
আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় এই নাগরিকদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আন্তরিকতার সঙ্গে তাদের পাশে দাঁড়ানো দরকার। এ জন্য সবার আগে প্রয়োজন মানবিকবোধ জাগ্রত করা। ভ্রাতৃত্বের মমতা নিয়ে সবাই এগিয়ে এলে আল্লাহর রহমতে বঙ্গবাজার ও নিউ সুপারমার্কেটের ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণে খুব একটা সময় লাগবে না।
রমজান হলো সহমর্মিতার মাস। এ ছাড়া রোজার একটি বড় উদ্দেশ্য আছে তা হলো, মানবজাতিকে সহানুভূতি-সহমর্মিতার অনুপম শিক্ষা প্রদান করা। রমজান মাসে মুসলমানদের ভ্রাতৃত্ব আর মমতা নিয়ে এগিয়ে আসার এখনই সময়। মুমিনের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সূত্রে সৃষ্টিকর্তা দয়াময় আল্লাহর ভালোবাসার বন্ধনে যুক্ত হওয়া যায়। ভ্রাতৃত্ববোধ মুসলমানদের প্রতি সৃষ্টিকর্তার একান্ত অনুগ্রহ ও আশীর্বাদ।
ইসলামের দাবি, সমাজে বসবাসরত সবাই ঐক্য, সংহত ও সৌহার্দ্যপূর্ণ জীবনযাপনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। বিপদ-আপদে একে অপরের পাশে দাঁড়াবে এবং সম্প্রীতিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করবে। এটা নবী করিম (সা.)-এর সাহাবিদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘তারা পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল।’ -সুরা ফাতাহ : ২৯
সুরা বালাদে সফলকাম দলের পথ বর্ণনায় ১৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যারা ইমান এনেছে এবং পরস্পরকে উপদেশ দিয়েছে ধৈর্য ধারণের, আর পরস্পরকে উপদেশ দিয়েছে দয়া-অনুগ্রহের।’ বর্ণিত আয়াতে ইমানের পর মুমিনের এই কর্তব্য ব্যক্ত করা হয়েছে, সে অপরাপর মুসলিম ভাইকে ধৈর্য ও অনুকম্পার উপদেশ দেবে। এখানে ধৈর্য বলতে বোঝানো হয়েছে, নিজেকে মন্দ কাজ থেকে বাঁচিয়ে রাখা ও সৎকর্ম করা। আয়াতে ‘মারহামাহ’ শব্দটি এসেছে, যার অর্থ অপরের প্রতি দয়ার্দ্র হওয়া। অপরের কষ্টকে নিজের কষ্ট মনে করে তাকে কষ্টদান ও জুলুম করা থেকে বিরত থাকা।
নবী করিম (সা.) উম্মতের মধ্যে সহানুভূতির মতো উন্নত নৈতিক বৃত্তিটিকেই সবচেয়ে বেশি প্রসারিত ও বিকশিত করতে চেয়েছেন। হাদিসে এসেছে, ‘যে মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন না।’ -সহিহ বোখারি : ৭৩৭৬
পার্থিব জীবনে সাম্য ও সম্প্রীতিময় জীবনাচার ইসলামের শিক্ষা। সেই সঙ্গে বিপদের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো অন্যতম ইবাদত। এই আলোকে সামর্থ্যবানদের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়াতে হবে। এটা একটা ইবাদতও বটে।
ইসলামের প্রতিটি বিধান নিয়ে চিন্তা করলে দেখা যায়, একদিকে আছে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ার তাগাদা। অন্যদিকে মানুষে মানুষে সম্পর্ক, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার অতুলনীয় ব্যবস্থা।
সমাজে সুসম্পর্ক, সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার গুরুত্ব ইসলামে এত বেশি যে কোরআন মজিদে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।’ হাদিস শরিফে এই ভ্রাতৃত্বের পরিচর্যার বিষয়টিকে নানা উপমার সাহায্যে আমাদের বোধের কাছে এনে দিয়েছেন নবী করিম (সা.)।
হজরত আবু মুসা আল আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হজরত রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘এক মুমিন অন্য মুমিনের জন্য প্রাচীরস্বরূপ। এর এক অংশ অন্য অংশকে শক্তিশালী করে। (এ কথা বলার সময়) তিনি তার এক হাতের আঙুল অন্য হাতের আঙুলের ফাঁকে ঢুকিয়ে দেখান।’ -সহিহ মুসলিম
ইসলামি বিশ্বভ্রাতৃত্বের প্রতিচ্ছবি আছে অপর হাদিসে। হজরত নোমান ইবনে বশীর (রা.) বর্ণিত হাদিসে হজরত রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া-অনুগ্রহ ও মায়া-মমতার দৃষ্টিকোণ থেকে মুমিনরা একটি দেহের তুল্য। যদি দেহের কোনো অংশ অসুস্থ হয়ে পড়ে, তবে অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও তা অনুভব করে। রাত জেগে বা জ¦রে আক্রান্ত হয়ে এই সহমর্মিতা প্রকাশ করে। (অন্য মুমিনের দুঃখ-বেদনার সময় মুমিনের মনের অবস্থাও এ রকমই হওয়া চাই)।’ -সহিহ মুসলিম
লেখক : দেশ রূপান্তরের সহসম্পাদক