অযত্নে মলিন ম্যুরাল

১৯৭১ সালের এই দিনে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা পরবর্তী সময়ে মুজিবনগরে বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠান হয়। তাই মুক্তিযুদ্ধের পুরো ইতিহাসকে জীবন্ত করে ধরে রাখতে সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে শত শত ম্যুরাল বা ভাস্কর্য। যেখানে দাঁড়ালে পুরো মুক্তিযুদ্ধ দেখা যায়। দেশের এক জায়গায় এত ম্যুরাল আর কোথাও নেই। কিন্তু স্বাধীনতার ৫২ বছরেও মুক্তিযুদ্ধের তীর্থস্থান ঐতিহাসিক মুজিবনগর তার কাক্সিক্ষত রূপ-মর্যাদা পায়নি। ১৫ বছর ধরে সরকার মুজিবনগরকে আন্তর্জাতিকমানের করতে এক হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেট বরাদ্দ নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সেখানে নতুন করে একটি ইটের ছোঁয়াও পড়েনি। অবহেলায়-অযত্নে এবং জনবল সংকটে রোদ-বৃষ্টিতে পুড়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শত শত ম্যুরাল ফেটে চৌচির হয়েছে। তাই আজ ম্যুরালে মলিন মুজিবনগর শুধু এই দিনটি এলেই সরব হয়ে ওঠে।

বর্তমান সরকার দিনটি সারা দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করে। সরকারি ছুটি ঘোষণা দিয়ে মুজিবনগরে দিনটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে মেহেরপুর জেলা প্রশাসন কেন্দ্রীয় এই মূল অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

মেহেরপুর জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, আজ ভোরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব খাজা মিয়া ঐতিহাসিক মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রের পক্ষে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং শ্রদ্ধা জানান। পরে মুজিবনগরে নির্মিত শেখ হাসিনা মঞ্চে মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজ্জাম্মেল হক প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন। সেখানে সরকারের একাধিক মন্ত্রী, দলের একাধিক শীর্ষ নেতা ও এমপিরা উপস্থিত থাকবেন। এ উপলক্ষে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে মেহেরপুর জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও বিজিবি।

সারা দেশের মধ্যে একমাত্র মুজিবনগরে যেখানে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণসহ পুরো মুক্তিযুদ্ধের উল্লেখযোগ্য সব ঘটনাবলির ইতিহাস মানুষ সমান ভাস্কর্য বা ম্যুরাল করে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে বিশাল স্মৃতি মানচিত্র ও কমপ্লেক্স। ২৫ বছর আগে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬০ একর জমির ওপর এসব স্থাপনা এবং ম্যুরাল নির্মাণ করা হয়। ২০০১ সালে শেষ হওয়া এই কাজগুলো আজও আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হয়নি। উপরন্তু লোকবল না থাকায় অরক্ষিত মুজিবনগরের শতবর্ষী গাছগুলো আজ শুকিয়ে মরতে বসেছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সাদা সিমেন্টে তৈরি মুক্তিযুদ্ধের ম্যুরালগুলোতে চির ধরেছে। ফাটল ধরেছে স্মৃতিসৌধসহ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি মানচিত্র ভবনের চতুর্দিকে। শপিংমল ভবন নির্মাণের ২০ বছর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ছয় দফাভিত্তিক গোপালবাগান এখন অনেকটা বিরানভূমি। এখন পুরনো স্থাপনার অনেক কিছুই ভেঙে আবার নতুন করে করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। তার পরও দর্শনার্থীরা স্বাধীনতার সূতিকাগার ঐতিহাসিক এই স্থানটি দেখতে প্রতিদিন মুজিবনগর ভিড় করেন।

মুজিবনগরের বাগোয়ান ইউনিয়ন চেয়ারম্যান বললেন, মুজিবনগরকে আন্তর্জাতিকমানের পর্যটনকেন্দ্র করতে সরকারের হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা আছে। এ জন্য নতুন করে আরও ৩০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। অথচ এ সরকারের সময় মুজিবনগরে স্বাধীনতা সড়ক হয়েছে সত্যি কিন্তু মুজিবনগরকে আন্তর্জাতিকমানের করতে সেখানে নতুন একটি ইটেরও কাজ হয়নি। এতে পিছিয়ে পড়েছে মুজিবনগর।

মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শম্ভুরাম পাল জানান, মুজিবনগরে ১১টি মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে নতুন করে বিভিন্ন কাজ শুরু হবে। মূলত মুক্তিযুদ্ধকে চির অম্লান ও জীবন্ত করে তুলে ধরতেই মুজিবনগরকে আন্তর্জাতিক মানের করা হবে। সে ক্ষেত্রে পুরনো অনেক স্থাপনা তুলে অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হবে। সাদা সিমেন্টে তৈরি পুরনো ম্যুরালগুলো ভেঙে নতুন করে ধাতব পদার্থে আরও বড় আকারের এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ব্রোঞ্জের দামি টেকসই ম্যুরাল করা হবে। এ ছাড়া ঢাকা হাতিরঝিলের চেয়েও মুজিবনগরকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করতে আন্তর্জাতিক মানের শব্দ, আলো, ফোয়ারা, লেক, টাওয়ার, নিরাপত্তা, ভিআইপি গেস্টহাউজ, পার্কসহ নানা সুযোগ-সুবিধা নির্মাণ করা হবে। দ্রুত কাজ শুরু করতে এরই মধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের দু-দফা বৈঠকও শেষ হয়েছে। নকশা চূড়ান্ত হয়েছে। দ্রুতই দরপত্র হবে। নতুন এই কাজ শুরু হলে বদলে যাবে মুজিবনগর। তখন মুজিবনগরই হবে দেশের এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও গর্বের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক দর্শনীয় পর্যটন স্থান। তখন দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে দেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জ্ঞান আহরণ ও গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হবে মুজিবনগর।

মেহেরপুর জেলা প্রশাসক আজিজুল ইসলাম জানান, ঐতিহাসিক মুজিবনগরের গুরুত্বকে তুলে ধরতে সরকার ইতিমধ্যে মুজিবনগর স্থলবন্দর, মুজিবনগর রেলপথ, মুজিবনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ঘোষণা দিয়ে সেগুলোর প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে। এবার পরিকল্পিতভাবেই সবকিছু নির্মাণ করা হবে। এগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মুজিবনগর একটি পরিচিত ঐতিহাসিক স্থান হবে।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী (মেহেরপুর-১) ফরহাদ হোসেন বলেছেন, মুজিবের নামে বাংলাদেশে একটি মাত্র স্থান। সেটা মুজিবনগর। যে স্থানের গর্ভে বাংলাদেশের জন্ম। মুজিবনগরকে সরকার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আন্তর্জাতিকমানের পর্যটনকেন্দ্র করতে চায়। সেই লক্ষ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। কেননা মুজিবনগরের প্রতি এই সরকারের রয়েছে বিশেষ দৃষ্টি। এখানে মুজিবনগর নামে চেকপোস্ট, স্থলবন্দর, রেলপথ ও পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হলে বদলে যাবে এই এলাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক চালচিত্র।