চার কারণে ভোগান্তির শঙ্কা ঈদযাত্রায়

আর কয়েক দিন পরই মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। আনন্দের এই উৎসব স্বজনদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহর ছেড়ে গ্রামমুখী হবে লাখ লাখ মানুষ। এবারের এই ঈদযাত্রা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে আজ সোমবার থেকে। বিপুলসংখ্যক মানুষের ঘরে ফেরার অন্যতম মাধ্যম সড়ক ও রেলপথ। রেলের শতভাগ টিকিট এবার অনলাইনে বিক্রি হওয়ায় সড়কপথে চাপ বেশি থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা ছিল যাত্রীদের মাঝে। যারা ট্রেনের টিকিট কাটতে পারেননি, তাদের বিকল্প যাতায়াতের পথ হিসেবে বেছে নিতে হবে সড়ককে। কিন্তু এবারও সড়কপথে ভোগান্তির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, এবারও সড়ক-মহাসড়কে যানজটকে সঙ্গী করেই ঈদযাত্রায় শামিল হতে হবে। মহাসড়কে চার কারণে ভোগান্তির শঙ্কা রয়েছে ঈদযাত্রায়। গতবারের মতো এবারও ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দিয়ে উত্তরাঞ্চলে যাতায়াতে ভোগাবে বিআরটি প্রকল্প। অন্যদিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকায় যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো এবং অবৈধ অটোরিকশা স্ট্যান্ডের জন্য ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে। আর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশের সাইনবোর্ড এলাকা থেকে মেঘনা সেতু পর্যন্ত প্রায় ১৭ কিলোমিটার এলাকায় যানজট সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে দক্ষিণাঞ্চলে যাতায়াতে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে (স্বয়ংক্রিয় নয়) সেতুর টোল আদায়ের ফলে এবার ঈদে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে যানজটের শঙ্কা রয়েছে।

এবারের ঈদযাত্রায় ঢাকা থেকে সারা দেশে ৪০ লাখ যাত্রী পরিবহনে প্রস্তুত হচ্ছে বাস কোম্পানিগুলো। রাজধানী থেকে দূরপাল্লায় প্রায় আট হাজার বাস চলাচল করবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি জানিয়েছে, এবার ঈদে ঢাকা থেকে প্রায় ১০ হাজার বাস চলাচল করবে। গড়ে প্রতিটি বাস দিনে দুই ট্রিপ দেবে। প্রতি বাস গড়ে ৪০ জন যাত্রী পরিবহন করবে। সেই হিসাবে দিনে গড়ে ৮ লাখ, পাঁচ দিনে ৪০ লাখ মানুষ বাসে ঢাকা ছাড়বে। এসব যাত্রীর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ বিভিন্ন কারখানার শ্রমিক। অনেক কারখানার শ্রমিক নিজেরাই বাস ভাড়া করেন। যদিও এবার ফিটনেসবিহীন বাস রিজার্ভ করে ঢাকার বাইরে যাওয়ার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি।

ঈদযাত্রায় রাজধানী ঢাকা ও গাজীপুর থেকে লাখ লাখ মানুষ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাবে ঈদ উদযাপন করতে। সাধারণ মানুষের এই যাত্রা নির্বিঘœ করতে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ পরিবহন-সংশ্লিষ্টরা নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। ঈদযাত্রায় ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ঘিরে যাত্রী ও সাধারণ মানুষের ব্যাপক আগ্রহ থাকে। কিন্তু এ বছরও যানজটের ভোগান্তির কারণ হবে টঙ্গী থেকে গাজীপুর পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার সড়ক। নানা কারণে বহুল আলোচিত বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি প্রকল্পের কাজ এ বছরও শেষ হচ্ছে না। গতকাল রবিবার দুপুরে সরেজমিনে এই ১২ কিলোমিটার সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, রাজধানী থেকে গাজীপুরে প্রবেশের মুখে তুরাগ সেতুতে দুটি লেনে গাড়ি প্রবেশ করছে এবং একটি লেনে গাড়ি ঢাকার দিকে যাচ্ছে। ফলে ঢাকামুখী লেনে যানবাহনের গতি কমে গিয়ে সারি বড় হচ্ছে। টঙ্গী এলাকায় বাটার সামনে ফ্লাইওভারে ওঠার র‌্যাম্পের নির্মাণকাজ চলায় এখানে সড়ক এক লেন করে ফেলা হয়েছে। ফলে উভয়মুখী লেনে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এখানে সিঙ্গেল লেনে রয়েছে অসংখ্য খানাখন্দ, যেখানে জমেছে কাদা ও ময়লা।

