দ্বীপ উপজেলা রাঙ্গাবালীর কষ্ট শুনবে কে

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৫৩ এএম

বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা দ্বীপ রাঙ্গাবালী। তিন দিকে নদী একদিকে বঙ্গোপসাগর হওয়ায় মূল ভূখ- থেকে একেবারে বিছিন্ন একটি উপজেলা। প্রায় দুই লাখ মানুষের এই ভূখ-ে যাতায়াতের মাধ্যম ট্রলার, স্পিডবোট এবং লঞ্চ। সন্ধ্যার পর মূল ভূখ-ের সঙ্গে নৌ-যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে বা মুমূর্ষু রোগী স্থানান্তরের ক্ষেত্রে স্থানীয় বাসিন্দারা ভোগান্তিতে পড়েন। এ অবস্থায় একটি ফেরি চালুর দাবি অনেক আগ থেকেই করছেন এ উপজেলার মানুষ।

রাঙ্গাবালী উপজেলা থেকে জেলা শহর কিংবা অন্য কোথাও যেতে আগুনমুখা নদীতে ৯ কিমি পাড়ি দিতে হয়। কোড়ালিয়া ঘাট থেকে স্পিডবোট চলাচল করে সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। দিনে দুইটি লঞ্চ ছেড়ে যায় গলাচিপা উপজেলার বোয়ালিয়া এবং পানপট্টির উদ্দেশে। এ ছাড়া দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর পর খেয়া চলাচল করে। ১৫ থেকে ৪৫ মিনিট সময় লাগে এই পথে। এ উপজেলায় অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাও খারাপ। ছয় ইউনিয়নের চারটিতে যেতে হয় নদীপথে। এর মধ্যে চরমোন্তাজ ও চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের নৌযান চলাচল সন্ধ্যার পর বন্ধ হয়ে যায়।

২০১২ সালে উপজেলা প্রশাসনের যাত্রা শুরু হলেও একযুগেও চালু হয়নি সরকারি হাসপাতাল। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দ এখানে শোনা যায় না। একজন সরকারি এমবিবিএস ডাক্তার পর্যন্ত নেই। ৩-৪টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থাকলেও চিকিৎসাসেবা সীমিত। জ্বর-সর্দির প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া জটিল কোনো রোগের চিকিৎসাব্যবস্থা নেই। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে মিলছে সীমিত প্রাথমিক চিকিৎসা। ২০২৩ সালে ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কাজ শুরু হলেও ৫৫ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর তা এখন বন্ধ। কেউ হঠাৎ অসুস্থ হলে যুদ্ধ করতে হয় সময়ের সঙ্গে। নদী পাড়ি দিয়ে ছুটতে হয় ৩০ কিলোমিটার দূরের গলাচিপা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা তারও দূরের পটুয়াখালী সদর বা বরিশালে। চিকিৎসা পেতে দেরি হওয়ায় প্রিয়জন হারানোর স্মৃতি তাড়া করে এখানকার অনেক বাসিন্দাকেই।

রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হাসান জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যপ্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে দুইটি কার্যাদেশ পেয়েছেন। আশা করা যায় যে খুব দ্রুতই হাসপাতালের কাজটি সম্পূর্ণ হবে।

পটুয়াখালী-৪ আসনের (কলাপড়া-রাঙ্গাবালী) সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন আরও বলেন, ‘হসপিটালের টেন্ডার হয়েছিল সেটি বাতিল করা হয়েছে। কারণ সরকার নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশের উপজেলা পর্যায়ের সব হাসপাতাল ১৫০ শয্যায় উন্নীত করা হবে। ওই তালিকার মধ্যে এটি দেওয়া হয়েছে। ইনশাআল্লাহ কাজ শুরু হলে আমাদেরটিও অগ্রাধিকার পাবে।

কোড়ালিয়া স্পিডবোট ঘাটের টিকিট কাউন্টারের সামনে কথা হয় রহমান হাওলাদারের সঙ্গে। ডাক্তার দেখানোর উদ্দেশ্যে যাবেন পটুয়াখালীতে। তিনি বলেন, ‘আমাদের উপজেলায় ভালো হাসপাতাল, চিকিৎসা কিছুই নেই। এ জন্য যেতে হয় জেলা শহরে। যেতে যেতেই দুপুর হয়ে যাবে। ডাক্তার দেখাতে হবে বিকেলে। তারপর আজকে আর ফেরার সুযোগ থাকবে না। কোথায় থাকব, কত টাকা লাগবেএ সব দেখার কেউ নেই। নদীতে পারাপারের জন্য একটা ফেরি থাকলে হয়তো এই কষ্টটা আর থাকত না।’

স্থানীয় বাসিন্দা রাসেল মাতুব্বর বলেন, ‘মানুষের তো সমস্যা হতে সময় লাগে না। যদি রাতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তখন এ উপজেলা থেকে অন্য কোথায় যাওয়ার কোনো উপায় নাই। অনেক সময় সিরিয়াস রোগী নিয়ে বেশি টাকায় ট্রলার ভাড়া করে যেতে হয়। তাও আবহাওয়া খারাপ থাকলে সেটিও সম্ভব না। আমাদের দাবি একটি ফেরি চাই।’

উপজেলার কোড়ালিয়া ও গলাচিপা উপজেলার বোয়ালিয়ার রুটে স্পিডবোটের ইজারাদার কামরুল মৃধা জানান, ‘সব সময় স্পিডবোট চলাচল করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু মানুষ বাধ্য হয়ে জীবন হাতে নিয়ে চলাচল করেন। সন্ধার পর কোনোভাবেই স্পিডবোট চলাচল সম্ভব হয় না। আবহাওয়া খারাপ থাকলে দিনেও স্পিডবোট বন্ধ থাকে।’

উপজেলার ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. কামাল পাশা বলেন, ‘আমারা সব জায়গা থেকে বঞ্চিত। হাসপাতাল নাই, যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ, রাস্তাঘাট নাই, সব মিলিয়ে এ উপজেলাবাসী অবহেলিত। সন্ধ্যার পর তো সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। আমরা উপজেলায় প্রত্যেক মিটিং আলোচনা করি আগুনমুখায় একটি ফেরি এবং উপজেলায় একটি সরকারি হাসপাতালটি চালুর জন্য। কিন্তু বাস্তবায়ন হচ্ছে না।’

সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আগুনমুখা নদীতে ফেরি চালুর জন্য আমরা চেষ্টা করছি। আমি একটা ডিও লেটার দিয়েছি। ওরা প্রসেস করছে। তবে একটা জিনিস চিন্তা করতে হবে এখানে তো সরকারের খরচ আছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গেও আমার এ বিষয়ে কথা হয়েছে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত