কৃষিতে সবচেয়ে বড় প্রকল্প ‘পার্টনার’

অর্থনৈতিক সংকটের শুরুর দিকে কৃচ্ছ্রসাধনের অংশ হিসেবে কয়েক মাস জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা হয়নি। কিন্তু নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রকল্প অনুমোদনের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। গত এক মাসে প্রতি মঙ্গলবারই একনেক অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং নিয়মিত প্রকল্প অনুমোদন পাচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবারও সাড়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় সংবলিত ১২টি প্রকল্প অনুমোদন করেছে একনেক। এরমধ্যে কৃষির এক প্রকল্পেই ব্যয় ধরা হয়েছে সাত হাজার কোটি টাকারও বেশি। এটি কৃষির উন্নয়নে নেওয়া সবচেয়ে বড় প্রকল্প।

প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন এন্টারপ্রেনরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স (পার্টনার) শীর্ষক দেশের কৃষিতে সবচেয়ে বড় এই প্রকল্পটি পাঁচ বছরে বাস্তবায়ন করা হবে। ৬৪ জেলার ৪৯৫ উপজেলায় পার্টনার বাস্তবায়িত হবে আগামী জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন সময়সীমায়। প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন এক হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা ও প্রকল্প সাহায্য হিসেবে আসবে পাঁচ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা। প্রকল্প সাহায্য হিসেবে বিশ্বব্যাংক দেবে পাঁচ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ও ইফাদ দেবে ৫০০ কোটি টাকা।

বলা হচ্ছে, প্রকল্পটি দেশের কৃষির খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ দেশের কৃষি সেক্টরের বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরে জাতীয় কৃষি নীতি-২০১৮ এর কর্মপরিকল্পনা (২০২০) ও উত্তম কৃষি চর্চা নীতিমালা ২০১০ বাস্তবায়নসহ এসডিজি, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ও ডেলটা প্ল্যান-২১০০ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

এই মেগা প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে উত্তম কৃষিচর্চা সার্টিফিকেশনের মাধ্যমে তিন লাখ হেক্টর ফল ও সবজি আবাদি জমি বৃদ্ধি; জলবায়ু অভিঘাত সহনশীল উচ্চ ফলনশীল নতুন ধানের ও ধান ছাড়া অন্যান্য দানাদার ফসলের জাত উদ্ভাবনসহ মোট চার লাখ আবাদি জমির পরিমাণ বৃদ্ধি; উন্নত ও দক্ষ সেচ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এক লাখ হেক্টর নতুন আবাদি জমি সেচের আওতায় আনয়ন; স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে দেশব্যাপী দুই কোটি ২৭ লাখ ৫৩ হাজার ৩২১টি কৃষক পরিবারকে ‘কৃষক স্মার্টকার্ড’সহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি।

প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় পার্টনারসহ ১২টি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। এতে ১৯ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হবে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৬ হাজার ২৬০ কোটি ৭২ লাখ টাকা, বৈদেশিক ঋণ ১৩ হাজার ২০৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ১৩৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।

এদিকে কিছু প্রকল্প তড়িঘড়ি করে সভায় উত্থাপন করায় ফিরিয়ে দেওয়ার নজিরও সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল একনেকে ১৫টি প্রকল্প উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের একটি প্রকল্প ও বঙ্গবন্ধুর মাজারকেন্দ্রিক একটি প্রকল্প ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাধারণত একনেকে কোনো প্রকল্প উত্থাপিত হলেই সেটির অনুমোদনের সম্ভাবনাই বেশি থাকে।

পার্টনার ছাড়া অনুমোদিত অন্য প্রকল্পগুলো- পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ‘বিল্ডিং ক্লাইমেট রেসিলিয়েন্ট লাইভলিহুড ইন দি ভালনারেবল ল্যান্ডস্ক্যাপস ইন বাংলাদেশ (বিসিআরএল)’ প্রকল্প। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘বরিশাল জেলার সদর উপজেলায় চরকাউয়া, চাঁদমারী, জাগুয়া, লামচরি এবং চরমোনাই এলাকা কীর্তনখোলা নদীর ভাঙন হতে রক্ষা প্রকল্প’ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ‘ইমপ্রুভিং কম্পিউটার অ্যান্ড সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং টারশিয়ারি এডুকেশন প্রজেক্ট’।

‘সেফার সাইবারস্পেস ফর ডিজিটাল বাংলাদেশ : ইনহ্যান্সিং ন্যাশনাল অ্যান্ড রিজিওনাল ডিজিটাল ইনভেস্টিগেশন ক্যাপাসিটি অব বাংলাদেশ পুলিশ এবং ‘ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগার পুনর্নিংর্মাণ’ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ’ এবং ‘বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা’ প্রকল্প; ‘ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সেকশনে বিদ্যমান মিটারগেজ রেললাইনের সমান্তরাল একটি ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ’ ও ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের লেভেল ক্রসিং গেইটসমূহের পুনর্বাসন ও মান উন্নয়ন’ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। ‘জিটুজি ভিত্তিতে ২টি ক্রুড অয়েল মাদার ট্যাংকার এবং ২টি মাদার বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ সংগ্রহ’ প্রকল্পও অনুমোদন দেওয়া হয়।

নতুন কারাগার অথবা পুরাতন কারাগার সংস্কার করলে ভার্চুয়াল কোর্টের ব্যবস্থা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একনেক বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর এসব নির্দেশনার কথা জানান পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম। একনেক সভায় ১১২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগার পুনর্নির্মাণ’ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী এই নির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘প্রত্যেক নতুন অথবা পুরাতন কারাগার সংস্কার করলে ভার্চুয়াল কোর্টের ব্যবস্থা রাখতে বলা হয়েছে। এতে করে এক কোর্ট থেকে অন্য কোর্টে আসামি আনা-নেওয়া করার ঝামেলা থাকবে না।’

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ‘ইকোনমিক অ্যাকসিলারেটিং অ্যান্ড রেজিলেন্স ফর নেট’ প্রকল্পটি একনেক সভা থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এই প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করার সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবন নির্মাণের আগে ২০ বার ভাবতে হবে। দরকার হয় বিদ্যমান ভবনগুলো সংস্কার করে ব্যবহার করতে হবে।

সরকারি ৭৬ কোটি টাকা ব্যয় করে ‘বিল্ডিং ক্লাইমেট রেসিলেন্ট লাইভলিহুড ইন দি ভালনারেবল ল্যান্ডস্ক্যাপস ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এই সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি অর্থ ব্যয় না করে এই ধরনের প্রকল্প ক্লাইমেট ফান্ড থেকে নেওয়া যায়।’