এ ব্যাপারে গাজীপুর মহানগর ট্রাফিক পুলিশের উপকমিশনার আলমগীর হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে উত্তরার হাউজ বিল্ডিং এলাকায় বিআরটির উড়াল সেতুর ওঠানামার স্থানে বসানো দুটি স্পিডব্রেকার ভেঙে ফেলা, সড়কের ওপর ময়লা-আবর্জনার একটি ডাম্পিং স্টেশন অপসারণ, মহাসড়কের দুই পাশের ড্রেনগুলো পরিষ্কার করা, যাতে বৃষ্টিতে পানি না জমে এবং চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় ফ্লাইওভারের শাটারিংয়ের জিনিসপত্র খুলে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার জন্য বিআরটি কর্র্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়েছে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিআরটি প্রকল্পের পরিচালক মহিরুল ইসলাম বলেন, ‘ঈদ সামনে রেখে বিরাট এই প্রকল্পের যেসব অংশে সংস্কারকাজ প্রয়োজন, সেখানে করা হচ্ছে। যেখানে রাস্তা সম্প্রসারণ করা দরকার, সেখানে রাস্তা সম্প্রসারণের কাজ চলমান রয়েছে। এ ছাড়া উন্নয়নকাজ চলমান থাকার কারণে কোথাও যদি রাস্তা সংকুচিত হয়ে থাকে সেখানে দ্রুত রাস্তা সম্প্রসারণ করে দেওয়া হবে।’

ঈদযাত্রায় শামিল হবে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় এবার মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার শিমুলিয়া ফেরিঘাটে ঈদযাত্রার দুর্ভোগের চিরচেনা সেই দুর্ভোগ  থাকবে না। তারপরও পদ্মা সেতু পারাপারে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে টোল প্লাজা ঘিরে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে যানজটের আশঙ্কা রয়েছে। একই এক্সপ্রেসওয়েতে জেলার সিরাজদিখান উপজেলার কুচিয়ামোড়া সংলগ্ন ধলেশ্বরী-১ ও ধলেশ্বরী-২ সেতুর টোল প্লাজা রয়েছে। সেখানেও যানবাহনের টোল আদায় ঘিরে যানজট সৃষ্টি হবে। 

এ প্রসঙ্গে পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তে সেতু বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী রাজন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘বর্তমানে টোল প্লাজায় ৪টি বুথ চালু রয়েছে। তবে ঈদ সামনে রেখে যানবাহনের চাপ বাড়ার শঙ্কায় পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তের টোল প্লাজায় বুথের সংখ্যা বাড়বে। ছয়টি বুথে টোল আদায় করা হবে।’

মুন্সীগঞ্জ সড়ক ও জনপথের নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আব্দুল কাশেম মো. নাহিন রেজা বলেন, ‘ধলেশ্বরী-১ ও ধলেশ্বরী-২ সেতুর টোল আদায়ে দক্ষিণবঙ্গমুখী ছয়টি লেন রয়েছে। ঈদ সামনে রেখে আমরা দুটি লেনকে ইটিসি পদ্ধতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছি। সে ক্ষেত্রে দ্রত সময়ে টোল আদায় করা যাবে। ইতিমধ্যে টোল আদায়ে অতিরিক্ত লোকবল নিয়োগ করা হয়েছে।’

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে তীব্র যানজটে প্রতি ঈদেই ঘরমুখো মানুষকে পোহাতে হয় সীমাহীন দুর্ভোগ। নারায়ণগঞ্জে সাইনবোর্ড এলাকা থেকে মেঘনা সেতু পর্যন্ত প্রায় ১৭ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজটে নাকাল হতে হয় ঘরমুখো মানুষকে। এই মহাসড়কের সাইনবোর্ড, কাঁচপুর, মদনপুর, মোগরাপাড়া চৌরাস্তা ও মেঘনা টোলপ্লাজা এলাকার বেশ কিছু স্থানে ট্রাফিক আইন অমান্য করে প্রতিনিয়ত যাত্রীবাহী বাসসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী যানবাহন সড়কের এক পাশ থেকে অপর পাশে যাওয়ার কারণে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট; যা ঈদের সময় আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর থেকে মেঘনাঘাট পর্যন্ত প্রায় ১৫টি জায়গায় সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ চলছে।

কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মো. ইব্রাহিম বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক। আমরা এই মহাসড়ককে সব সময়ই যানজটমুক্ত রাখার জন্য চেষ্টা করি। মহাসড়কের পাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অব্যাহত আছে।’

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের রূপগঞ্জের রূপসী, বরপা, বরাব, কাঞ্চন, ভুলতা ও নতুনবাজার এলাকায় যানজটের শঙ্কা রয়েছে। ঈদ সামনে রেখে হাইওয়ে পুলিশের চাঁদাবাজিও যানজটের অন্যতম কারণ বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যানজট নিরসনের জন্য ট্রাফিক পুলিশের পুরনো সিস্টেম বদলাতে হবে। অনান্য দেশের মতো নতুন নতুন পদক্ষেপ নিতে হবে।’

প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁ প্রতিনিধি