প্রাথমিকে নিয়োগে এখন বাধা ভেরিফিকেশন

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৫২ এএম

লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্তভাবে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন তারা। নিয়োগের সব ধাপ পেরিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন নিয়োগপত্রের। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পুলিশ ভেরিফিকেশন ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনের কারণে আটকে গেছে অনেকের নিয়োগ। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও নিয়োগপত্র না পেয়ে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেক প্রার্থী।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত ১৪ হাজার ৩৮৪ জনের নিয়োগপত্র বিতরণ ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়। তবে বিভিন্ন জেলার অনেক প্রার্থী অভিযোগ করছেন, ভেরিফিকেশনে ‘নেগেটিভ’ প্রতিবেদন আসার কথা জানিয়ে তাদের নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি। এখন পর্যন্ত দেশের ২৭ জেলার অন্তত ৭৭৮ জন নিয়োগপত্র পাননি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অথচ সংশ্লিষ্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় থেকে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীরা সরাসরি নিয়োগপত্র নেওয়ার কথা। নিয়োগপত্র পাওয়ার পর আগামী ১ অক্টোবর নিজ নিজ জেলা শিক্ষা কার্যালয়ে যোগদান করতে হবে প্রার্থীদের। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, ৪ অক্টোবর থেকে তাদের পদায়ন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

এদিকে নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের হতাশা ও ক্ষোভের কথা তুলে ধরছেন। কারও দাবি, নিজের বা পরিবারের কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা না থাকলেও তাদের ভেরিফিকেশনে বাদ দেওয়া হয়েছে। আবার কেউ কেউ দাবি করছেন, কোনো ফৌজদারি অপরাধ বা অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত না থেকেও তারা চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এসব পোস্ট ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন নেটিজেনরা।

ভেরিফিকেশনে বাদ পড়ে বন্যা মল্লিক নামে একজন সুপারিশপ্রাপ্ত সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, উপজেলাতে আমার মেধাক্রম দ্বিতীয়। আমি ফার্মেসি সাবজেক্টে অনার্স, মাস্টার্স কমপ্লিট করেছি। ১). উপজেলাতে মেধাক্রম-২য়। ২). আমার একাডেমিকের কাগজপত্রে কোনো সমস্যা নেই। ৩). আমার ১৪ গুষ্টিতে কেউ রাজনীতি করে না। ৪). আমার/আমার পরিবারের কারও নামে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই। ৫). স্থায়ী ঠিকানা (বসতবাড়ি)/জমিজমা নিয়েও কোনো সমস্যা নেই।’

তিনি পোস্টে হতাশা ব্যক্ত করে লেখেন, তবুও আমার নিয়োগপত্র আসেনি। রাষ্ট্রের সম্ভবত মনে হয়েছে আমি প্রাইমারিতে চাকরি করার জন্য যথেষ্ট যোগ্য নই, তাই বাদ দিয়েছে। মেনে নিলাম। কিন্তু চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও কোন অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে/কেন বাদ পড়লাম এটা জানার অধিকার তো আমার আছে। শুধু বাদ পড়ার একটা কারণ জানতে চাই।

এদিকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এক বিবৃতিতে বলেছেন, লিখিত ও অন্যান্য ধাপের পরীক্ষায় মেধার প্রমাণ দেওয়ার পরও এসব প্রার্থীর ক্ষেত্রে দীর্ঘ আট মাস ভেরিফিকেশনের নামে অনিশ্চয়তা ও হয়রানির প্রক্রিয়া চলেছে। শেষ পর্যন্ত তাদের নিয়োগপত্র না দিয়ে গভীর হতাশার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। বাদ পড়াদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে থানায় কোনো ফৌজদারি মামলা বা সাধারণ ডায়েরির (জিডি) তথ্য নেই। তাদের বিরুদ্ধে অতীতে কোনো অপরাধমূলক কর্মকা-ে কিংবা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া যায়নি। এরপরও কোনো স্বচ্ছ, সুস্পষ্ট ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তাদের নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, মেধা, যোগ্যতা ও পরীক্ষার সব ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করার পরও যদি কোনো নাগরিককে অস্বচ্ছ ভেরিফিকেশনের ভিত্তিতে চাকরি থেকে বঞ্চিত করা হয়, তাহলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট তরুণদের প্রতি অবিচার নয় বরং রাষ্ট্রের নিয়োগ ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বিবৃতিতে তিনি বলেন, আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় দাবি জানাচ্ছি, যাদের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট ও আইনসম্মত অভিযোগ নেই, এমন প্রত্যেক নিরপরাধ প্রার্থীর নিয়োগ অবিলম্বে নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া ও ভেরিফিকেশনের মানদ- জনসমক্ষে স্পষ্ট করতে হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পলিসি অ্যান্ড অপারেশন্সের একজন কর্মকর্তা বলেন, পুলিশ ভেরিফিকেশনে নেগেটিভ রিপোর্ট, জমা দেওয়া কাগজপত্রে অসামঞ্জস্য, সংশ্লিষ্ট উপজেলায় শূন্যপদসহ নানান কারণে প্রার্থীরা নিয়োগপত্র নাও পেতে পারেন।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) শাহীনা ফেরদৌসীর সঙ্গে কথা বলতে তার মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে শুক্রবার দিনভর তার নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে জানতে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ববি হাজ্জাজের হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বারে লিখিত প্রশ্ন পাঠালেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

উল্লেখ্য, গত ৯ জানুয়ারি দেশের ৬১ জেলায় একযোগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পার্বত্য তিন জেলা বাদে অনুষ্ঠিত ওই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৬৯ হাজার ২৬৫ জন প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত করা হয়। পরে গত ৮ ফেব্রুয়ারি সহকারী শিক্ষক নিয়োগ ২০২৫-এর চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। এতে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করা হয়। একই সঙ্গে জেলা অনুযায়ী উত্তীর্ণ প্রার্থীদের তালিকাও প্রকাশ করা হয়। চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর নিয়োগপত্র পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন নির্বাচিত প্রার্থীরা। গত বৃহস্পতিবার বিভিন্ন জেলায় নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু হলে একদিকে অনেকের অপেক্ষার অবসান হয়, অন্যদিকে নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের মধ্যে নতুন করে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত