বেসরকারিতে ব্যয় ৪৪ গুণ

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচ বেসরকারির তুলনায় খুবই কম। মাসিক বা সেমিস্টার ফি এতই কম যে তা মনেও রাখেন না শিক্ষার্থীরা। তারা বছর শেষে একবারই বেতনসহ নানা ফি দেন। অথচ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পেছনে ঠিকই বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় হয়, যা খরচ করে রাষ্ট্র। অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রের কোনো ব্যয় নেই। যা খরচ তার পুরোটাই বহন করতে হয় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। দেশ রূপান্তর হিসাব করে দেখেছে, সরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের তুলনায় বেসরকারিতে শিক্ষার্থীদের খরচ ৪৪ গুণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভাগ ভেদে সেমিস্টার ফি’র ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য আছে। তবে বেশিরভাগ বিভাগেই ছয় মাসের সেমিস্টারে আবাসিক হলের সিট ভাড়াসহ বিভিন্ন প্রকার ফি মিলিয়ে দিতে হয় ৩ হাজার ৮২৫ টাকা। সেই হিসাবে একজন শিক্ষার্থীর মাসিক ব্যয় ৬৩৭ টাকা। অবশ্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীকে মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি, পরীক্ষার ফি ও হলের সিট ভাড়া মিলিয়ে ২৫০-৩০০ টাকার বেশি ব্যয় করতে হয় না। গড়পড়তা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করতে একজন শিক্ষার্থীর মাসিক খরচ ৫০০ টাকার মতো।

অন্যদিকে স্নাতক পর্যায়ে বেসরকারি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি সর্বোচ্চ ফি নিচ্ছে ব্যাচেলর অব ফার্মেসি (বি ফার্ম) প্রোগ্রামে ১৩ লাখ ১৮ হাজার ৫০০ টাকা। আর সর্বনিম্ন ফি নিচ্ছে অর্থনীতিতে প্রায় ৮ লাখ ৫ হাজার টাকা। চার বছরের এই টিউশন ফি গড় করলে একজন শিক্ষার্থীকে মাসে ব্যয় করতে হয় ২২ হাজার টাকার বেশি। যদিও নানা খাত ও ব্যয় দেখিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আরও বেশি টাকা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তুলনা করলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কমপক্ষে ৪৪ গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়।

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনেক বেশি ফি নেয়। আমরা একটা সিলিং নির্ধারণ করে দেওয়ারও চিন্তাভাবনা করছি। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ অনুযায়ী টিউশন ফি নির্ধারণের আগে ইউজিসির অনুমোদন নেওয়ার কথা বলা আছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেটা মানছে না। তবে সরকার আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। সেটা হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো টিউশন ফি নির্ধারণে ইউজিসির অনুমোদন নিতে বাধ্য হবে। তখন টিউশন বা সেমিস্টার ফি একটা সহনীয় মাত্রায় আসবে।’

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরই থাকার জন্য হল সুবিধা রয়েছে। এর বাইরে তাদের কম খরচে খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য অন্য কোনো সুবিধা নেই বললেই চলে। তাদের নিজেদেরই থাকার ও খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়। যার পেছনেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে কয়েকগুণ বেশি টাকা খরচ করতে হয়।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যয় করতে না হলেও রাষ্ট্রকে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়। ইউজিসির ২০২১ সালের তথ্যানুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ১২৪ টাকা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দেড় লাখ টাকা, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ লাখ ৩ হাজার টাকা, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৬৬০ টাকা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ লাখ ১৯ হাজার ৯২৪ টাকা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ লাখ ১০ হাজার ৮৪ টাকা, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়েছে সরকারকে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইউজিসিতে পাঠানো তথ্যানুযায়ী, স্নাতক পর্যায়ে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সর্বোচ্চ ফি বি ফার্ম প্রোগ্রামে ১৩ লাখ ১৮ হাজার ৫০০ টাকা। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বনিম্ন ফি অর্থনীতিতে ৮ লাখ ৫ হাজার টাকা। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্কিটেকচার প্রোগ্রামে নেওয়া হয় সর্বোচ্চ ফি ১৬ লাখ ৬৩ হাজার ৩৫০ টাকা। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বনিম্ন ফি ইংরেজিতে ২ লাখ ৬৯ হাজার ৫০০ টাকা। আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (এআইইউবি) বেশি নেয় ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে (ট্রিপল ই) ৮ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। কম নেয় সাংবাদিকতা পড়তে ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা। স্নাতকে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে সবচেয়ে বেশি ফি নেয় ব্যাচেলর অব ফার্মাসিতে (বি ফার্ম) ৯ লাখ ৮১ হাজার ১২০ টাকা। আর সবচেয়ে কম ব্যয় ব্যাচেলর অব পিপিএইচএস-এ ৪ লাখ ৩০ হাজার ৬২০ টাকা। ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক সর্বোচ্চ ফি নেয় আর্কিটেকচারে ৮ লাখ ৭৭ হাজার ৫০০ টাকা। আর সবচেয়ে কম ইংরেজিতে অনার্স পড়তে লাগে ৩ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।

আর স্নাতকোত্তর পর্যায়ে সর্বোচ্চ ফি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। তারা মাস্টার্স অব পাবলিক হেলথ (এমপিএইচ) প্রোগ্রামে নেয় ১৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি ফি মাস্টার্স অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এমবিএ) প্রোগ্রামে নেয় ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ এমবিএ প্রোগ্রামে নেয় ৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি এমবিএ প্রোগ্রামে নিচ্ছে ৩ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এমবিএ প্রোগ্রামে নিচ্ছে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়গুলো ইউজিসিতে তাদের টিউশন বা সেমিস্টার ফি’র তথ্য পাঠালেও তাতে অনেক ফাঁক রয়েছে। কারণ অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সংশ্লিষ্ট প্রোগ্রাম ফি’র তথ্য দিয়েছে। তবে তারা আলাদাভাবে ভর্তি ফি, উন্নয়ন ফিসহ নানা ধরনের ফি নেয়। তবে বিশে^র অনেক নামি-দামি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ে সরকার অনুদান দেয়। আর সংশ্লিষ্ট দপ্তর টিউশন ফির একটা সিলিং নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারের কোনোই সহায়তা নেই। ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ফি বাড়াতে থাকলেও সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ নেই।

এছাড়া সরকারি-বেসরকারি কলেজ অধিভুক্তির মাধ্যমে প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষা দেয় জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়। তাদের অধিভুক্ত সরকারি ও এমপিওভুক্ত কলেজগুলোর শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন দেয় সরকার। তারা শুধুমাত্র সিলেবাস দেওয়া, পরীক্ষার ফি আদায় ও পরীক্ষা গ্রহণ, ফল প্রকাশের মতো কাজগুলো করে থাকে। তাই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটের ওপর তাদের সব শিক্ষার্থীর ব্যয় নির্ভর করে না। আর তাদের উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলছে ইউজিসি। ফলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীপ্রতি যথাযথ ব্যয় বের করা সম্ভব হয়নি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা ফি হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আয় করলেও ২০২১ সালে তাদের শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় দেখিয়েছে মাত্র ৭৪৩ টাকা।